৩০ জুন, ২০২৫ ১৩:৪১
সম্প্রতি বড়লেখা সীমান্ত দিয়ে কয়েকজনকে ফেরত পাঠানো হয়। ফাইল ছবি
সিলেট সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে বলপুর্বক ফেরত পাঠানোর (পুশইন) ঘটনা হঠাৎ করে বেড়ে গেছে। অব্যাহত পুশ-ইনের ঘটনায় বাড়ছে উদ্বেগও। বাংলাদেশী সীমান্ত রক্ষী বাহিনী (বিজিবি) এর প্রতিবাদ ও সতর্ক অবস্থান স্বত্তেও পুশইন অব্যাহত রেখেছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)।
গত দেড় মাসে সহস্ত্রাধিক জনকে সিলেটের বিভিন্ন সীমান্ত দিয় পুশ-ইন করেছে বিএসএফ। পুশইনের প্রায় সবগুলো ঘটনাই ঘটছে সিলেট, সুনামগঞ্জ ও মৌলভীবাজাররের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে। বাংলাদেশি নাগরিকদের পাশপাশি ফেরত পাঠানো হচ্ছে রোহিঙ্গাদেরও।
সবশেষ গত শুক্রবার (২৭ জুন) সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার ভারত সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশের রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে পালিয়ে ভারত যাওয়া ১৪ রোহিঙ্গাসহ ৩১ বাংলাদেশিকে পুশইন করে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)।
২৭ জুন ভোরে জৈন্তাপুর উপজেলার কেন্দ্রী গ্রাম দিয়ে ১৭ জন বাংলাদেশি নাগরিককে পুশইন করে বিএসএফ। এর আগে বৃহস্পতিবার রাতে জৈন্তাপুরের লালাখাল বাগছড়া এলাকা দিয়ে ১৪ জন রোহিঙ্গাকে পুশইন করে।
একইদিনে বড়লেখা সীমান্ত দিয়ে নারী-শিশুসহ ১০ জনকে ঠেলে পাঠায় বিএসএফ। স্থানীয়রা তাদের আটক করে থানা পুলিশকে অবহিত করলে 'থানায় গাড়ি নেই' জানিয়ে বাঙালি হলে ছেড়ে দেওয়ার পরামর্শ দিলে তাদেরকে ছেড়ে দেয় এলাকাবাসী। এ-ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
২৬ জুন মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ উপজেলার দুটি সীমান্ত দিয়ে ২৫ জনকে বাংলাদেশে পুশইন করে বিএসএফ। এদের মধ্যে ১৯জনকে পুলিশ আটক করে।
এরআগে ২৪ ও ২৫ জুন মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার শাহবাজপুর চা-বাগান ও লাতু সীমান্ত এলাকা থেকে বিএসএফ কর্তৃক পুশইন হওয়া ১২১ জনকে আটক করে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।
২৩ জুন বড়লেখা উপজেলার কুমারশাইল সীমান্ত দিয়ে শিশু ও নারীসহ ১২ জন রোহিঙ্গা নাগরিক এবং ৪ জন বাংলাদেশীকে পুশইন করে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। সীমান্তের জিরো লাইনে নিয়ে বিএসএফ এদেরকে জোর করে বাংলাদেশ অভ্যন্তরে ঠেলে পাঠানো হয়।
২৪ জুন জৈন্তাপুর উপজেলায় ১৯ জন বাংলাদেশী নাগরিককে পুশইন করে বিএসএফ। পরে সিলেট ব্যাটালিয়ন (৪৮ বিজিবি) দায়িত্বাধীন মিনাটিলা বিওপির সদস্যরা অবৈধ অনুপ্রবেশের দায়ে তাদের আটক করে।
১২ জুন সিলেটের জৈন্তাপুর ও সুনামগঞ্জের সীমান্ত দিয়ে আরও ৭০ জন পুশইন করেছে ভারতীয় সীমান্ত্ররক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)।
এভাবে প্রায় প্রতিদিই সিলেটের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে পুশ-ইনের ঘটনা ঘটেছে। যা সীমান্তে নতুন শঙ্কার কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে।
বিজিবির দাবি, বিএসএফ তাদের নিজ সীমান্তে একত্র করে কাঁটাতারের গেট খুলে তাদের বাংলাদেশে ঠেলে পাঠায়। তবে এই পুশ-ইনকালে বাংলাদেশি নাগরিকের পাশাপাশি রোহিঙ্গাদেরও পাঠানো হচ্ছে। একইসঙ্গে ভারতীয়দের ঠেলে দেয়ারও শঙ্কা করছে বিজিবির।
যদিও বিজিবি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন এব্যাপারে বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্কতার সাথে পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছে। কিন্তু মানবিক কারণে বিজিবি পুশ-ইন হওয়ার পর কাউকে ফের পুশ-ব্যাক করতে পারে না।
এ অবস্থায় সিলেট সীমান্তজুড়ে সতর্কতা ও তৎপরতা বাড়িয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। তবুও থামছে না পুশ-ইন।
জানা গেছে, সীমান্ত পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠায় ভারতের মেঘালয়ের পূর্ব জৈন্তিয়া হিলস জেলাসহ তিনটি জেলায় আন্তর্জাতিক সীমান্তজুড়ে রাত্রিকালীন কারফিউ জারি করা হয়েছে। রাত ৮টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত কারফিউ জারি করে সীমান্তের শূন্যরেখা থেকে ৫শ মিটার পর্যন্ত এলাকায় কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। এতে অবৈধ অনুপ্রবেশ, চোরাচালান, গবাদিপশু পারাপার, অস্ত্র বা বিপজ্জনক বস্তু বহনের ওপরও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
তবুও থামছে না পুশ-ইনের মতো ঘটনা। সম্প্রতি সিলেট সীমান্তজুড়ে আরও বেড়েই চলছে এরকম কার্যক্রম।
বিজিবি ৫২ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল মেহেদী হাসান জানান, সীমান্ত এলাকার কিছু অংশ পাহাড়ি আবার কিছু এলাকায় জলাভূমি বিল থাকায় জিরো পয়েন্ট থেকে নজরদারি করা কঠিন। বিএসএফ তাদের এলাকায় স্থাপিত নিরাপত্তা লাইট বন্ধ করে দিয়ে মানুষদের সীমান্তের এপারে ঠেলে দেয়। পরে টহল বিজিবি তাদের আটক করে। বিজিবির হাতে আটকের পর পরিচয় যাচাই করে বাংলাদেশি নাগরিক বলে মানবিক দিক বিবেচনায় তাদের পরিবারের কাছে পাঠানোর জন্য পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
এ ব্যাপারে সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি এডভোকেট এমাদুল্লাহ শহীদুল ইসলাম শাহীন বলেন, পুশ-ইন কিংবা পুশ-ব্যাক দুটিই বেআইনী এবং মানবাধিকার পরিপন্থী। সিলেট বিভাগ হচ্ছে সীমান্ত ঘেরা অঞ্চল। এই অঞ্চলে ভারত যেভাবে পুশইনের মাধ্যমে প্রতিদিন শত শত মানুষকে জোর করে ঠেলে দিচ্ছে তা কোনভাবেই মেনে নেয়ার মতো নয়। এ ব্যাপারে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ক শুধু কড়া বিবৃতি নয়, কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজনের আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার সংগঠনের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে হবে।
তিনি বলেন, সম্প্রতি ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় সীমান্তে উভয় দেশের মানুষ বন্দী হয়েছে। তখন দুটি দেশ তাদের মানুষকে আইনীভাবে হস্থান্তর ও গ্রহণ করেছে। এটাই সঠিক পদ্ধতি। বাংলাদেশী অবৈধভাবে ভারতে অনুপ্রবেশ করলে সেদেশের আইন অনুযায়ী বাংলাদেশী দুতাবাসকে বিষয়টি অবহিত করতে হবে। দুতাবাসের মাধ্যমেই তাদেরকে দেশে পাঠাতে হবে। এভাবে বাংলাদেশী বলে শত শত মানুষকে পুশ-ইন করা কোনভাবেই সঠিক নয়। বিষয়টি উভয় দেশের জন্য বিপজ্জনক। তাই এখনি কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
আপনার মন্তব্য