সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি

০২ জুলাই, ২০২৫ ১৯:৫০

গোলাগুলিতে আবু সাঈদের মৃত্যু: বিচার বিভাগীয় তদন্ত ও ক্ষতিপূরণ চেয়ে লিগ্যাল নোটিশ

সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার হাতিয়ায় সেনাবাহিনীর টহল অভিযানের সময় যৌথবাহিনী ও অস্ত্রধারীদের গোলাগুলিতে ইলেট্রিশিয়ান আবু সাঈদ (৩১) নিহতের ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন, নিহতের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য স্বরাষ্ট্র সচিবসহ ৭ জনকে লিগ্যাল (আইনী) নোটিশ পাঠানো হয়েছে।

বুধবার সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার আটগাঁও ইউনিয়নের দৌলতপুর গ্রামের বাসিন্দা ও সুনামগঞ্জ -২ (দিরাই-শাল্লা) আসনের জামায়েতে ইসলামীর দলীয় প্রার্থী সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সিনিয়র আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির এই নোটিশ পাঠিয়েছেন।

লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো হয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি), সিলেট সেনানিবাসের জেনারেল অফিসার কমান্ডিং (জেওসি), সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক (ডিসি), পুলিশ সুপার (এসপি), দিরাই ও জগন্নাথপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কে।

 নোটিশ পাওয়ার ৭ দিনের মধ্যে উল্লেখিত বিষয়গুলো বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে জনগনের মৌলিক অধিকার সুরক্ষার্থে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী হাইকোর্ট বিভাগে রিট আবেদন দায়েরসহ অন্যান্য আইনানুগ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

আইনজীবী শিশির মনির লিগ্যাল নোটিশে উল্লেখ করেছেন, সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার দৌলতপুর গ্রামের বাসিন্দা তিনি। তিনি আইনের শাসন ও ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠায় নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। সম্প্রতি জগন্নাথপুরের গাদিয়ালা গ্রামে যৌথ বাহিনীর অভিযানে আবু সাঈদ নিহত হওয়ার খবর তাঁর দৃষ্টিগোচর হয়েছে। এই ঘটনা সাধারণ মানুষের মাঝে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে, জনমনে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। জনস্বার্থে এবং সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নাগরিকের জীবন অধিকার ও রাষ্ট্রের জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণে উপরোক্ত কর্মকর্তাদের প্রতি এই আইনী নোটিশ প্রদান করা হল।

নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে, গত ২২ জুন যৌথ বাহিনীর অভিযানে গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন, দিরাইয়ের কুলঞ্জ ইউনিয়নের তারাপাশা গ্রামের তাজ মিয়ার ছেলে আবু সাঈদ। ঘটনার সময় তিনি ও তার চাচাতো ভাই আকবর আলী জগন্নাথপুরের গাদিয়ালা গ্রামে বিদ্যুতের কাজ করছিলেন। বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী নিহত আবু সাঈদের বিরুদ্ধে কোন মামলা বা সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের অভিযোগ ছিল না। আবু সাঈদের মৃত্যু জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। একজন পেশাজীবী মানুষ কীভাবে যৌথবাহিনীর অভিযানে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যেতে পারে-তা মোটেও বোধগম্য নয়। নিহত আবু সাঈদের লাশ দীর্ঘসময় পড়ে থাকা, পরিবার ও স্থানীয়দের কাছে ঘটনাস্থল গোপন রাখা, ঘটনার পর কোন ব্যাখা না দেওয়া দুঃখজনক ও উদ্বেগজনক। ঘটনার ১০ দিনে পার হয়ে গেলেও মামলার কোন অগ্রগতি পরিলক্ষিত হয়নি। কারো মৃত্যু হলে রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও সময়োপযোগি তদন্ত করা। বেসামরিক নাগরিক রাষ্ট্রিয় অভিযানে প্রাণ হারালে তাৎক্ষণিকভাবে জবাবদিহিতা, তদন্ত ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব।

নোটিশে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, যেহেতু এই ঘটনায় সেনাবাহিনী, যৌথবাহিনী, আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী জড়িত মর্মে সন্দেহ করা হচ্ছে, তাই এই মামলার বিচার বিভাগীয় তদন্ত হওয়ায় আবশ্যক। অন্যথায় অপরাধীদের বিচারের সন্মুখিন করা সম্ভব হবে না। নিহত আবু সাঈদ পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন। তাই তার পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান ও পরিবারের সদস্যদের পুনর্বাসনের প্রয়োজন।

প্রসঙ্গত, গত ২২ জুন গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন আবু সাঈদ। পরদিন ২৩ জন সোমবার দুপুরে গণমাধ্যমে পাঠানো সেনাবাহিনীর ১৭ পদাতিক ডিভিশনের দেওয়া প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছিল, যৌথবাহিনী ও অস্ত্রধারীদের গোলাগুলির ঘটনায় জড়িত সন্দেহে ৪ জনকে আটক করেছে সেনাবাহিনী। আটককৃতরা হলেন- তাজ উদ্দিন, আমির উদ্দিন, ইরন মিয়া এবং জমির মিয়া। আটককৃতদের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী নিহত আবু সাঈদ অজ্ঞাত কোন সন্ত্রাসীদের গুলিতে মারা গেছেন।
প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছিল, গত ২০ জুন শুক্রবার দিরাই উপজেলার হাতিয়া গ্রামের বাসিন্দা কুলঞ্জ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান যুবলীগ নেতা একরার হোসেন লোকজনের সঙ্গে একই ইউনিয়নের বিএনপির সভাপতি আতিকুর রহমানের আধিপত্য বিস্তার নিয়ে গোলাগুলি হয় এবং একজন গুলিবিদ্ধ হয়। এছাড়া একরার ও তার অনুসারীরা প্রায়ই এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যে প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া দিয়ে আসছিল। এরপর গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে গত ২২ জুন রবিবার যৌথবাহিনীর একটি টহল দল অস্ত্রধারীদের ধরতে হাতিয়া গ্রামে অভিযান চালায়। অভিযানের উপস্থিতি টের পেয়ে একরার বাহিনীর সন্ত্রাসীরা সেনাবাহিনীকে লক্ষ করে গুলি ছুড়তে থাকে এবং আত্মরক্ষার্থে সেনাবাহিনীও পাল্টা গুলি চালায়। পরবর্তীতে একরার বাহিনীর সন্ত্রাসীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পালাতে শুরু করে। টহল দল পরে একজন মরদেহ দেখতে পায়। মৃত ব্যক্তি কার গুলিতে মারা গেছেন তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত