নিজস্ব প্রতিবেদক

০৩ আগস্ট, ২০২৫ ১২:০৪

টিলার গায়ে ‘গুহা’ তৈরি করে ধসের কৌশল চলছে সিলেটে

সিলেট নগরীর টিলা অধ্যুষিত এলাকায় টিলা সাবাড় করতে অভিনব কৌশল অবলম্বন করা হয়। এর একটি হচ্ছে বৃষ্টির মৌসুমে টিলার গায়ে ‘গুহা’ আকৃতির গর্ত করে সেটি ধসের কৌশল।

টিলাটির নাম ‘মজুমদার টিলা’। সিলেট নগরীর ৮ নম্বর ওয়ার্ড এলাকায় হাওলাদারপাড়ায় এটির অবস্থান।

সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, টিলাটির চারপাশ অনেকটা ধসে পড়েছে। সেখানে প্লট আকারে জমি বিক্রি করা হয়েছে। টিলার ঢালে আগে থেকেই পাকা বাসাবাড়ি গড়ে উঠেছে। উত্তর-পশ্চিমে টিলা কাটার অংশে প্রথমে একটি ‘গুহা’ দেখা যায়। এটির ঠিক নিচে ছোট করে আরেকটি গর্ত খুঁড়ে গুহা তৈরি করা হয়েছে। সেখান থেকে টিলার গায়ের ক্ষতবিক্ষত অংশে আরও তিনটি গুহা কাটা। যেখানে ভারী বৃষ্টিতে গুহার পাশ ধীরে ধীরে ধসে পড়ছে।

স্থানীয়রা এটিকে ‘টিলাখেকো গুহা’ বলে চিহ্নিত করছেন। তারা বলছেন, মজুমদার টিলা ছিল নগরীর মধ্যে সবচেয়ে বড়। বেশ কয়েক বছর আগেই এটি প্লট হিসেবে বিক্রি হয়ে গেছে। তারপর থেকেই নীরবে চলছে টিলা সাবাড়। টিলার চারপাশে বাসাবাড়ি ছাড়াও দোকানপাট তৈরি করে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। এক বাসিন্দা বললেন, ভারী বৃষ্টি হলেই এই এলাকায় টিলার মাটি পরিবহন করতে দেখা যায়। সন্ধ্যার পর থেকে চলে সারা রাত। রাতে ট্রাকে মাটিগুলো অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়। নগর ও শহরতলির নতুন বাসাবাড়ি তৈরিতে এ মাটি ব্যবহার করা হয়।

জানা গেছে, সুবিশাল এই টিলার মালিক সুব্রত মজুমদার। তিনি প্রায় দুই যুগ ধরে সুইডেন প্রবাসী। তার হয়ে টিলার প্লট কেনাবেচার কাজটি করেছেন ভূমিসংশ্লিষ্ট স্থানীয় প্রভাবশালীরা। প্রায় ১০ একর আয়তনের টিলাটির অধিকাংশ প্লট কিনেছেন সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা ও কর্মচারী, ব্যাংকার ও বেসরকারি চাকরিজীবীরা। তবে যারা সেখানে প্লট কিনেছেন বা ভবন তৈরি করেছেন, তাদের কেউ এ নিয়ে মুখ খুলতে চান না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন বাসিন্দা জানান, যখন টিলা প্লট আকারে বিক্রি করা হয়, তখনই তাদের বলা হয়, টিলার মাটি সরিয়ে ভবন তৈরি করার মতো অবস্থা করে দেওয়া হবে। এ ছাড়া টিলা কাটার কিছু লোক আছেন তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে সবকিছু হয়ে যায়। অনেকেই টিলার মাটি বিক্রি করে প্লট মালিকপক্ষকে বুঝিয়ে দেয়।

২০১৯ সালের দিকে অজিত রায় নামে এক ব্যক্তি এক্সকাভেটর দিয়ে টিলা কেটে প্লট তৈরি করে বিক্রি করছিলেন। পরিবেশ অধিদপ্তর তখন অভিযান চালিয়ে ১০ লাখ টাকার অর্থদণ্ড দিয়েছিল। এরপর থেকে নানা কৌশলে টিলা সাবাড় করা হয়।

মজুমদারটিলাসহ আশপাশ এলাকার সাম্প্রতিক পরিস্থিতি প্রসঙ্গে পরিবেশ অধিদপ্তর সিলেটের সহকারী পরিচালক বদরুল হুদা বলেছেন, ‘টিলা কাটার খবর পেলেই আমরা অভিযান চালাই। পরিবেশ আইনে মামলা দিই। টিলা কাটার প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেলেও ঘটনাস্থলে কাউকে পাইনি। তারা রাতে গোপনে টিলা কাটছেন। আমরা এখন এই টিলার মালিক ও যিনি টিলা কাটাচ্ছেন তার ব্যাপারে খোঁজ নিচ্ছি। চেষ্টা করছি যখন টিলা কাটা হয় তখন অভিযান চালানোর।’

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-তাত্ত্বিক জরিপের তথ্য অনুযায়ী, সিলেটের ১১ ভাগ ভূমিতে রয়েছে পাহাড়-টিলা। আরও ১৭ দশমিক ৮ ভাগ উঁচু ভূমি। জেলার প্রায় ৬৬ হাজার হেক্টর বনাঞ্চলের ২৩ ভাগই রয়েছে পাহাড়-টিলায়। টিলাভূমির শ্রেণি হিসেবে ‘সিলেট শ্রেণির’ টিলাগুলো উত্তর-পূর্ব থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমে বিস্তৃত। সুরমা নদীর দক্ষিণে সর্বোচ্চ টিলার উচ্চতা ৩২ মিটার। আর উত্তরের টিলা ৯১ মিটার (৩০০ ফুট) উচ্চতার।

প্রায় ১৮৬ বর্গকিলোমিটার (৭২ বর্গমাইল) এলাকাজুড়ে এ শ্রেণির টিলা বিস্তৃত। সিলেট সদর ও মহানগরসহ টিলা অধ্যুষিত পাঁচ উপজেলায় ২০০৯ সালে টিলার সংখ্যা ছিল ১ হাজার ২৫টি। বর্তমানে এ সংখ্যা নেমে এসেছে ৫৬৫টিতে। গত প্রায় এক যুগে নগরী ও বাইরে অর্ধেকের বেশি টিলা সাবাড় হয়েছে।

নানা কূটকৌশলে তৎপর টিলাখেকোদের দমনে স্থানীয় প্রশাসনের সক্ষমতা নেই বলে মনে করছেন পরিবেশবাদী সংগঠন ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা) সিলেট শাখার সদস্য সচিব আবদুল করিম চৌধুরী করিম কিম। তিনি বলেন, ‘প্রাকৃতিক সম্পদ ও সৌন্দর্য রক্ষায় দায়িত্বশীলদের আন্তরিকতাও নেই। পাহাড়-টিলা থাকা না থাকায় কারও কিছুই যেন যায় আসে না। মানুষেরও আবেগ-অনুভূতি লোপ পেয়েছে। সিলেট এক সময় পাহাড়-টিলাশূন্য হলে ইতিহাস এই সময়ের নীরব থাকা দায়িত্বশীল নাগরিক ও রাজনৈতিক নেতাদের ক্ষমা করবে না।’

আপনার মন্তব্য

আলোচিত