২৯ এপ্রিল, ২০২৬ ০০:১৬
হাওর বেষ্টিত বানিয়াচং ও এর পার্শ্ববর্তী হাওরগুলোতে বজ্রপাত এখন এক ‘আতঙ্কের’ নাম। প্রতি বছর বোরো ধান কাটার মৌসুমে কিংবা বর্ষার শুরুতে বজ্রপাতে অকালে প্রাণ হারাচ্ছেন কৃষক ও মৎস্যজীবী। হাওরের বিস্তীর্ণ খোলা প্রান্তরে বজ্রপাত থেকে বাঁচার মতো কোনো নিরাপদ আশ্রয় না থাকায় মৃত্যুঝুঁকি আরও প্রকট হচ্ছে।
এই বাস্তবতায় প্রতিটি হাওড়ে পর্যাপ্ত বজ্র্রপাত নিরোধক দন্ড এবং বহুমুখী আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপনের দাবি এখন গণদাবিতে পরিণত হয়েছে।
ভৌগোলিক কারণে বাংলাদেশের হাওরাঞ্চল বজ্রপাতের হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত। বিশেষ করে চৈত্র-বৈশাখ মাসে যখন কালবৈশাখীর তান্ডব শুরু হয়, তখন হাওরের খোলা মাঠে কাজ করা কৃষকরা সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েন। আশেপাশে কোনো উঁচু গাছ বা দালান না থাকায় মানুষের শরীরই বজ্রপাতের সহজ লক্ষ্যবস্তুুতে পরিণত হয়। কেবল নিরোধক দন্ড নয়, প্রতিটি বড় হাওড়ে নির্দিষ্ট দূরত্ব পরপর কংক্রিটের ছোট ছোট আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের দাবি উঠেছে। এসব আশ্রকেন্দ্র্রে বজ্রপাত নিরোধক ব্যবস্থা থাকবে, যেখানে ঝড়বৃষ্টির সময় কৃষকরা নিরাপদে অবস্থান করতে পারবেন। এছাড়া এসব স্থাপনা কৃষকদের দুপুরের খাবার খাওয়া বা বিশ্রামের জায়গা হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে।
সরেজমিনে হাওর এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, মাইল কে মাইল বিস্তৃত ফসলের মাঠে কৃষকদের বিশ্র্রামের বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে বাঁচার কোনো জায়গা নেই। হঠাৎ আকাশ কালো করে মেঘ এলে এবং বজ্রপাত শুরু হলে কৃষকরা দিগি¦দিক জ্ঞানশূন্য হয়ে দৌড়াতে থাকেন। অনেক সময় জমির আইলে বা খোলা জায়গায় উপুড় হয়ে শুয়ে থেকেও শেষ রক্ষা হয় না।
উপজেলার ৫নং দৌলতপুুর ইউনিয়নেরর হাওর পাড়ের এক কৃষক হোসেন আলী আক্ষেপ করে বলেন, "আকাশে মেঘ ডাকলে কলিজা শুকাইয়া যায়। কিন্তু কি করমু? মাঠের পাকা ধান তো আর ফালাইয়া থুইয়া আসা যায় না। একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই থাকলে হয়তো আমাগো ভাই-বন্ধুগুলারে অকালে মরতে হইত না।"
আজমিরীগঞ্জ রোড সংলগ্ন হাওরের কৃষক আরশাদ আলী (৪৮) বলেন, আকাশে কালা মেঘ দেখলেই হাত-পাও কাঁপন ধরে। কিন্তু কী করমু ? এই ধান না কাটলে পোলাপান না খাইয়া থাকব। গত বছর আমার চোখের সামনে পাশের জমিতে একজন মরছে, সেই দৃশ্য মনে পড়লে কলিজা শুকাইয়া যায়। আমরা এখন ধান কাটতে মাঠে যাই জান হাতে নিয়া।
বানিয়াচং ১নং উত্তর-পূর্ব ইউনিয়নের কৃষক বাছির মিয়া বলেন, হাওরের মাঝখানে কোনো গাছ নাই, কোনো ঘর নাই। মেঘ ডাকলে দৌড়াইয়া কই যামু? এক হাঁটু কাদার মধ্যে দৌড়ানো যায় না। অনেক সময় ট্রলি বা মেশিনের নিচে লুকাই, কিন্তু তাতেও কি রক্ষা আছে? সরকার যদি মাঠে ছোট ছোট খুপরি বা আশ্রয়কেন্দ্র বানাইয়া দিত, তবে অনেক জান বাঁচত।
ক্ষুদ্র কৃষক লতিফ খান জানান, বজ্রপাত তো আমাগো মত গরিবের আজরাইল। বড়লোকেরা তো ঘরে বইসা বৃৃষ্টি দেখে, আর আমরা মরণ তুফান মাথায় নিয়া ধান কাটি। ঘরে মা-বউ কান্নাকাটি করে মাঠে পাঠাইতে চায় না, কিন্তু পেটের দায় বড় দায়। মরি তো মাঠেই মরুম, তবুও ধান ফেলে আসা সম্ভব না।
বানিয়াচংয়ের সচেতন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, প্রতিটি হাওড়ে অন্তত ৫০০ মিটার বা এক কিলোমিটার অন্তর একটি করে পাকা আশ্রয়কেন্দ্র করা জরুরী। এতে বজ্রপাতের সময় দৌড়ে গিয়ে মানুষ আশ্রয় নিতে পারবে।"
এ বিষয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিস কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলা হলে তারা জানান, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে কিছু প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। হাওরাঞ্চলে বজ্রপাত নিরোধক দন্ড স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হচ্ছে। তবে বরাদ্দ সীমাবদ্ধতার কারণে সব হাওড়ে একসাথে কাজ শুরু করা সম্ভব হচ্ছে না।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ এনামুুুল হক জানান, "বজ্রপাত থেকে বাঁচতে আমরা কৃষকদের সচেতন করছি। তবে অবকাঠামোগত সুরক্ষা (যেমন আশ্রয়কেন্দ্র) নিশ্চিত করা গেলে প্র্রাণহানি শূন্যে নামিয়ে আনা সম্ভব হবে।
আপনার মন্তব্য