নিজস্ব প্রতিবেদক

০৯ আগস্ট, ২০২১ ১৮:১৩

অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে ওঁরাও নারীরা

রাতের আঁধারে দখলবাজরা এসে টিলা কেটে দেয়। টিলার খালি জায়গা দখল করতে মাঝে মাঝে দিনের বেলাও আসে স্থানীয় প্রভাবশালীরা। টিলা ছাড়তে প্রতিনিয়ত হুমকি ধমকিতো আছেই। এসব থেকে বাঁচতে টিলাতে ইট, বালু, সিমেন্ট দিয়ে সীমানা তৈরি করে শাক-সবজি চাষসহ বিভিন্ন ফলের গাছ রোপন করে রাখেন আদিবাসী ওঁরাও নারীরা।

আদিবাসী নারী রমনী ওঁরাও বলেন, ‘দখলবাজদের অত্যাচারে খুব কষ্টে আছি আমরা। খালি জায়গা থাকলেই ভূমিখেকোরা দখল করতে আসে। তাই সবজি লাগিয়ে দিয়েছি। এতে আমাদের জায়গাও রক্ষা হচ্ছে এবং সবজিও খেতে পারছি।’

সিলেটের বালুচর এলাকার চন্দনটিলায় প্রায় ২৫ বছর আগে বাস করতো পাঁচশতাধিক ওঁরাও পরিবার। কালের বিবর্তনে ভূমিখেকোদের অত্যাচারে এই জায়গায় বর্তমানে মাত্র ১২টি পরিবার বসবাস করছে। এই ১২টি পরিবারে প্রায় ৫০জন সদস্য আছেন। এর মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি নারী। তাই নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার্থে ভূমিখেকোদের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত লড়াই করেন ওঁরাও নারীরা।

আজ ৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস। ১৯৯৪ সাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই দিনটি পালন করে আসছে বিশ্বের প্রায় ৩০ কোটি আদিবাসী। ১৯৯২ সালে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের উন্নয়ন ও সংরক্ষণ উপকমিশনের কর্মকর্তারা তাদের প্রথম সভায় আদিবাসী দিবস পালনের জন্য ৯ই আগস্টকে বেছে নেয়। দিবসটি উদযাপনের মূল লক্ষ্য হলো আদিবাসীদের জীবনধারা, মৌলিক অধিকার ও মানবাধিকার, আদিবাসী জাতিসমূহের ভাষা ও সংস্কৃতিসম্পর্কিত বিভিন্ন সমস্যা নিরসনের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সুদৃঢ় করা ও গণসচেতনতা সৃষ্টি করা। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও আজ পালিত হবে দিবসটি।

আদিবাসী নারী শেফালী ওঁরাও বলেন, ভোর সকালে উঠে ঘরের কাজ সেরে সারাদিনের গৃহস্থালির কাজের জন্য টিলার নিচের চাপকল থেকে খাবার পানি সংগ্রহ। দিন শেষে ইকোপার্ক থেকে রান্নার জন্য লাকড়ি সংগ্রহ করে বাড়ি ফিরি। দৈনন্দিন এই কাজের সাথে আমাদের আরেকটি কাজ হলো ভূমিখেকুদের কাছ থেকে পৈত্রিক ভূমি রক্ষা করা।
শেফালী বলেন, আমাদের জায়গা দখলের জন্য প্রায়ই ভ‚মিখেকোরা আসে। তখন বাড়িতে কোনো পুরুষ মানুষ থাকে না। এসময় আমরা সকল নারীরা মিলে ভ‚মিখেকোদের সাথে লড়াই করি।

চন্দনটিলায় বেশ কয়েকজন আদিবাসী নারীর সাথে কথা বলে জানা যায়, বছর পাঁচেক আগেও ওঁরাও নারীরা ঘরের কাজ ছাড়া আর কিছু করতেন না। প্রভাবশালীদের হুমকি, অত্যাচার সহ্য করতেন। তবে বর্তমানে আর এমনটি হয় না। তাদের ছেলে মেয়েরা এখন স্কুল কলেজে লেখাপড়া করে। এদের মধ্য থেকেই অনেক প্রতিবাদী কন্ঠস্বর বেরিয়েছে। এই প্রতিবাদী কন্ঠস্বরের মধ্যে আছে চন্দনটিলার আদিবাসীদের প্রধান স¤্রা ওঁরাও নাতিন আরতি ও সারতি ওঁরাও। তাঁরা দুইবোন তাদের সম্প্রদায়ের লোকদের নিজেদের অধিকার আদায়ের ব্যাপারে সচতেন করেন, সাহস যোগান। এসব বিষয়ে তাদের সাথে কাজ করে তার ভাইয়ের মেয়ে শিপা ওঁরাও ও রিপা ওঁরাও।

সারতি ওঁরাও সিলেট সরকারি কলেজের ডিগ্রি শেষ করে বর্তমানে একটি এনজিতে কাজ করছেন। সারতি বরাবরই চাইতেন তাদের সম্প্রদায়ের মানুষজন যেন শিক্ষিত হন। নারীরা যেন স্বাবলম্বী হোন। সেইজন্য বিভিন্ন সময় টিলার নারীদের বিভিন্ন পরামর্শ প্রদান করেন। সারতি বলেন, ‘আমাদের জাতির মানুষ খুব কম। তার উপড় আমাদের অভিবাবক অনেকেই লেখাপড়া জানেন না। তাই ভূমিখেকুরা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ভাবে তাদের পৈত্রিক ভিটা থেকে উচ্ছেদ করে দিয়েছে। কিন্তু আমাদের বর্তমান প্রজন্ম এখন শিক্ষিত। এই টিলার ১২টি পরিবারে ছেলেমেয়েরা এখন লেখাপড়ায় অগ্রসর। প্রথম শ্রেণী থেকে মার্স্টাস। সব লেভেলে শিক্ষার্থী আছে এখানে।

সারতি ওঁরাও বলেন, চন্দনটিলার এই আদিবাসী ওঁরাও সম্প্রদায়ের ভূমির উপর ভূমিখেকোদের নজর অনেকে আগে থেকেই। দখলবাজরা বিভিন্ন সময় আমাদের উপর অত্যাচার করে হুমকি ধামকি দিয়ে উচ্ছেদ করে দিয়েছে। ভ‚মিখেকোদের অত্যাচারে একপর্যায়ে সিলেটের বিভিন্ন চা বাগানে আশ্রয় নেয় কিছু ওঁরাও পরিবার। আর কিছু পরিবার মৌলভীবাজার ও শ্রীমঙ্গল চা বাগানে চলে যায়। এই ভ‚মির জন্য লড়াই করেছেন আমাদের বাবা, দাদারা। ভ‚মি রক্ষার জন্য শেষ চেষ্টা করে যাব।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত