০৪ ডিসেম্বর, ২০১৫ ০১:৩১
২০১৩ সালের ৩১ অক্টোবর। সকাল সোয়া ৯ টা। সিলেটের বিয়ানীবাজারের শেওলা শুল্ক স্টেশন দিয়ে বিজিবি’র বাধা উপেক্ষা করে ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করে দুটি বিলাসবহুল জিপ গাড়ি। বিজিবি’র টহল চৌকি ভেঙ্গে জিপ দু’টি প্রবেশের খবর ছড়িয়ে পড়লে শুরু হয় তোলপাড়। এমনকি এ ঘটনায় উদ্বিগ্ন হয়ে প্রধানমন্ত্রীও ফোনে কথা বলেন সিলেটে অবস্থানরত শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের সাথে।
সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নির্দেশে নড়েচড়ে উঠে সিলেটের প্রশাসন। বিশেষ অভিযান চালিয়ে রাতেই গাড়ি দুটি উদ্ধার করা হয়।
গাড়িগুলো উদ্ধারের পর এ ঘটনায় মামলা দায়ের করে পুলিশ। তবে এখন পর্যন্ত মামলাটির কোনো কূল কিনারা করা সম্ভব হয়নি। দুই বছরেও মামলার অভিযোগপত্র তৈরি হয়নি। আর আইনী জটিলতার কারণে থানার খোলা আকাশের নিচে দুই বছর ধরে পড়ে আছে বিলাসবহুল গাড়ি দুটি। এক্স- ৮৫৫ ও এবি-৫২ নাম্বারের গাড়ি দুটি রোধ-ধুলো-বৃষ্টিতে গাড়িগুলো হারিয়েছে জৌলুস। দুই বছর ধরে ফেলে রাখার ফলে এগুলো চলাচলের অনুযোপযোগী হয়ে পড়েছে বলেও জানিয়েছেন সংশ্লিস্টরা।
জানা যায়, দুটি গাড়িতে ব্রিটিশ পাসপোর্টধারী ৩ জন বাংলাদেশি নাগরিকও দেশে প্রবেশ করেছিলেন। গাড়ি উদ্ধারের পর কাবুল (পাসপোর্ট নং- ৪৫৪৭৯৩৩৫৬), আসকির আলী (পাসপোর্ট নং ৫০৮৮৯৮৫৫৮) এবং অন্তর আলী (পাসপোর্ট নং-৬৫২৪৯১৪৮৭) নামের এই তিন ব্যক্তি আদালতে আত্মসমর্পন করেন। গাড়িগুলো তারা বৃটেন থেকে কিনে এনেছেন বলে আদালতের কাছে দাবি করেন। এরপর জামিন নিয়ে তারা আবার ফিরে যান যুক্তরাজ্যে।
এ ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার তদন্তকারী কর্মর্কতা, সিলেট কতোয়ালি থানার ওসি (তদন্ত) মোশারফ হোসেন বলেন, গাড়ি দুটি যুক্তরাজ্য থেকে আনা হয়েছিলো। ইন্টারপোলের মাধ্যমে যুক্তরাজ্যের কারনেট কোম্পানীর কাছে গাড়ি দুটির ব্যাপারে তথ্য চাওয়া হয়েছে। তথ্য পেলেই মামলার বিষয়ে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা হবে।
গাড়িগুলো নষ্ট হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আদালতের নির্দেশ ছাড়া এগুলো এখান থেকে সরানোর কোনো এখতিয়ার নেই।
সংশ্লিস্ট সূত্রে জানা যায়, প্রবাসীবহুল সিলেটে বিভিন্ন দেশ থেকে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আসা শতাধিক গাড়ি রয়েছে। সিলেটের প্রবাসীরা নিজে ব্যবহারের কথা বলে ও কারনেট সুবিধা নিয়ে গাড়িগুলো দেশে নিয়ে আসেন। পরে চুরি হয়ে গেছে বা দুর্ঘটনায় নষ্ট হয়ে পড়েছে অজুহাত দিয়ে এগুলো আর ফিরিয়ে নেওয়া হয় না। ফলে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আনা এ গাড়িগুলো চড়ে বেড়ায় দেশের ভেতরেই। এভাবেই ২০১৩ সালে শেওলা শুল্ক স্টেশন দিয়ে নিয়ে আসা হয়েছিলো গাড়ি দুটি।
মিথসুবিশি কোম্পানীর বিলাসবহুল পাজেরো জিপ দুটির দাম চার থেকে পাঁচ কোটি টাক হতে পারে বলে জানিয়েছেন কতোয়ালি থানা পুলিশ।
