নিজস্ব প্রতিবেদক

১৯ জুন, ২০২৫ ১৩:৩৪

সিলেট-ঢাকা মহাসড়ক: ছয় লেন আর চার লেনে উন্নীতের কাজে ধীরগতি, দুর্ভোগ চরমে

ঈদের ছুটি শেষে কাজে যোগ দিতে শনিবার (১৪ জুন) রাতে বাসে করে ঢাকায় রওয়ানা দেন আব্দুল কাইয়ুম। সিলেটের জকিগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা কাইয়ুমস ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন।২৩৫ কিলোমিটার দুরত্বের সিলেট থেকে বাসে করে ঢাকা যেতে সময় লাগে প্রায় ৬ ঘন্টা। সে হিসেবে ভোরের আগেই সাইফুল ইসলামের ঢাকায় পৌঁছে যাওয়ার কথা। কিন্তু তিনি তিন গিয়ে পৌঁছান পরদিন সকাল ১১টায়। ঢাকা যেতে তার সময় লাগে প্রায় ১১ ঘন্টা।

বিরক্তকর এই ভ্রমণ অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে কাইয়ুম বলেন, এই সড়ক সম্প্রসারণের কাজ চলছে। তাই সড়কের অনেকটা জুড়ে মাটি, বালু, পাথরসহ বিভিন্ন সামগ্রী পড়ে আছে। বৃষ্টির কারণে মাটি ছড়িয়ে পুরো সড়ক কাদাময় হয়ে পড়ে। এতে দুর্ঘটনা এড়াতে যানবহানের গতি কমিয়ে আনতে হয়।

তিনি বলেন, সিলেট থেকে মাধবপুর পর্যন্ত তবু মোটামুটি গতিতে গাড়ি চলেছে। কিন্তু ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ঢুকার পর থেকেই দীর্ঘ যানজটে পড়তে হয়। এই যানজট একেবারে ঢাকা পর্যন্ত ছিলো। ফলে ৫ মিনিট গাড়ি চলে তো আধাঘন্টা থেমে থাকে- এভাবেই আসতে হয়েছে।

এই অভিজ্ঞতা সাম্প্রতিক সময়ে সিলেট-ঢাকা সড়কে চলাচলকারী প্রায় সব যাত্রীদেরই। ভাঙাচোরা এই সড়কে সবসময়ই লেগে থাকে যানজট। সবচেয়ে বেশি যানজট হয় ব্রাহ্মনবাড়িয়ার সরাইল বিশ্বরোড থেকে নারায়নগঞ্জের কাঁচপুর পর্যন্ত অংশে। এতে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে প্রায় দিগুণ সময় লাগে গন্তব্যে পৌছতে। ঈদের মতো উপলক্ষ্যে সড়কে যানবাহন ও যাত্রীর চাপ বাড়লে তো পরিস্থিতি আরও নাজুক আকার ধারণ করে। ৫/৬ ঘন্টার পথ পেরোতে ১৬/১৭ ঘন্টাও লেগে যায়। এতে করে এই সড়ক দিয়ে চলাচলকারী যাত্রীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। এই সড়কে দুটি প্রকল্পের কাজ চলমান থাকায় এমন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে বলে জানা গেছে।

জানা যায়, ঢাকা-সিলেট-তামাবিল মহাসড়ক ছয় লেনে উন্নীকরণের কাজ চলছে। প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে এই প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে। অপরদিকে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ নৌবন্দর থেকে সরাইল বিশ্বরোড মোড় হয়ে আখাউড়া স্থলবন্দর পর্যন্ত ৫ হাজার ৭৯১ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫০ দশমিক ৫৮ কিলোমিটার মহাসড়ককে চার লেনে উন্নীতকরণের কাজ চলছে। এই দুই প্রকল্পের কাজই চলছে একেবারে ধীরগতিতে। আশুগঞ্জ-আখাউড়া চারলেনের কাজ মাঝখানে কিছুদিন বন্ধু ছিলো। এদিকে, বৃহৎ প্রকল্পের কাজ চলমান থাকায় এই সড়কে এখন জরুরী সংস্কার কাজও বন্ধ রয়েছে। ফলে ভাঙাচোরা সড়ক দিয়েই যান চলাচল করছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় অংশের চলমান কাজের কারণে দীঢ়র্ঘদিন ধরে সড়কের একপাশ দিয়ে যানবাহন চলাচল করে। ফলে এই অংশে সবসময়ই লেগে থাকে দীর্ঘ যানজট।

