২৬ অক্টোবর, ২০২২ ২৩:১৮
মৌলভীবাজারের বড়লেখায় চুরি যাওয়া মোবাইল ফোন উদ্ধার ও চুরির সাথে সম্পৃক্ত পেশাদার চোর মো. ফাহিদ আহমদ (২১) গ্রেপ্তার হলেও জামিন মেলেনি চুরির অপবাদে নির্যাতনের শিকার এবং চুরির মামলার সন্ধিগ্ধ আসামি বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী যুবক কলিম উদ্দিনের (২৩)।
বুধবার (২৬ অক্টোবর) দুপুরে বড়লেখা সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রট আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন চাইলে আদালত শুনানি শেষে তাকে (প্রতিবন্ধী যুবক) কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
বড়লেখা সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ জিয়াউল হক এই আদেশ দেন।
তথ্যটি নিশ্চিত করেছেন আদালতের বেঞ্চ সহকারী ইকরাম হোসেন।
মোবাইল চুরির অপবাদ দিয়ে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী যুবক কলিম উদ্দিনকে নির্যাতনের ঘটনায় গত ১৬ অক্টোবর আদালতে মামলা করেন তার ভাই ছইদুর রহমান। বড়লেখা উপজেলার নিজ বাহাদুরপুর ইউপির ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ইমাম উদ্দিন হিফজুর ও তার ভাই রাজু আহমদের বিরুদ্ধে মামলায় এমন অভিযোগ করা হয়। অভিযোগ আমলে নিয়ে আদালত মামলাটি তদন্তের জন্য সিআইডিতে পাঠান। এর দুইদিন পর নির্যাতনের শিকার বুদ্ধি প্রতিবন্ধী কলিম উদ্দিনকে মোবাইল চুরির আসামি করে থানায় মামলা করেন ইউপি সদস্য হিফজুর রহমানের ভাই রাজু আহমদ।
মামলার পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মো. জাহেদ আহমদ অভিযান চালিয়ে ২৩ অক্টোবর চুরি হওয়া মোবাইল ফোনসেটসহ পেশাদার চোর মো. ফাহিদ আহমদকে (২১) গ্রেপ্তার করেন। পরদিন ২৪ অক্টোবর ফাহিদকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায় পুলিশ। ফাহিদ বর্ণি ইউনিয়নের সৎপুর গ্রামের দেলোয়ার হোসেনের ছেলে।
আলাপকালে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মো. জাহেদ আহমদ বলেন, ‘প্রতিবন্ধী যুবককে মামলার বাদী ১৪ অক্টোবর থানায় ধরে নিয়ে আসেন। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে মনে হয়েছে সে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী। একেক সময় একেক কথা বলেছে। পরে বাদী তাকে নিয়ে চলে যান। এরপর ১৬ অক্টোবর ঐ যুবকের পরিবার আদালতে নির্যাতনের মামলা করেন। ১৮ অক্টোবর রাজু আহমদ বাদী হয়ে থানায় ঐ যুবকের নামে চুরির মামলা করেন। আমাকে মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এরপর প্রযুক্তির সাহায্যে পেশাদার চোর ফাহিদ আহমদকে গ্রেপ্তার ও তার কাছ থেকে চুরি হওয়া মোবাইল ফোনটি উদ্ধার করা হয়। ফাহিদ ভাঙ্গারী ব্যবসার আড়ালে বিভিন্ন বাসা-বাড়িতে প্রবেশ করে কৌশলে মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র চুরি করে। উদ্ধার করা মোবাইলটিও সে চুরি করেছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সে চুরির কথা স্বীকারও করে।’
চুরি হওয়া মোবাইল ফোনসহ গ্রেপ্তার মো. ফাহিদ আহমদকে গত ২৪ অক্টোবর আদালতে পাঠানোর প্রতিবেদনের শেষ দিকে তদন্ত কর্মকর্তা উপ পরিদর্শক (এসআই) মো. জাহেদ আহমদ উল্লেখ করেন, মো. ফাহিদ আহমদ প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মোবাইল চুরির কথা স্বীকার করেছে। সে আন্ত:জেলা মোবাইল চোর চক্রের সক্রিয় সদস্য। তার বিরুদ্ধে একাধিক চুরির মামলা রয়েছে। সে অত্র মামলার ঘটনার তারিখ ও সময়ে বাদীর ভাইয়ের কক্ষের দরজা খোলা পেয়ে কৌশলে ঘরের ভেতর প্রবেশ করে জব্দকরা মোবাইল ফোনটি চুরি করে নিয়া যায় মর্মে যথেষ্ট তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে।
এদিকে প্রতিবন্ধী যুবক কলিম উদ্দিনের ভাই ছইদুর রহমান বলেন, ‘আমরা কোথাও বিচার পাচ্ছি না। মেম্বার ও তার ভাই মিলে আমার ভাইকে মোবাইল চুরির অপবাদ দিয়ে তার বাড়িতে ও থানায় নিয়ে নির্যাতন করে। আমরা কোর্টে মামলা দিলাম। কারণ মেম্বার ও তার ভাইয়ের সাথে পুলিশের এসপি-ডিসিসহ সবার ভালো সম্পর্ক। পুলিশের ক্ষমতা দেখিয়ে তারা আমাদের নানাভাবে হয়রানি করছে। কোর্টে মামলা দেওয়ার দুই দিন পর মেম্বারের ভাই থানায় আমার ভাইকে আসামি করে মামলা করে। মামলার পর পুলিশ প্রকৃত চোরের কাছ থেকে মোবাইল উদ্ধার করে। চোরকেও গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠিয়েছে। এরপর আমার ভাইকে জামিন করাইতে আদালতে নিয়ে যাই। মাননীয় আদালত জামিন দেননি। আমার প্রতিবন্ধী ভাই এখনও অসুস্থ।’
অভিযোগ থেকে জানা যায়, বড়লেখা উপজেলার নিজবাহাদুরপুর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ইমাম উদ্দিন হিফজুর ও তার ভাই রাজু আহমদ পূর্ব-মাইজগ্রাম গ্রামের তছির আলীর ছেলে শারীরিক প্রতিবন্ধী কলিম উদ্দিনের বিরুদ্ধে মোবাইল ফোন চুরির মিথ্যা অপবাদ দিয়ে প্রচারণা চালান। গত ১৪ অক্টোবর ইউপি সদস্য ও তার ভাই ফোন করে তাকে তাদের বাড়িতে ডেকে নিয়ে মোবাইল চুরির জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি আদায় করতে হাত-পা বেধে বেধড়ক মারপিট করেন। প্রচন্ড নির্যাতন চালিয়ে তারা বিভিন্ন সাদা কাগজ ও ষ্ট্যাম্পে তার স্বাক্ষর আদায় করেন। পরে থানায় নিয়ে মারপিট করে কলিম উদ্দিনের (প্রতিবন্ধী যুবক) স্বীকারোক্তির একটি ভিডিও ধারণ করা হয়। এইদিন রাত আনুমানিক ১০ টার দিকে আধমরা অবস্থায় কলিমকে তার বাড়ির সামনে ফেলে যান ইউপি সদস্যের ভাই রাজু। এসময় কলিমের আর্তচিৎকারে স্বজনরা মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে বিয়ানীবাজার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে চিকিৎসা করান।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে নিজবাহাদুরপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ইমাম উদ্দিন হিফজুরের মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হয়। ফোন বন্ধ পাওয়ায় এ ঘটনায় তার বক্তব্য জানা যায়নি।
আপনার মন্তব্য