তাহিরপুর প্রতিনিধি

০৯ আগস্ট, ২০২১ ২০:৩৯

জলজীবিদের জীবনযুদ্ধে অন্যতম হাতিয়া ‘বারকি’

সড়ক পথের যোগাযোগ উন্নয়ন হওয়া নদীমাতৃক বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় নৌকার কদর কমে গেলেও বারকি নৌকা জলজীবিদের জীবনযুদ্ধের অন্যতম হাতিয়ার। হাওরাঞ্চলের বিভিন্ন উপজেলার নৌকার ইঞ্জিনের ব্যবহার করে দ্রুত চলাচল করলেও বারকি শ্রমিকদের জন্য অন্যতম ও গুরুত্বপূর্ণ জীবিকার অন্বেষণে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করা হয় সুনামগঞ্জের তাহিরপুর যাদুকাটা নদী,ফাজিলপুরসহ বিভিন্ন বালু-পাথর মহালে।

এছাড়াও অনেকে বেকার যুবকরা এখন এক স্থান থেকে অন্য স্থানে দ্রুত চলাচলে বারকি নৌকায় ইঞ্জিন বসিয়েছে যাত্রী পরিবহন করছেন। আর জলজীবিকার শ্রমিকদের বারকি নৌকার চাহিদা মেটাতে জেলার বিভিন্ন গ্রামে বারকি নৌকা তৈরি ও বিক্রি করে কারিগররাও জীবনজীবিকা নির্বাহ করছে যুগযুগ ধরে। তবে বর্ষায় বালু পাথর উত্তোলন ও পরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বারকি নৌকা।

জানা যায়, হাওর বেষ্টিত সুনামগঞ্জের মাইজবাড়ি এলাকার রয়েছে শাপলা, হাতি, ময়ূর, হুক্কা, লাঙ্গল, তারা, অরত, চাঁদ, দোয়েল, পতাকাসহ ১০-১৫আড়ং। যারা নৌকা তৈরি করেন তারা আড়ং নামে পরিচিত। যাদুকাটা নদীর সোহালা গ্রামের ও মিয়ারচর গ্রামে রয়েছে আরও ৫টি আড়ং। এছাড়াও জেলার তাহিরপুর উপজেলা, মধ্যনগড় থানা, ছাতক উপজেলা, দোয়ারা বাজার উপজেলা, জামালগঞ্জ উপজেলার নজাতপুর, সেরাস্তাপুর, বাগগোয়াসহ বিভিন্ন গ্রামে নৌকার কারিগর রয়েছেন। ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী তাদের বাড়িতে গিয়েও বারকি নৌকা তৈরি ও মেরামত করে দেন।

জেলার তাহিরপুর উপজেলার কাউকান্দি বাজার, জেলার মধনগর বাজার, জাওয়া বাজার, মাইজবাড়ি, জামালগঞ্জের নৌকা বিক্রির হাট রয়েছে। আর সেখানে অন্যান্য নৌকা বিক্রির পাশাপাশি বারকি নৌকা প্রচুর পরিমাণ বিক্রি হয়। আর এই বারকি নৌকা কিনে নেন হাওর পাড়ের শ্রমিকরা। তারা উপজেলার যাদুকাটা,ফাজিলপুরসহ জেলার বিভিন্ন বালু ও পাথর কোয়ারিতে এই নৌকা নিয়ে জীবিকা অন্বেষণ করেন।

নৌকা তৈরির কারিগর আলী নুর মিয়া জানান, প্রায় ৩০বছর ধরে নৌকা বানানোর পেশায় আছেন তিনি। সংসার মোটামুটি ভালই চলে। বর্ষাকালে ৩মাস নৌকা তৈরির কাজে ব্যস্ত থাকেন। ৩-৪ দিনে ১৫ থেকে ২০ হাত লম্বা একটি নৌকা বানাতে খরচ হয় ১৪ থেকে ১৫ হাজার টাকা। বাজারে নৌকা বিক্রি করেন প্রায় সাড়ে ১৮হাজার টাকা। নৌকা বিক্রির লভ্যাংশ ছাড়া ও আরও ২/৩শত টাকার লাকড়ি আয় হয়। রেন্টি, জারুল, কদম, চাম্বল, কোমাসহ বিভিন্ন কাঠ দিয়ে নৌকা তৈরি করা হয়। কাঠের ধরন অনুযায়ী নৌকার দাম বিভিন্ন বিভিন্ন।

তাহিরপুর উপজেলার বাদাঘাট ইউনিয়নের পাতারগাও গ্রামের বারকি শ্রমিক সাইফুল ইসলাম জানান, আমি গত এক বছর পূর্বে সুনামগঞ্জ মাইজ বাড়ি থেকে অরতন (লাভ মাকা) আড়ং থেকে ১৮ হাজার (২৩ হাত দৈর্ঘ্য ও সাড়ে তিন হাত প্রস্থ) টাকায় অর্ডার দিয়ে কিনে এনে আরও কিছু কাজ করতে হয়েছে। প্রথমে বালু ও পাথর পরিবহন করতাম যাদুকাটা নদীতে। এখন দ্রæত চলাচলের জন্য নৌকায় ইঞ্জিন বসিয়ে বিভিন্ন স্থানে মানুষজন পরিবহন করি। আমার মত অনেকেই আছে যারা এই বারকি নৌকা দিয়ে বালু ও পাথর পরিবহন করে জীবন জীবিকা নির্বাহ করছেন।

যাদুকাটা নদীর বালু ও পাথর শ্রমিক শাকিবুল মিয়া বলেন, বালু ও পাথর মহালে বারকি ছাড়া কাজ করার সুযোগ নেই। এই বারকিই আমাদের জীবন জীবিকার প্রধান হাতিয়ার। বালু ও পাথর মহাল থেকে বালু ও পাথর সংগ্রহ করে নৌকার করে নদীর পাড়ে জমা করি। ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে দেই।

তাহিরপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান করুনাসিন্ধু চৌধুরী বাবুল বলেন, উপজেলাসহ জেলার অনেক গ্রামে বংশপরমপরায় ও অনেকেই বেকার না থেকে নৌকা তৈরির কারিগরের পেশায় নিয়োজিত হয়ে নৌকা তৈরি করে সামলম্বী হয়েছেন। এই পেশা না থাকলে তারা বেকার থাকত। তাদের সর্বাত্মক সহযোগীতা করা হবে।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত