২৪ অক্টোবর, ২০২২ ০০:০৬
মৌলভীবাজারের বড়লেখায় অবাধে চলছে টিলার মাটি কেটে বিক্রি। পাশাপাশি ইজারা বিহীন বিভিন্ন ছড়া থেকেও অবৈধভাবে লাখ লাখ টাকার বালু উত্তোলন হচ্ছে। এসব টিলার মাটি কাটা ও বালু উত্তোলনের নেপথ্যে রয়েছেন প্রভাবশালীরা। স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করে ‘টিলা ও বালুখেকোরা’ প্রকৃতি ও পরিবেশবিধ্বংসী এসব কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে।
জানা গেছে, উপজেলার উত্তর শাহবাজপুর, দক্ষিণ শাহবাজপুর, বড়লেখা সদর, দক্ষিণভাগ উত্তর ও দক্ষিণভাগ দক্ষিণ ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে টিলা কাটা হচ্ছে। এছাড়া উপজেলার দক্ষিণ শাহবাজপুর, উত্তর শাহবাজপুর ইউনিয়নসহ বিভিন্ন এলাকার ছড়া থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে।
রবিবার উপজেলার দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউনিয়ন ঘুরে বিভিন্ন এলাকায় অবৈধভাবে টিলা কাটতে ও ছড়া থেকে বালু উত্তোলন করতে দেখা গেছে।
টিলা কাটা বন্ধে প্রশাসন মাঝে মাঝে অভিযান চালিয়ে জেল-জরিমানা করে। অভিযানের খবর পেলে কয়েকদিন টিলা কাটা বন্ধ থাকে। এরপর অভিযান না হওয়ার সবুজ সংকেতে ফের শুরু হয় টিলা কাটা। গত শুক্রবার (২১ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ৬টায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে উত্তর শাহবাজপুর ইউনিয়নে দুই ব্যক্তিকে টিলা কাটায় দুই লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এরপরও বন্ধ হয়নি টিলা কাটা।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, নামকাওয়াস্তে লোকদেখানো অভিযান চালিয়ে টিলা কাটা বন্ধ করা যাবে না। এসব বন্ধে স্থানীয় প্রশাসনকে আরও কঠোর হতে হবে।
রোববার (২৩ অক্টোবর) দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউনিয়নের সোয়ারারতল গ্রামে ফয়জুর রহমান ফয়জুলের টিলা কেটে ট্রাক্টর দিয়ে অন্যত্র মাটি নেওয়া হচ্ছে। একই গ্রামের ছফর উদ্দিন সবুরের ট্রাক্টর এসব মাটি বহন করছিল। মাটি কাটার কাজে নিয়োজিত কয়েকজন শ্রমিক জানায়, মাটি কাটা নিষেধ জানি। আমরা দিনমজুর মানুষ। পেটের দায়ে এসেছি। মালিক বলেছেন ফাঁড়ির পুলিশ ম্যানেজ আছে। কোনো সমস্যা হবে না।
সোয়ারারতল গ্রামের অদূরের দেওছড়া ও কলিরঘাট নামক এলাকায় ১৫-২০টি বালু উত্তোলনের স্পট দেখা গেছে। সেখানে কিছুদূর পরপর বালু স্তুপ করে রাখা রয়েছে। এলাকার ছড়ায় কয়েকজন শ্রমিক বালু তুলছিলেন। অপরিচত মানুষের উপস্থিতি বুঝতে পেরে তারা জাল দিয়ে মাছ ধরার ভান করেন। কেউ কেউ পালিয়ে যান। এসময় কার কথায় বালু তোলা হচ্ছে, জানতে চাইলে কয়েকজন শ্রমিক বলেন, সোয়ারারতল গ্রামের সবুর হাজী তাদের কাজে লাগিয়েছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন শ্রমিক জানান, এখানকার ট্রাক্টর মালিক সবুর হাজী, আনিসুর রহমান, জামাল মিয়া, আব্দুল খালিক, দিনার প্রমুখ অবৈধ বালু উত্তোলনে বিনিয়োগ করেন। সমস্ত দিন দৈনিক মজুরী ভিত্তিতে তারা শ্রমিক দিয়ে বালু উত্তোলন করান। তবে বেশিরভাগ সময় ভোরের দিকে বালু তোলা হয়। উত্তোলন করা বালু ছড়ার পাড়ে স্তুপ করে রাখেন শ্রমিকেরা। সন্ধ্যার পর থেকে ট্রাক্টরযোগে বিভিন্ন স্থানে এসব বালু পাচার করা হয়। প্রতি ট্রাক বালু ৪ হাজার এবং প্রতি ট্রাক্টর বালু আড়াই হাজার টাকায় বিক্রি করা হয়।
প্রশাসন বাধা দেয় কি-না জানতে চাইলে তারা বলেন, মাঝে মাঝে পুলিশ ও ভূমি অফিসের লোক পরিচয় দিয়ে কয়েকজন আসে। তারা গাড়ি আটকায়। টাকা নিয়ে চলে যায়।
শাহবাজপুর পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ এসআই মাসুক আহমদের বিরুদ্ধে টিলা কাটায় জড়িত ব্যক্তি ও বালু উত্তোলনকারীদের থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগ করেছেন স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা ও দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউনিয়ন পরিষদের এক ইউপি সদস্য।
নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউনিয়ন পরিষদের ওই ইউপি সদস্য বলেন, ‘প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তার কারণে অবৈধ টিলা কাটা ও বালু তোলা বন্ধ হচ্ছে না। অবৈধ বালু উত্তোলনস্থল ও পাচারকালে শাহবাজপুর পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ এসআই মাসুক আহমদ বালুভর্তি ট্রাক আটক করেন। পরে অদৃশ্য কারণে তিনি আইনগত ব্যবস্থা না নিয়েই ছেড়ে দেন। এতে বালু খেকোরা অনেকটা বেপরোয়া। অবৈধ মাটি ও বালুবাহী যানবাহন চলাচলে অফিস বাজার-সোয়ারারতল ইটসলিং ও কাচা গ্রামীণ রাস্তার বেহাল হয়ে পড়েছে। এতে ৪-৫ গ্রামের মানুষ চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন।’
ওই এলাকায় পাওয়া গেলে টিলা কাটা ও বালু তোলার বিষয়ে অভিযুক্ত ট্রাক্টর মালিক ছফর উদ্দিন সবুরকে। তিনি বলেন, ‘বালু তোলার সাথে আমি জড়িত নই। আর ফয়জুর রহমান তার টিলা কেটে বাড়ি ভরাট করছেন। তাই গাড়ি দিয়েছি।’
টিলা কাটায় জড়িত ব্যক্তি ও বালু উত্তোলনকারীদের থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগটি অস্বীকার করে শাহবাজপুর পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের এসআই মাসুক আহমদ বলেন, ‘কেউ যদি টাকা নিয়েছি বলে, তার-তো মুখে ধরতে পারবো না। আর দিনের বেলা টিলা কাটা কিংবা ট্রাক্টরযোগে মাটি পাচারের কোনো দৃশ্য চোঁখে পড়েনি। পড়লে অবশ্যই আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’
বড়লেখা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুনজিত কুমার চন্দ রবিবার (২৩ অক্টোবর) সন্ধ্যা ৬টায় বলেন, ‘টিলা কাটার অপরাধে গত শুক্রবার দুজনকে ২ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। পাহাড়-টিলা কাটা বন্ধে অভিযান চলমান আছে। পাহাড়-টিলা কাটায় জড়িত এবং ছড়া থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনকারীদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।’
আপনার মন্তব্য