২৮ এপ্রিল, ২০২৬ ১৯:৫৮
শান্তিগঞ্জ উপজেলায় স্বস্তি নেই কৃষকদের মাঝে। পাহাড়ি ঢল আর অতিবৃষ্টিতে চোখের সামনেই জলাবদ্ধতার পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে দেখার হাওরের পাকা ধান। শ্রমিক সংকট থাকায় কোনোভাবেই কাটা যাচ্ছে না এসব ধান।
উপজেলা কৃষি অফিস থেকে কম্বাইন হারভেস্টারের কথা জানানো হলেও হাওরে পানি থাকার কারণে সেসব হারভেস্টার মেশিন জমিতে নামানো যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন কৃষকরা।
তাঁরা জানিয়েছেন, চাহিদা মতো শ্রমিকও পাওয়া যাচ্ছে না। আর পাওয়া গেলেও তাদের মজুরি হাঁকানো হচ্ছে খুব বেশি। ১ জন শ্রমিক নিয়োগ দিতে গুতে হচ্ছে ১ হাজার টাকা। এক মন ধান বিক্রি করতে চাইলে ফরিয়া বাজরা দাম বলছেন ৭ থেকে ৮শ’ টাকা। সে হিসেবে ১ মন ধানেও মিলছে না একজন ধান কাটার শ্রমিক। কৃষকরা বলছেন, চোখের সামনেই ডুবে যাচ্ছে সোনালী ফসল। কিছুই করতে পারছেন না তাঁরা।
মঙ্গলবার বিকালে দেখার হাওরে উথারিয়া ক্লোজার অংশে সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, এই হাওরে এখনো অথৈ পানি আসে নি। তবে প্রতিটি জমিতে ধানের নিচে আছে যথেষ্ট পানি। এই পানি ধীরে ধীরে পাকা ধানকে নষ্ট করে ফেলছে। দেখা যায়, হাওরের ছাইয়া কিত্তা, পাঁচহাল, গাঁওরবন্দ ও ধরের কিত্তাসহ বেশ কিছু অংশের ধান কাটা প্রায় শেষ। সামন্য কিছু বাকি আছে। অপরদিকে, হাওরের ডাউক্কা, খাউয়ানী, বারোঘর, গুড়াডুবা, মেলানী ও লোহাকুচিসহ বাকী সব অংশই ধানে সোনালী রং ধরে আছে। যতদূর চোখ যায় শুধু সোনালী ধানের দৃশ্য। ধানগুলো পেকে আছে, কাটার অপেক্ষায়।
দেখার হাওরে দেখা মিলে আস্তমা, আসামপুরের কৃষক আঙ্গুর মিয়া ও মোবারক হোসেনের। তারা জানান, হাওরে ধান পেকে আছে। নিচে পানি থাকায় হারভেস্টার মেশিন নামানো যাচ্ছে না। প্রচণ্ড বৃষ্টিপাতে ক্রমশ বাড়ছে হাওরের পানি। শ্রমিক ছাড়া ধান কাটার কোনো বিকল্প আপাতত নেই। এখন শ্রমিক মেলানোই আসল সমস্যা। কোনোভাবেই ধান কাটার এতো শ্রমিক মেলানো যাবে না। মিললেও প্রতি শ্রমিকে ১ হাজার টাকা। এক মন ধানেরও দাম এখন ১ হাজার টাকা নয়। চোখের সামনেই আমাদের ধান তলিয়ে যাচ্ছে শুধু মাত্র শ্রমিক সংকটের কারণে। যেভাবে বৃষ্টিপাত হচ্ছে যদি আর দু’দিন হতে থাকে তাহলে হাওর পানিতে টইটম্বুর হয়ে যাবে। আমাদের আর কিছুই থাকবে না। তাই, সমাজের সকলের প্রতি আহ্বান সবাই যদি হাওরমুখী একেকজন কৃষককে সাহায্য করেন তাহলে হয়তো কিছু হলেও সাহায্য হবে।
পাগলার ডাবর এলাকার বড়কূল হাওরের কৃষক আইনুল হক। তিনি জানান, তাঁর পরিচিত একজন বড় কৃষকের নাম গফুর আলী। আগামীকাল (আজ) দেখার হাওরে তাঁর ধান কাটতে ৩০ জন শ্রমিককে ৩০ হাজার টাকা দিয়ে বুকিং করেছেন তিনি৷ সকাল থেকে ধান কাটার কথা। গফুর আলী সাহেবের সামর্থ্য আছে বেশি টাকা দিয়ে শ্রমিক নেওয়ার, আমাদের মতো গরিব কৃষকরা এতো টাকা মূল্য দিয়ে কীভাবে শ্রমিক দিয়ে ধান কাটাবে? এদিকে, একমন ধানের দামও এখন ১ হাজার টাকা না।
শান্তিগঞ্জ কৃষি কর্মকর্তা আহসান হাবীব জানিয়েছেন, এ বছর শান্তিগঞ্জ উপজেলায় হাওর-নন হাওর মিলিয়ে ২২ হাজার ৬১২ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ করা হয়েছিলো৷ এর মধ্যে শুধু হাওরে ১৮ হাজার ৩৮১ হেক্টর। যা থেকে ১০ হাজার ৪২৫ হেক্টর ধান কাটা শেষ, যা হাওরে রোপন কত মোট ধানের প্রায় ৫৭ শতাংশ। নন হাওরের ধান খুব একটা ঝুঁকিতে নেই। এ পর্যন্ত নন হাওরে রোপন হয়েছে ৪ হাজার ২৪১ হেক্টর যার ১০ শতাংশ কর্তন সম্পন্ন হয়েছে।
তিনি বলেন, কম্বাইন হারভেস্টার মেশিন একেবারে যে ব্যবহার করা যাচ্ছে না তা না। পূর্ব বীরগাঁও, পশ্চিম বীরগাঁও, দরগাপাশাসহ বেশ কয়েকটি ইউনিয়নে ব্যবহার করা হচ্ছে। দেখার হাওরেও বেশ কিছু জমিতে এই মেশিন কাজ করছে। ৮ ইঞ্চি পানিতে নেমে এই মেশিন কাজ করতে পারে। যেসব জমিতে এই মেশিন কাজ করতে পারছে না সেসব জমিতেই শুধু শ্রমিকের প্রয়োজন।
এই কৃষি কর্মকর্তা জানান, জেলার সিদ্ধান্ত অনু্যায়ী শ্রমিক সংকট কাটাতে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী ও রাজনৈতি সংগঠনকে আহ্বান জানানো হয়েছে যে, কৃষকদের পাশে দাঁড়ান। সমাজের উপকারে সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমরা এই সংকট মোকাবিলা করতে হবে। জামালগঞ্জে এক কৃষাণীর ধান কেটে দিয়েছেন আনছার বাহিনী। সকলের সহযোগিতায় আমরা এবার বৈশাখী ধান ঘরে তুলতে হবে।
আপনার মন্তব্য