১৩ জানুয়ারি, ২০১৬ ১৮:৫৩
সিলেট সিটি কর্পোরেশনের বর্জ্যে অস্তিত্ব সঙ্কটে পড়েছে ২০ একর এলাকার বিল। নষ্ট হচ্ছে প্রায় ২শ’ একর কৃষি জমি। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন স্থানীয় মৎস্যজীবী ও কৃষিজীবীরা। দূষিত হচ্ছে এলাকার পরিবেশ। বর্জ্য সংরক্ষণ এবং বিল ও কৃষি জমি রক্ষায় সম্প্রতি সিলেট সিটি কর্পোরেশনের কাছে আবেদন জানিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষি ও মৎস্যজীবীরা।
সিলেট সিটি কর্পোরেশন সূত্রে জানা যায়, নগরের বর্জ্য ফেলার জন্য নগরীর উপকণ্ঠের দক্ষিণ সুরমার লালমাটিয়া এলাকায় প্রায় ১২ একর ভূমিতে ভাগাড় তৈরি করেছে সিসিক। প্রায় ২০ বছর ধরে নগরের সব আবর্জনা ফেলা হয় এই ভাগাড়ে। নগরের বিভিন্ন এলাকা থেকে ট্রাকে করে প্রতিদিন গড়ে ২শ’ মেট্রিক টন আবর্জনা জমা হয় এখানে।
তবে ভাগাড়ের পেছনের দিকে সীমানা দেওয়াল না থাকায় তা ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের এলাকায়। এতে নষ্ট হয়ে পড়ছে আশপাশের কৃষিজমি ও মাছের আঁধার। নষ্ট হচ্ছে পরিবেশ।
ভাগাড়ের পেছনেই জেলা প্রশাসকের খতিয়ানভূক্ত প্রায় ২০ একরের বিল। যা ভাড়েরা বিল নামে পরিচিত। বিলের পাশেই বিশাল হাওর। দক্ষিণ সুরমা উপজেলার কুচাই ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামের বাসিন্দাদের মাছ ও ধানের আঁধার এই বিল ও হাওর।
বিলের পার্শ্ববর্তী ছিটা গোটাটিকর ও ধোপাপাড়া এলাকার বাসিন্দাদের জীবিকাও নির্ভরশীল এই বিলের উপর। মৎস্যজীবী এই দুই গ্রামবাসী বিল থেকে মাছ সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করেন।
এই দুই গ্রামের বাসিন্দাদের অভিযোগ, সিটি কর্পোরেশনের আবর্জনা গড়িয়ে এসে এই বিল প্রায় ভরাট হয়ে পড়েছে। আলকাতরা কালো হয়ে গেছে পানি। ফলে শুষ্ক মৌসুমে বিলে এখন পানি থাকে না। বর্ষা মৌসুমে পানি থাকলেও পানি বিষাক্ত হওয়ার কারণে মাছ পাওয়া যায় না। এতে অস্তিত্ব সঙ্কটে পড়েছে ভাড়েরা বিল।
মনোরঞ্জন তালুকদার নামের স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, এখন পুরো বিল প্রায় ভরাট হয়ে গেছে। ফলে বেকার হয়ে পড়েছেন এখানকার শতাধিক মৎস্যজীবী।
তিনি বলেন, বর্জ্যরে মধ্যে থাকা লোহা, কাঁচ ও ইঞ্জিকেশনের সিরিঞ্জের কারণে এই বিলে মাছ ধরতে নেমে অনেক মৎস্যজীবীরা হাত-পা কেটে গেছে। ফলে এখন ভয়েও অনেকে বিলে নামতে চায় না।
কেবল বিলই নয়, সিটি কর্পোরেশনের বর্জ্যের কারণে নষ্ট হচ্ছে ভাগাড় পার্শ্ববর্তী কৃষি জমিও।
স্থানীয় কৃষকরা জানান, বর্ষা মৌসুমে ভাগাড় থেকে ভেসে এসে আশপাশের কৃষিজমিতে আবর্জনার স্তূপের সৃষ্টি হয়। ফলে এই জমিতে আর ধান রোপণ করা সম্ভব হয় না।
আজমল মিয়া নামের ক্ষতিগ্রস্ত এক কৃষক বলেন, আবর্জনার স্তূপ অপসারণ করতে গেলে প্রচুর টাকার প্রয়োজন। এতো বিশাল অংকের টাকা ব্যয় করার ক্ষমতা কৃষকদের নেই। তিনি বলেন, আমি ১৫ হাজার টাকা খরচ করে আমার জমি থেকে আবর্জনা সরিয়েছি। তবু জমিতে ফসল হচ্ছে না। এই এলাকার প্রায় ২শ’ একর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে জানান তিনি।
এসব ক্ষয়ক্ষতির কথা উল্লেখ সম্প্রতি সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে আবেদন করেছেন স্থানীয় এলাকাবাসী।
আবেদনকারীদের একজন শামীম কবীর বলেন, সিটি কর্পোরেশনের বর্জ্যে এলাকার ধান ও মৎস্যভান্ডার মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়া পরিবেশের ক্ষতি তো হচ্ছেই। ফলে ভাগাড়ের ভেতরে আবর্জনা সংরক্ষণের জন্য আমরা সিটি কর্পোরেশনের কাছে আবেদন জানিয়েছি।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন, সিলেটের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল করিম কিম বলেন, সিলেট সিটি কর্পোরেশন হওয়ার এতদিন পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা হয়নি। ফলে নগরীর প্রবেশমুখেই উন্মুক্তভাবে ময়লার স্তূপ ফেলে রাখা হচ্ছে।
তিনি বলেন, সিটি কর্পোরেশন যে জায়গায় ভাগাড় তৈরি করেছে সেটাও একসময় জলাভূমি ছিলো। শীত মৌসুমে অতিথি পাখিরা এখানে আসতো। ভাগাড় তৈরি সময়ই এর দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছিলো। কিন্তু নগর কর্তৃপক্ষ না কানে নেয় নি। এখন স্থানীয় বাসিন্দারা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করেছেন।
এ ব্যাপারে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এনামুল হাবীব বলেন, আবর্জনা তো কোথাও না কোথাও ফেলতে হবেই। আর আবর্জনা ফেললে কিছু ক্ষতি তো হবেই। তবু ক্ষতি প্রশমনের জন্য আমরা ভাগাড়ের সামনের দিকে দেয়াল নির্মাণ করেছি। ভেতরে প্রায় দেড় কোটি টাকা ব্যয় করে সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে।
তবু কিছু আবর্জনা আশপাশে ছড়িয়ে পড়তে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আশপাশের বেশিরভাগ জমিই সরকারী খাস জমি। ফলে কোনো ব্যক্তিবিশেষ এতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা নয়।
এনামুল হাবীব বলেন, সিলেট নগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য বিশ্বব্যাংক আমাদের একশ’ কোটি টাকা প্রদানের আশ্বাস দিয়েছে। এ ব্যাপারে আলাপ আলোচনা চলছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সম্ভব হলে এ ধরণের সমস্যা আর থাকবে না।
আপনার মন্তব্য