তপন কুমার দাস, বড়লেখা

১৫ ডিসেম্বর, ২০১৫ ২১:৫৭

বড়লেখায় ৪৫ বছরেও সুরক্ষিত হয়নি একাত্তরের গণকবর

স্বাধীনতার ৪৫ বছর অতিবাহিত হলেও অরক্ষিত রয়েছে মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলার বধ্যভূমি ও গণকবরগুলো। আজও তা অযত্নে অবহেলায় পড়ে রয়েছে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় টগবগে তরুণ ছিলেন যারা আজ তারা নূহ্য। বয়সের ভারে তারা নুইয়ে পড়েছেন। তাদের মধ্য থেকে ডেপুটি মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আপ্তাব আলী, আব্দুল হান্নানসহ উপজেলার অনেক মুক্তিযোদ্ধা ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, যারা দেশমাতৃকার লড়াইয়ে পাকহানাদারদের হাতে জীবন দিল আজও তাদের বধ্যভূমি ও গণকবর অরক্ষিত। এর চেয়ে দুর্ভাগ্য আর কী হতে পারে। এ নিয়ে ক্ষোভ বিরাজ করছে মুক্তিযোদ্ধা শহীদ পরিবারের মাঝে। এলাকার লোকজনের মাঝে এসব বধ্যভূমি ও গণকবর এখন দুঃসহ স্মৃতি। বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ বড়লেখা উপজেলা কমান্ডের দেওয়া তথ্য মতে বড়লেখায় বধ্যভূমি ও গণকবরের সংখ্যা ৯টি।

সরেজমিনে স্থানীয় বাসিন্দা ও মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বড়লেখা উপজেলার হিন্দু অধ্যুষিত দাসেরবাজার ইউনিয়নে রয়েছে পাকপশুদের মানবতা হত্যার এক বেদনামাখা স্মৃতি আর তা হলো বধ্যভূমি। দাসেরবাজারের মসজিদের পাশেই এ বধ্যভূমিতে প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মীসহ অনেক বাঙালিকে হত্যা করা হয়।

লঘাটি গ্রামের ন্যাপকর্মী কুনু মিয়াকে এ বধ্যভূমিতে পাকসেনারা গুলি করে হত্যাকাণ্ডের সুচনা করে। তালুকদারপাড়া গ্রামের গোপেন্দ্র নাথ ও প্রজেশ নাথকে হত্যা করা হয় এ বধ্যভূমিতে।

লঘাটি গ্রামের নগেন্দ্র দাসকে চোখ বাঁধা অবস্থায় বধ্যভূমিতে হত্যা করে চেঙ্গিস খানের বংশধর খান সেনারা। নিজবাহাদুরপুর ইউনিয়নের নিজবাহাদুরপুর গ্রামের বিবেকানন্দ দাস নান্টুর বাড়ি সংলগ্ন একটি বধ্যভূমি রয়েছে।

উত্তর শাহবাজপুর ইউনিয়নের শাহবাজপুর হাইস্কুল টিলায় বধ্যভূমিতে দৌলতপুর গ্রামের ডা. আব্দুন নূরকে হত্যা করে পাকসেনারা। এ বধ্যভূমিতে রাতের আঁধারে আরও অনেক বাঙালিকে হত্যা করা হয়। পাশে বিডিআর ক্যাম্পের কাছে সিলেট জেলার ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার ডা. ফয়েজ আহমদকে খুন করা হয়।

দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউনিয়নের খাগালা বধ্যভূমি টিক্কা-ইয়াহিয়ার বীভৎসতা অবলোকন করেছে একাত্তর। ঘোলসা থেকে ৩ কিলোমিটার দূরে ছোটলেখা চা বাগানের সামনে পাকবাহিনী একটি বধ্যভূমি বানিয়েছিল। এ বধ্যভূমিতে ঘোলসা গ্রামের হীরেন্দ্র চন্দ্র দাস, কুটিন্দ্রমোহন দাস, বারীন্দ্র মোহন দাস, মনিন্দ্রমোহন দাসসহ অনেককেই হত্যা করা হয়। অরণ্যঘেরা এ বধ্যভূমিতে আরও কত মায়ের বুক খালি হয়েছে, পতি হারিয়ে নীরবে অশ্রুপাত করেছেন কত বধূ তা বিধাতাই জানেন।

বড়লেখা সদর ইউনিয়নের হাজীগঞ্জ বাজার জামে মসজিদ সংলগ্ন রয়েছে বধ্যভূমি। বাড়ি বাড়ি হানা দিয়ে নিরীহ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে এখানে। এ ধরনের হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন মুক্তিযুদ্ধের নেপথ্য কর্মী ইব্রাহিম আলী ওঝাঁ ও পানিধার গ্রামের জছির আলী।

হানাদার বাহিনী সিও অফিসে (বর্তমানে উপজেলা কমপ্লেক্স এর অভ্যন্তরে সমাজসেবা অফিস সংলগ্ন) গড়ে তুলেছিল ক্যাম্প। যেখানেই ক্যাম্প সেখানেই বধ্যভূমি থাকাটা একটা নিয়মে পরিণত করেছিল বর্বর পাকসেনারা। ক্যাম্পের পূর্বদিকে নিচে একটি বধ্যভূমি ঠায় দাঁড়িয়ে আছে কালের সাক্ষী হয়ে। এখানে চলত বাঙালি হত্যার উৎসব। এখানে মুক্তিযোদ্ধা কাশেম, নরসুন্দর সম্প্রদায়ের ৬ ব্যক্তিসহ অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষকে পাকিস্তানি সৈন্যরা এখানে হত্যা করে। এ বধ্যভূমিতে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক মন্তজীর আলী। তার ওপর চলেছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নারকীয় পশুবৃত্তি। মৃত্যুর হিমপরশ ফাঁকি দিয়ে অলৌকিকভাবে তিনি বেঁচে যান। এছাড়া উপজেলার নিজবাদুরপুর, তালিমপুর, সুজানগর ইউনিয়নের পাকসেনাদের অস্থায়ী ক্যাম্পের পাশে রয়েছে নাম না জানা অনেক লোকের জীবননাশের কাহিনী।

শহীদ জছির আলীর ছেলে সেলিম রেজা জানান, স্বাধীনতার ৪৫ বছর পরও পাকহানাদার বাহিনীর গুলিতে প্রাণ দেওয়া আমার বাবার শহীদের স্থান চিহ্নিত হয়েছে ঠিকই কিন্তু সরকারিভাবে বধ্যভূমি নির্মাণ করা হয়নি।

উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ও সাবেক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান সিরাজ উদ্দিন জানান, স্বাধীনতার সময় বড়লেখা বধ্যভূমি ও গণকবরগুলোর স্থান চিহ্নিত করে সংরক্ষণের জন্য তালিকা তৈরি করে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি রক্ষার জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষ থেকে বার বার দাবি জানিয়ে আসলেও অদ্যাবধি কোন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এসএম আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, অচিরেই মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি রক্ষার জন্য বধ্যভূমি ও গণকবর সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়া হবে।


আপনার মন্তব্য

আলোচিত