১৪ নভেম্বর, ২০২৩ ০০:৫৮
পর্যটক ভিসায় কানাডা রওয়ানা দেওয়া সিলেটের বেশ কয়েকজন যাত্রীকে ঢাকা শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আটকে দিয়েছে বাংলাদেশ বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। বিমানবন্দর থেকে ফেরত আসা যাত্রীদের সংখ্যা প্রথমে ৪২ শোনা গেলেও পরে জানা গেছে ৪৫ জনকে বিমানবন্দরেই আটকে দেয় বিমান কর্তৃপক্ষ।
আমন্ত্রণপত্র সঠিক না থাকার অভিযোগ এনে এই ৪৫ যাত্রীকে অফলোড করে ফেরত পাঠায় বিমান কর্তৃপক্ষ।
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এই ঘটনাটি ঘটেছে গত ৭ নভেম্বর। তবে ১২ নভেম্বর বিষয়টি জানাজানি হয়। এরপর থেকে এ ঘটনা নিয়ে সিলেট চলছে তোলপাড়। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন- বৈধ ভিসা থাকা সত্ত্বেও বিমান কর্তৃপক্ষ কেন যাত্রীদের আটকাবে? বিমানের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অবৈধ সুবিধা আদায়ের জন্য যাত্রী হয়রানি ও জিম্মি করারও অভিযোগ ওঠেছে। এনিয়ে বিমান কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ক্ষোভ প্রকাশ করছেন অনেকে।
তবে বিমান কর্তৃপক্ষ বলছে, কানাডা ইমিগ্রেশনের মতামতের ভিত্তিতে নিয়ম মেনেই এই যাত্রীদের কানাডা যেতে দেওয়া হয়নি। একটি ভুয়া বিয়ের আমন্ত্রণে এই ৪৫ জন একসাথে কানাডা যেতে চাচ্ছিলেন। কানাডায় থাকার জন্য হোটেলও বুকিং দেননি তারা।
বিমান কর্তৃপক্ষের দাবি, সব এয়ারলাইন্সেই বিদেশি যাত্রী পরিবহনের ক্ষেত্রে কাগজপত্র যাছাই বাছাই করে। কারণ ভুয়া কাগজপত্রের যাত্রী পরিবহন করলে এয়ারলাইন্সকে বড় অংকের জরিমানা গুনতে হতো।
কানাডার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়ে ৭ নভেম্বর ঢাকা বিমানবন্দরে আটকে যাওয়া যাত্রীদের মধ্যে দুজনের সাথে কথা হয় সোমবার। তারা সিলেটের দক্ষিণ সুরমার কাস্তরাইল এলাকার বাসিন্দা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে তাদের একজন সিলেটটুডে টোয়েন্টিফোরকে বলেন, কানাডার টরেন্টোতে আমার ভাগনির বিয়ে ছিলো। সেই বিয়েতে অংশ নিতে অ্যাম্বেসিতে সকল কাগজপত্র জমা দেয়ার পর কানাডা আমাদের ভিসা দেয়। আমাদের ফ্লাইট ছিলো সিলেট-ঢাকা-কানাডা। ৬ নভেম্বর সিলেট ওসমানী বিমানবন্দরে সব কাগজপত্র পরীক্ষা করেই আমাদের বোডিং পাস দেয়া হয়।
তিনি বলেন, ৭ নভেম্বর ঢাকা থেকে বিমানে টরেন্টো রওয়ানা দেওয়ার কথা। কিন্তু শাহজালাল বিমানবন্দরে আমাদের অনেকক্ষণ বসিয়ে রেখে বিমানের এক কর্মকর্তা এসে বলেন- আমাদের হোটেল বুকিং নেই। পরে আমরা হোটেল বুকিং করে সব তার কাগজপত্র তাকে প্রদান করি।
তিনি আরও বলেন, এরপর ওই কর্মকর্তা আমাদের জানান, কানাডা ইমেগ্রেশন কর্তৃপক্ষের কাছে তারা আমাদের ব্যাপারে ই-মেইল করেছেন। সেখান থেকে ক্লিয়ারেন্স না আসলে আমরা যেতে পারবো না। এভাবে নানা অজুহাতে আমাদের অনেকক্ষণ বিমানবন্দরে বসিয়ে রেখে পরে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। এসময় বিমানের এক কর্মকর্তা তাদের কাছে টাকা দাবি করেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
এই পরিবারের আরেক সদস্য সিলেটটুডে টোয়েন্টিফোরকে বলেন, আমাদের ভিসা আছে। বিয়ের কার্ড, হল বুকিং সবই আছে। তারপরও তারা কেন আমাদের আটকাবে। বিমান কর্তৃপক্ষ আমাদের আটকানোর কে? আমাদের কাগজপত্রে কোন সমস্যা থাকলে কানাডা যাওয়ার পর সেখানকার বিমানবন্দরে ইমেগ্রেশন কর্তৃপক্ষ আটকাতে পারে। কিন্তু কানাডা ভিসা দেওয়ার পরও বিমান কর্তৃপক্ষ আটকাবে কেন?