সিলেট থেকে নিয়মিত ঢাকায় যাতায়াত করতে হয় ব্যবসায়ী ফয়সল আলমকে। তিনি বলেন, সবসময় ট্রেনের টিকিট পাওয়া যায় না। ফলে বাধ্য হয়ে অনেক সময় বাসে চলাচল করতে হয়। কিন্তু এই সড়কে বাসে করে যাতায়াতের দুর্ভোগের আর কিছু নেই। বাসে উঠার পর কখন গিয়ে যেয়ে ঢাকায় পৌছবো তার কোন ইয়াত্তা নেই। ঘন্টার পর ঘন্টা যানজটে আটকে থাকতে হয়। সড়ক ভাঙার কারণে ঝাঁকুনি তো আছেই।

তিনি বলেন, প্রায় দুই বছর ধরে ছয় লেনের কাজ চলছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত তেমন কোন অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। এখনও ভ’মি অধিগ্রহণই শেষ হয়নি। এভাবে চলতে থাকলে ১০ বছরেও কাজ শেষ হবে না।

ফয়সল বলেন, সড়কের এই দুরবস্থার সুযোগে সিলেট-ঢাকা রুটে বিমান ভাড়াও বাড়িয়ে দিগুণ করে ফেলা হয়েছে।
কেবল যাত্রীরা নয়, সড়কের বেহাল দশার কারণে চালকদেরও নাভিশ্বাস উঠে গেছে। ঢাকা-সিলেট সড়কে চলাচলকারী মিতালী বাসের চালক গউছ উদ্দিন বলেন, সড়কের এমন বেহাল অবস্থা যে আমরা যাত্রীদের কেবল যাত্রার সময় বলি। পৌঁছার সময়ের ব্যাপারে কোন নিশ্চয়তা দেই না। আগে ঢাকা-সিলেট একদিনে যাওয়াআসা করতে পারতাম। এখন কেবল যেতেই একদিন লেগে যায়।

এই সড়কে দুর্ভোগে পেছনে তিনটি কারণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভাঙাচোড়া সড়ক, চলমান উন্নয়ন কাজ ও বিভিন্ন স্থানে সড়ক দখল করে গড়ে ওঠা দোকানপাটের কারণে সবসময় যানজট লেগেই থাকে।

ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের সিলেট অংশের হুমায়ুন রশীদ চত্বর থেকে শেরপুর পর্যন্ত অংশ ঘুরে দেখা যায়, মহাসড়কটির বিভিন্ন স্থানে একপাশ বন্ধ রেখে সম্প্রসারণ কাজ চলছে। বেশ কয়েকটি স্থানে চলছে সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ কাজ। অনেক জায়গায় মাটি ভরাট ও জমি অধিগ্রহণের কাজ চলছে। নির্মাণ কাজের কারণে সড়ক সরু হয়ে যাওয়ায় প্রতিদিন দেখা দিচ্ছে যানজটের। এছাড়া সড়কের অনেক জায়গায় খানাখন্দেরও সৃষ্টি হয়েছে। এ কারণে বেড়েছে ভোগান্তি। বিভিন্ন স্থানে সড়ক দেবে গেছে, কোথাও তৈরি হয়েছে বড় বড় গর্তের। আবার কোথাও পিচ সরে গিয়ে নিচের পাথর বের হয়ে এসেছে। এসব কারণে যানবাহনের গতি কমে আসায় যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। বাড়ছে দুর্ঘটনাও। ছয় লেনের কাজ চলমান থাকায় এখন ভাঙাচোড়া অংশও সংস্কার করছে না সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর।

যদিও তবে সড়ক ও জনপথ অধিপ্তরের কর্মকর্তা এবং প্রকল্প সংশ্লিস্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মূল সড়কে এখন উন্নয়ন কাজ হচ্ছে না। সড়কের পাশে কাজ করা হচ্ছে।

চালকরা জানান, আগে সিলেট থেকে ঢাকায় যেতে বা আসতে ৫-৬ ঘণ্টা সময় লাগতো। কিন্তু ছয়লেনের কাজ শুরু হওয়ার পর থেকে মহাসড়কের সংস্কার কাজ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। তাই একদিকে সম্প্রসারণ কাজের জন্য ভোগান্তি, অন্যদিকে ভাঙাচোরা মহাসড়কের কারণে এখন ঝুঁকি নিয়ে গাড়ি চালাতে হচ্ছে। একেক স্থানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে বসে থাকতে হয়। তাই এখন সিলেট-ঢাকা যাতায়াতে আগের চেয়ে দ্বিগুণ সময় লাগছে।

এ প্রসঙ্গে সওজ সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী আমির হোসেন জানান, মহাসড়কটি নতুন করে নির্মাণ হচ্ছে। দুই লেনের মহাসড়কটি ছয় লেন হচ্ছে। তাই পুরনো সড়কে খুব বেশি ব্যয় করা হচ্ছে না। যানবাহান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে যতটুকু সংস্কার প্রয়োজন কেবল ততটুকু করা হচ্ছে।