ওসি মোশরাফ জানান, আটককালে গাড়ি দুটো একেবারে নতুন ছিলো। নতুন গাড়ি আনতে গেলে আমাদের এখানে ৩০০ শতাংশ ট্যাক্স দিতে হয়। সেটা ফাঁকি দিতেই এভাবে নিয়ম ভেঙে ইমিগ্রেশন ফাঁকি দিয়ে গাড়ি নিয়ে আসা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের ধারনা, কাস্টমস কর্মকর্তাদের সাথে যোগসাজশে এভাবে সিলেটের বিভিন্ন শুল্ক স্টেশন দিয়ে চোরাই পথে নিয়ে আসা হয় দামি গাড়ি। ২০১৩ সালে দু’টি গাড়ি উদ্ধার হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে গাড়ি প্রবেশের খবর জানতে পারে না কেউ। ফলে তা উদ্ধারও হয় না।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কতৃপক্ষ (বিআরটিএ) সূত্রে জানা যায়, সিলেটে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আনা ১১১ টি বিদেশী গাড়ি রয়েছে। তবে বিভিন্ন বেসরকারী সংস্থা সূত্রে জানা যায়, সিলেটে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আনা গাড়ির সংখ্যা পাঁচশতাধিক। শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আনা মারসিডিজ বেঞ্জ, অডি, বিএমডব্লিউ, জাগোয়ার থেকে শুরু করে বিশ্বের নামিদামি ব্রান্ডের গাড়ি রয়েছে।
একাধিক সূত্রের তথ্যের ভিত্তিতে জানা গেছে, যুক্তরাজ্যে কারনেট নামে একটি আন্তর্জাতিক অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশন রয়েছে। যুক্তরাজ্যের কোনো নাগরিক পর্যটক হিসেবে তার গাড়ি নিয়ে যদি অন্য কোনো দেশে যেতে চান, তবে তা ব্যবস্থা করে দেয় ওই ক্লাবটি। কারনেটের নিয়ম অনুযায়ী প্রতি পাসপোর্টের বিপরীতে একটি গাড়ি দেশের বাইরে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। তবে তা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য। বিদেশ থেকে বাংলাদেশে গাড়ি প্রবেশে তিনশ ভাগ সরকারি শুল্ক নির্ধারণ থাকলেও কারনেটের গাড়ি প্রবেশে পোর্ট ফি ছাড়া কোনো সরকারি শুল্ক প্রদান করতে হয় না। আর পোর্ট ফি মাত্র ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা বলে জানা গেছে। এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে যুক্তরাজ্যে বসবাসরত অনেক সিলেটি নিয়ে আসছেন এসব দামি গাড়ি। কারনেটের নিয়ম অনুযায়ী পর্যটক হিসেবে আসা এসব গাড়ি ২৪ মাসের মধ্যে নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু নির্দিষ্ট সময় চলে গেলেও এসব গাড়ি থেকে যাচ্ছে বাংলাদেশে।
সূত্র মতে, পর্যটক হিসেবে আসা গাড়িগুলোর মাত্র ১০ ভাগ নিজ দেশে ফিরে যাচ্ছে। বাকী প্রায় ৯০ ভাগই থেকে যাচ্ছে দেশে। ফিরে যাওয়ার তালিকায় তাও আবার কেবল বিভিন্ন বিদেশি সংস্থার গাড়িই বেশি।
সূত্র জানায়, কারনেটের সুবিধায় দেশে নিয়ে আসা এসব গাড়ির মালিকরা গাড়িগুলো দেশে রেখে দিতে বেশ কিছু কৌশল অবলম্বন করেন। ২৪ মাসের মধ্যে ফিরিয়ে নেয়ার চুক্তিতে স্বাক্ষর করে এলেও গাড়ি সড়ক দুর্ঘটনায় ধ্বংস হয়ে গেছে, তাই ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়ে উঠেনি এমন তথ্য উপস্থাপন করেন তারা। বিষয়টি বিশ্বাসযোগ্য করতে সাজানো পুলিশ মামলা এমনকি কম্পিউটার এনিমেশনের মাধ্যমে গাড়িটির ধুমরানো-মোচরানো কিছু ফটোও উপস্থাপন করা হয় কারনেট অ্যাসোসিয়েশনে।
সূত্র আরও জানায়, বিআরটিএর কিছু অসাধু কর্তা বড় অঙ্কের টাকার বিনিময়ে অবৈধভাবে বের করে দিচ্ছেন এসব গাড়ির রোডপারমিট।
আপনার মন্তব্য