তিনি অভিযোগ করে বলেন, বিমানের একটি সিন্ডিকেট অবৈধ সুবিধা আদায়ের জন্যই এমনটি করেছে। এরআগে তারা ট্যুরিস্ট ভিসায় দুবাই যাত্রীদেরও এভাবে হয়রানি করতো। তাদের সাথে কন্ট্রাক্ট করেই দুবাই যেতে হতো। এখন যেহেতু অনেক লোক কানাডায় যাচ্ছে তাই তারা এরকম সিন্ডিকেট গড়ে তুলতে যাচ্ছেন।
কানাডা যেতে না দিয়ে তাদের হেনস্তা ও আর্থিক ক্ষতির প্রতিকার চেয়ে আইনি পদক্ষেপ নেবেন বলেও জানান তিনি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে কানাডা পর্যটক ভিসা সহজ করায় সিলেট থেকে এই ক্যাটাগরির ভিসায় কানাডা যাওয়ার হিড়িক পড়েছে। পর্যটক ভিসায় কানাডায় গিয়ে অনেকে সেখানে থেকে যাওয়ারও চেষ্টা করছেন। পর্যটক ভিসায় কানাডা যেতে সে দেশে বসবাসরত কারো কাছ থেকে আমন্ত্রণপত্র আনাতে হয়। বিভিন্ন এজেন্সি মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে আমন্ত্রণপত্রসহ ভুয়া বিভিন্ন কাগজপত্র তৈরি করে যাত্রীদের বিপদে ফেলার অভিযোগ রয়েছে।
বিমানের একটি সূত্র জানিয়েছে, যে বিয়ের আমন্ত্রণে ৭ নভেম্বর ৪৫ জন কানাডা যেতে চাচ্ছিলেন সেই একই বিয়ের আমন্ত্রণে আরও প্রায় ৩০ জন গত মাসে কানাডা গিয়েছেন।
হযরত শাহজালাল (রহ.) বিমানবন্দরের একটি সূত্র জানায়, ৬ নভেম্বর রাতে ওই ৪৫ জন ট্রানজিটে অপেক্ষা করার সময় বিমানের পাসপোর্ট চেকিং ইউনিটের সদস্যদের সন্দেহ হয়। তারা দেখতে পান, ওই যাত্রীদের প্রায় সবার সাদা পাসপোর্টে কানাডার ভিসা লাগানো। এতে তাদের সন্দেহ আরও বাড়ে। এসময় বিমান কর্মকর্তারা তাদের আমন্ত্রণপত্র ও হোটেল বুকিং দেখতে চান। তখন তারা দেখতে পান, ওই যাত্রীদের সবাই একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে অংশ নিতে কানাডা যাচ্ছেন। আর হোটেল বুকিংয়ের পরিবর্তে তারা কিছু বাড়ি ভাড়ার কাগজপত্র দেখান।
এ প্রসঙ্গে সোমবার বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সিলেট কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক আব্দুস সাত্তার সিলেটটুডে টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ঘটনাটি শাহজালাল বিমানবন্দরে ঘটেছে। আমি যতদূর শুনেছি তাদের আমন্ত্রণপত্রে কানাডায় গিয়ে হোটেলে থাকার কথা উল্লেখ থাকলেও তারা সেখানে হোটেল বুকিং না করে বাসা ভাড়া করেন। এ থেকে বিমান কর্তৃপক্ষের সন্দেহ হয়। এরপর খোঁজ নিয়ে আরও কিছু কাগজপত্রে গরমিল পাওয়া যায়। তখন কানাডার অ্যাম্বেসিকে তাদের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে, অ্যাম্বেসি থেকে জানানো হয়, তাদের ‘ডকুমেন্ট ফলস’। তাদের আইন অনুযায়ী এটা ফায়ার কোড ভায়োলেশন।
কানাডা ইমিগ্রেশনের বদলে বাংলাদেশ বিমান থেকে এসব কাগজপত্র পরীক্ষা করবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, যাত্রীর সব কাগজপত্র পরীক্ষার দায়িত্ব এয়ারলাইন্সের। সব এয়ারলাইন্সই এটি করে। কারণ ভুল ডকুমেন্টে যাত্রী নিলে এয়ারলাইন্সকে বড় অংকের জরিমানা গুনতে হয়।
একই তথ্য জানিয়েছেন অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্ট বাংলাদেশ (আটাব) সিলেটের সাবেক সভাপতি আব্দুল জব্বার জলিলও। তিনি সিলেটটুডে টোয়েন্টিফোরকে বলেন, সব এয়ারলাইন্সেই ভিসা পরীক্ষা করার জন্য একজন প্রশিক্ষিত কর্মকর্তা থাকেন। তারা ভিসা ভালো করে পরীক্ষা করে থাকেন। যাত্রীর ব্যাপারে সন্দেহ হলে অন্য কাগজপত্রও তারা দেখতে পারেন। কারণ যাত্রীকে গন্তব্য থেকে ফেরত পাঠালে এয়ারলাইন্সকে মোটা অংকের জরিমানা গুনতে হয়। কানাডার ক্ষেত্রে যাত্রীপ্রতি প্রায় ১৯০০ ডলার জরিমানা দিতে হয় এয়ারলাইন্সকে। এই জরিমানা থেকে বাঁচতেই তারা কাগজপত্র পরীক্ষা করে।
তবে কাগজপত্র পরীক্ষার নামে অনেকসময় যাত্রীদের হয়রানি করা হয়, বৈধ যাত্রীদেরও আটকে দেওয়া হয় এবং অবৈধ সুবিধা নেওয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, যাত্রী পরিবহন না করলেও তো তাদের আর্থিক ক্ষতি হয়। এছাড়া হয়রানি করলে যাত্রীরা তো বিমানের বদলে অন্য এয়ারলাইন্সের দিকে ঝুঁকবে। এতে তারা আরও বড় ক্ষতির মুখে পড়বে।
আপনার মন্তব্য