ছয় লেনের কাজ দুই বছরে কাজ এগিয়েছে মাত্র ১৫ শতাংশ
ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক ছয় লেনের উন্নেিতর কাজ ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হলেও দুই বছরে কাজ এগিয়েছে মাত্র ১৫ থেকে ১৬ শতাংশ। জমি অধিগ্রহণ জটিলতায় কাজ হচ্ছে ধীরগতিতে। বর্তমান সড়কের দু’পাশে ব্রিজ কালভার্ট নির্মাণের কাজ চলছে।প্রকল্পের কাজে আশানুরূপ অগ্রগতি না হওয়ায় যাতায়াত ভোগান্তিতে সিলেটে অঞ্চলের কোটি মানুষ।

ঢাকা সিলেট ৬ লেন প্রকল্পের সিলেট অংশের প্রজেক্ট ম্যানেজার দেবাশীষ রায় বলেন, প্রকল্পের কাজ এখন পর্যন্ত ১৫/১৬ শতাংশ অগ্রগতি হয়েছে। আমাদের ভূমি অধিগ্রহণ নিয়ে জটিলতা ছিল। একারণে কাজ আশানুরুপ এগোয়নি। তবে এখন জটিলতা অনেকটা কেটে গেছে। এখন দ্রুত গতিতেই কাজ এগিয়ে চলবে।

এই প্রকল্পের আওতায় নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুর থেকে সিলেট পর্যন্ত ২০৯ কিলোমিটার সড়ক ছয় লেনে উন্নীতকরণ সম্প্রসারণ এবং সিলেট-তামাবিল মহাসড়কের ৫৬ দশমিক ১৬ কিলোমিটার এলাকা চার লেনে উন্নীতকরণ করার কথা। আগামী বছরের ডিসেম্বরে এই প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা। তবে সংশ্লিস্টরা জানিয়েছেন নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা সম্ভব হবে না।


তিন মাস বন্ধ ছিলো চার লেন প্রকল্পের কাজ

৫ আগস্টের পট পরিবর্তনের পর প্রায় তিন মাস বন্ধ ছিলো আশুগঞ্জ-আখাউড়া ৫১ কেিলামিটার সড়কে চার লেন প্রকল্পের কাজ। যদিও নভেম্বর থেকে আবার এই সড়কের কাজ শুরু হয়েছে। তবে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হওয়া নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে এই প্রকল্পের কাজের কাজের কারণে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ব্রাহ্মণবাড়িয়া অংশে প্রায়ই অচলাবস্থা দেখা দেয়। এই সড়কে যাতায়াতকারীদের দুর্ভোগ চরমে পৌছে গেছে।

জানা যায়, গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর প্রকল্পে নিয়োজিত ভারতীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৩০০ কর্মকর্তা-কর্মচারী নিজ দেশে চলে যাওয়ায় বন্ধ ছিল নির্মাণকাজ। ফলে আশুগঞ্জ-আখাউড়া চার লেন জাতীয় মহাসড়ক প্রকল্প নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল।

এই সড়কে বাস চালানো একাধিক চালক জানান, এই মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় খানাখন্দের কারণে যান চলাচল বাধাপ্রাপ্ত হয়। বিশ্বরোড মোড়ে প্রায় প্রতিদিনই তীব্র যানজট লেগে থাকে। তারা জানান, মহাসড়কের আশুগঞ্জ থেকে সরাইল বিশ্বরোড মোড় পর্যন্ত ১২ দশমিক ২১ কিলোমিটার; এ অংশ জুড়ে আছে খানাখন্দ ও ছোট-বড় গর্ত। যে কারণে এখানে গাড়ির সর্ব্বোচ্চ গতিবেগ নেমে আসে ১০ কিলোমিটারে। এই ১২ কিলোমিটার এলাকায় সবসময় দীর্ঘ জানজট লেগে থাকে।

চার লেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, দীর্ঘদিন প্রকল্পের অধীনে থাকায় মহাসড়কটিতে নিয়মিত সংস্কার কাজ হয়নি। ফলে মহাসড়কের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অন্তত ৪ কিলোমিটার অংশে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে।

চার লেন মহাসড়ক প্রকল্পের ব্যবস্থাপক মো. শামীম আহমেদ বলেন, এখন পুরোদমে কাজ এগিয়ে চলছে। ইতোমধ্যে প্রকল্পের প্রায় ৬৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। তবে পুরো কাজ শেষ করতে প্রকল্পের মেয়াদ আরও বাড়ানো হতে পারে।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত