ইয়াকুব শাহরিয়ার, শান্তিগঞ্জ

১৪ এপ্রিল, ২০২৩ ১৮:৪৯

১১শ হেক্টর জমির ধানে চিটা

শান্তিগঞ্জে ব্রি-২৮ জাতের ধানে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক

বৈশাখের শুরুর আকাশে মেঘ নেই। সূর্যের চোখ রাঙানি আছে। প্রখর রোদকে সঙ্গী করে সকাল শুরু হচ্ছে প্রতিদিন। ভরদুপুরে তেতে উঠছে সূর্য। শেষ বিকালেও রোদের তেজ কমছেই না। মাঠে-ঘাটে ঠা ঠা রোদ। বৈশাখের শুরুটা বুঝিয়ে দিয়ে যাচ্ছে তার কেমন ঝাঁঝ। সূর্য ডোবার পরও শীতল হচ্ছে না চারপাশ। প্রতিদিনই বাড়ছে তাপমাত্রা। গত কয়েক দিন ধরে দেশের তাপমাত্রা বাড়ছে। বৈশাখের নির্দয় খরতাপে পুড়ছে ব্রি-২৮ ধান। এতে করে বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। আগাম ফলনের আশায় চাষ করে ছত্রাকজনিত ব্লাস্ট রোগে আক্রান্ত হওয়ায় অধিকাংশ ধানে চিটা পড়েছে। ফলে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কৃষক। উপজেলা কৃষি অফিস থেকে কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পাকা ধান কেটে নিতে।

শুক্রবার দুপুরে ডাবর সংলগ্ন দক্ষিণের হাওরে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, হাওরের কাঁচা-সবুজ ধান সোনালী রং ধরতে শুরু করলেও যেসব জমিতে ব্রি ২৮ জাতের ধান চাষ করা হয়েছে সেসব জমির প্রায় সম্পূর্ণ ধানই নষ্ট হয়ে গেছে। অর্থাৎ চিটা হয়েছে। কৃষকরা হাহুতাশ করছেন। উপজেলার প্রায় প্রতিটি হাওরেই ব্রি ২৮ জাতের ধানের জমিই এখন চিটা হয়ে আছে। কেউ কেউ বলছেন- হঠাৎ অতিরিক্ত তাপমাত্রায় ও বৃষ্টির অভাবে শান্তিগঞ্জ উপজেলার ৮টি ইউনিয়নের বিভিন্ন হাওরে ব্রি-২৮ ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। দূর থেকে ধান গাছগুলোকে স্বাভাবিকভাবে পেকে গেছে মনে হলেও ছড়ায় থাকা ধানগুলো চিটে হয়ে গেছে। স্থানীয় ভাষায় যাকে ছোঁছা বলা হয়ে থাকে। অনেক এলাকায় ধান শুকিয়ে হলুদ বর্ণ ধারণ করেছে। ফলন্ত ধানের এমন ক্ষতিতে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন চাষিরা। ধার দেনা করা টাকায় উৎপাদিত ফসলের এমন ক্ষতিতে ব্যপক লোকসানে পড়বেন ২৮ জাতের চাষিরা।

শান্তিগঞ্জ উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে শান্তিগঞ্জের উপজেলার দেখার হাওর, সাংহাই হাওর, জামখলা হাওর, খাই হাওর, কাউয়াজুরী হাওর, পিপড়াকান্দি হাওর, নাগডরাসহ ছোট বড় ১৮টি হাওরে বোরো ফসল চাষ করেছেন উপজেলার কয়েক হাজার প্রান্তিক কৃষক। এতে ২২ হাজার  ১৯৮ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ  হয়েছে। যারমধ্যে হাওরে হাইব্রিড ধান ৭ হাজার ৫ শত হেক্টর, উফশী ১০ হাজার ৭৬৪ হেক্টর, ব্রি ২৮ ১১শ হেক্টর ও স্থানীয় ১৪৫ হেক্টর এবং হাওরের বাইরে হাইব্রিড ১ হাজার ১ শত ও উফশী ৩ হাজার ১ শত হেক্টর। যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি। এ বছর ধান উৎপন্ন হবে ১ লাখ ৪১ হাজার ৭৯৮ মেট্রিকটন এবং চাল ৯৪ হাজার ৫৩২ মেট্রিক টন। যার বাজার মূল্য হবে ৩৭৮ কোটি  ১২ লক্ষ ৮০ হাজার টাকার উর্ধ্বে বলে ধারণা করছে কৃষি বিভাগ। বোরো আবাদের মৌসুমের শুরু থেকেই মাঠ পর্যায়ে নিয়মিত তদারকি, কৃষকদের পরামর্শ, প্রণোদনা বীজ- সার ও কৃষি যন্ত্রাংশ বিতরণের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক কৃষকের পাশে থাকায় হাওরে এবার ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা বেড়েছে বলে দাবি কৃষি বিভাগের।

উপজেলার ডাবর সংলগ্ন ডুকলাখাই হাওরের কৃষক শরিফ মিয়া, দক্ষিণ বন্দের কৃষক তারিফ মিয়া ও পশ্চিম বীরগাঁও ইউনিয়নের টাইলা গ্রামের কৃষক সাজিদুর রহমান বলেন, ব্রি ২৮ জাতের ধান কাটার মতো না। সব ধান চিটা হয়ে গেছে। তাই এসব জমি আর কাটবো না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। টাইলার অনেক কৃষকেরই ২৮ এর ধান নষ্ট হয়েছে। এটা কৃষকের জন্য অনেক ক্ষতিকর। কৃষি অফিসের ফর্মুলা অনুযায়ী সব করেছি তবু ধান নষ্ট হয়েছে। এ জাতের ধান আর চাষ করবো না।

শান্তিগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা খন্দকার সোহায়েল আহমেদ বলেন,  এ বছর প্রায় ১১শ হেক্টর জমিতে ব্রি ২৮ জাতের ধান চাষ করেছিলেন কৃষকরা। আমরা নিরুৎসাহিত করেছি। অভ্যাসগত কারণেই মূলত কৃষকরা ২৮ এর দিকে ঝুকেছিলেন। তারপরও ফলন ভালো হতো যদি  সঠিকভাবে পর্যাপ্ত পরিমানে কীটনাশক স্প্রে করা যেতো। কিন্তি এসময় পানি স্বল্পতা দেখা দেয়, তাই যথাযতভাবে সেটা করা যায়নি। পাশাপাশি ধানে ফুল আসার সময় খরা থাকলে ধানে চিটা হয। এবছর খড়া ছিলো  একারণে চিটা হয়ে যায় ফসল। ব্রি ২৮ এ ধানে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বলে আমরা কৃষকদের বিকল্প ধানে উৎসাহিত করছি। এ ব্যপারে আমার সহকর্মীরা মাঠ পর্যায়ে কাজ করছেন। এ বছর যারা ব্রি- ৮৮ ধান করেছেন তারা এমন সমস্যায় পড়েন নি। সামনের বছরগুলোতে বেশি করে ব্রি ৮৮, ব্রি ৮৯ করার পরামর্শ দিব। যেসব কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তাদের ব্যপারে আমার উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলবো। আগামী মৌসুমে তাদেরকে সব ধরণের সহযোগিতা করার চেষ্টা করবো। কৃষকের ক্ষতির বিষয় জানালে প্রণোদনা দেয়ার সময় তাদের অগ্রাধিকার দিব।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত