জাহাঙ্গীর আলম ভুঁইয়া, তাহিরপুর

২০ এপ্রিল, ২০২২ ১৫:৪৫

ঋণ পরিশোধ নিয়ে চিন্তায় কপালে ভাঁজ হাওর পাড়ের কৃষকদের

সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার ভনানীপুর গ্রাম ঘেঁষেই বলাইকান্দি হাওর। উজান থেকে নেমে আসা ঢলের পানিতে গত রবিবার ভেঙে যায় টাঙ্গুয়ার হাওরের বর্ধিত গুড়মার ফসলরক্ষা বাঁধ। চোখের সামনেই তলিয়ে গেছে সোনালি ফসল। হাওরপাড়ে দাঁড়িয়ে গতকাল মঙ্গলবার সেই দৃশ্য দেখছিলেন ৬৫ বছর বয়সী কৃষক আবুল হাসান। রোদে পোড়া তামাটে মুখটায় নেমে এসেছে রাজ্যের দুশ্চিন্তা। এখন এনজিও, মহাজনের কাছ থেকে সুদে আনা টাকা ও ব্যাংক ঋণের কিস্তি কীভাবে পরিশোধ করবেন- সেই চিন্তায় কপালে কপালে ভাঁজ পড়েছে।

কথা হলে এই বৃদ্ধ বলেন, ‘আমাদের দুঃখের শেষ নাই। মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে টাকা এনে কষ্ট করে তিন হাল (পৌনে ১১ একর) জমি করলাম। কিন্তু কাটতে পেরেছি কেবল ৮ কিয়ার (প্রায় আড়াই একর)। বাঁধ ভেঙে বাকি পাকা, আধাপাকা ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। এখন কীভাবে যে সুদের টাকা দিব, আর সারাবছর সংসার চালাব, মাথায় কিছুই আসছে না।’

যেটুকু ধান কাটতে পেরেছেন হাওরের পাড়ে স্ত্রীকে নিয়ে সেগুলো শুকচ্ছিলেন আবুল হাসান। ধানগুলো একটু উল্টে দেওয়ার জন্য স্ত্রীকে নির্দেশ দিয়ে বৃদ্ধ এবার ফিরে এলেন নিজের কথায়, ‘হাজারে ছয় মাসে দেড় হাজার টাকা সুদে মহাজনের কাছ থেকে এনেছিলাম ৫০ হাজার টাকা। এখন না পারব আসল টাকা দিতে, না পারব লাভের (সুদ) টাকা দিতে। বৃদ্ধ বয়সে এখন এলাকা ছেড়ে শহরে যাওয়া ছাড়া কোনো পথই দেখছি না।’

শুধু আবুল হাসানই নন, একই হাওরে ৫৫ বছরের প্রৌঢ় মনধর রায় ১০ কিয়ার বোরো জমি চাষ করে কাটতে পেরেছেন কেবল ১ কিয়ার বা ৩০ শতাংশের ধান। বাকি ৯ কিয়ার জমির পাকা ও আধাপাকা ধানই পানিতে তলিয়ে গেছে। কাটা অল্প কিছু ধান হাওরের পাড়ে স্ত্রীকে নিয়ে শুকচ্ছিলেন। জানতে চাইলে জানান, মহাজনের কাছ থেকে তিনিও সুদে ২০ হাজার টাকা এনে ধান লাগিয়েছিলেন। অন্যদিকে ব্যাংক থেকে ২০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে একই হাওরে ৫ কিয়ার জমি চাষ করেছিলেন দিরাজ চন্দ্র সরকার। তার পুরো ধানই পানিতে তলিয়ে গেছে। একেই গ্রামের মৃত্যুঞ্জয় তালুকদারও ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ৮ কিয়ার জমিতে বোরো চাষ করেন। ঘরে এক মুঠো ধান তুলতে পারেননি তিনিও। একই অবস্থা মানিকখিলা গ্রামের আলেয়া বেগমের। তার ৮ কিয়ার বোরো জমির সবই পানিতে তলিয়ে গেছে।

একই পরিণতির কথা জানালেন টাঙ্গুয়া, গলগলিয়া, নোয়াল, কাউয়ার বিল, কাউজ্জাউরি, গাঁওর কিত্তা (ভবানীপুর), কলমা ও শালদিঘাসহ বিভিন্ন হাওরের হাজার হাজার কৃষক। সারাবছর পরিবার নিয়ে চলার পাশাপাশি এনজিও এবং মহাজনের থেকে নেওয়া সুদের টাকা ও ব্যাংকের ঋণ পরিশোধের চিন্তায় এখন তাদের ঘুম হারাম। স্থানীয়রা জানান, প্রতি বছরেই পাহাড়ি ঢলে ফসলডুবির কারণে এই এলাকার মানুষ জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিণত হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা পেশা পাল্টিয়ে বাধ্য হচ্ছেন শহরমুখী হতে। তাদের এখনই সহযোগিতা করা না হলে এক সময় কৃষকই খোঁজে পাওয়া যাবে না দেশের চাহিদার সিংহভাগ ধান জোগান দেওয়া এই অঞ্চলে।

দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলী আহমদ মোরাদ বলেন, ‘আমার ইউনিয়নের প্রতিটি পরিবারই গরিব ও অসহায়। তারা তাদের জমিগুলো প্রতি বছরেই ব্যাংক থেকে, না হয় চড়া সুদে মহাজনের কাছ থেকে টাকা এনে চাষ করেন। এবার বাঁধ ভেঙে তাদের একমাত্র আয়ের উৎস বোরো জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। তাই এনজিও, ব্যাংকের কিস্তি ও মহাজনের সুদের টাকা বন্ধ রাখলে এবং সরকারি সহায়তা পেলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা কিছুটা হলেও বাঁচার সুযোগ পাবে।’

তাহিরপুর উপজেলা কৃষি অফিসার হাসান উদ দোলা বলেন, ‘এবার উপজেলার ছোট-বড় ২৩টি হাওরের ১৭ হাজার ৪৯৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ করা হয়েছে। এখনো পর্যন্ত ৪ হাজার ১৫ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে। আর কাটার উপযোগী আছে হাওরে ১ হাজার ১৮০ হেক্টরের বেশি জমির ধান। আর গতকাল পর্যন্ত ৩০০ হেক্টর পানিতে তলিয়ে গেছে। আমরা ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করছি।’ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রায়হান কবির বলেন, ‘আমরা হাওরের ফসল রক্ষায় দিন-রাত কাজ করছি। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। তবে যারা ব্যাংক, এনজিও থেকে লোন নিয়ে জমি চাষ করেছেন তাদের কিস্তির বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত এখনো আসেনি। এলে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

আপনার মন্তব্য

আলোচিত