১৬ মে, ২০২৬ ০২:১৬
জঙ্গি সম্পৃক্ততার অভিযোগে গ্রেপ্তার চাকরিচ্যুত সেনা সদস্য (বামে) এবং অবৈধভাবে অনুপ্রবেশের সময় আটক ভারতীয় দম্পতি (ডানে)।
মৌলভীবাজারের বড়লেখা সীমান্তের একই এলাকায় মাত্র এক দিনের ব্যবধানে ঘটে যাওয়া দুটি ঘটনা নতুন করে আন্তঃসীমান্ত নেটওয়ার্ক নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। জঙ্গি সম্পৃক্ততার অভিযোগে চাকরিচ্যুত এক সেনাসদস্যের গ্রেপ্তার এবং অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশের সময় ভারতীয় এক দম্পতির আটক হওয়ার ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে বাড়ছে শঙ্কা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বড়লেখার দুর্গম সীমান্ত এলাকা এখন দালালচক্র ও গোপন যাতায়াত নেটওয়ার্কের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ রুটে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
পুলিশ সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবার (১৪ মে) বড়লেখা উপজেলার দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউনিয়নের দুর্গম বোবারথল ষাইটঘরি সীমান্ত এলাকায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে নিষিদ্ধ ঘোষিত উগ্রবাদী সংগঠন ‘মাকতাবাহ আল হিম্মাহ আদদাওয়াতুল ইসলামিয়াহ’-এর সদস্য ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর চাকরিচ্যুত সদস্য মো. রাহেদ হোসেন মাহেদ (২৩)-কে আটক করা হয়। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, তিনি সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। প্রায় ১২ ঘণ্টাব্যাপী বড়লেখা থানা পুলিশের অভিযানের পর একটি টিলা এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাকে কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, মাহেদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে রাজধানীর শাহবাগ থানায় মামলা রয়েছে এবং সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়া কয়েকজন উগ্রবাদী সদস্যের সঙ্গে তার যোগাযোগের তথ্যও মিলেছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন বলেও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এখন প্রশ্ন উঠেছে, জঙ্গি সম্পৃক্ততার অভিযোগে চাকরিচ্যুত এই সেনাসদস্যকে ভারতে পালিয়ে যেতে সীমান্ত এলাকায় কারা সহযোগিতা করছিল এবং এর পেছনে কোনো সংঘবদ্ধ দালালচক্র বা আন্তঃসীমান্ত নেটওয়ার্ক সক্রিয় ছিল কি না।
এর ঠিক একদিন পর শুক্রবার (১৫ মে) সকালে বড়লেখার দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউনিয়নের গান্ধাইল সীমান্ত এলাকা থেকে ভারতীয় পরিচয়পত্রধারী এক দম্পতিকে আটক করে বিজিবি। আটককৃতরা হলেন কামরুল আহমেদ (৩২) ও তার স্ত্রী হুসনা বেগম লস্কর (২৪)।
বিজিবি জানিয়েছে, তারা অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করছিলেন। এ সময় তাদের কাছ থেকে ভারতীয় পরিচয়পত্র ও মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, কামরুল আহমেদ মূলত বাংলাদেশের নাগরিক ছিলেন। ২০১৪ সালে দালালের মাধ্যমে যশোরের বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেন। পরে ২০১৫ সালে ভারতীয় নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন এবং আসামের হাইলাকান্দি জেলার বাসিন্দা হুসনা বেগম লস্করকে বিয়ে করেন। দীর্ঘদিন ভারতে বসবাসের পর হঠাৎ অবৈধ পথে বাংলাদেশে ফেরার চেষ্টা কেন—তা নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।
প্রশ্ন উঠেছে—তাদের এই প্রবেশের পেছনে কি শুধুই পারিবারিক কারণ, নাকি এর সঙ্গে রয়েছে আরও বড় কোনো নেটওয়ার্ক? সংশ্লিষ্টদের মতে, ঘটনাটি সাধারণ অনুপ্রবেশের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, আটককৃতদের যাতায়াত পদ্ধতি এবং সীমান্ত ব্যবহারের ধরন দালালচক্র বা আন্তঃসীমান্ত সহযোগী নেটওয়ার্কের সক্রিয়তার ইঙ্গিত দেয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এই দুই ঘটনার মধ্যে সরাসরি কোনো যোগসূত্রের প্রমাণ প্রাথমিকভাবে না মিললেও একই সীমান্ত এলাকা ব্যবহারের বিষয়টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণের দাবি রাখে। কারণ, সীমান্তের দুর্গম পাহাড়ি পথ, স্থানীয় দালালচক্রের সক্রিয়তা এবং নজরদারির সীমাবদ্ধতা কাজে লাগিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই মানবপাচার, অবৈধ অনুপ্রবেশ, পলাতক আসামিদের পালিয়ে যাওয়া এবং পরিচয় গোপন করে যাতায়াতের মতো কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়ে আসছে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, সীমান্ত ব্যবহার করে জঙ্গি সম্পৃক্ত ব্যক্তি কিংবা বিদেশি পরিচয়ধারীদের গোপন চলাচল কেবল আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও বড় ধরনের হুমকি হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে আন্তঃদেশীয় যোগাযোগ ও দালালচক্রের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা ভবিষ্যতে আরও বড় ঝুঁকির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বড়লেখার সীমান্তবর্তী দুর্গম এলাকা ও পাহাড়ি পথকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ দালালচক্র সক্রিয় রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো প্রমাণ করছে, বিষয়টি শুধু অবৈধ অনুপ্রবেশে সীমাবদ্ধ নয়; এর পেছনে আরও বিস্তৃত ও সংগঠিত নেটওয়ার্ক কাজ করতে পারে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি জানান, দুর্গম এই সীমান্ত এলাকায় বিজিবি প্রায়ই অভিযান চালিয়ে অপরাধীদের আটক করছে। তবে একটি সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র বিজিবির নজর এড়িয়ে দেশবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব অপরাধী চক্রকে দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা জরুরি।
এ অবস্থায় বড়লেখা সীমান্তে নজরদারি বৃদ্ধি, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু এবং গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদারের দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্ত এলাকায় স্থানীয় প্রশাসন, বিজিবি, পুলিশ ও বিভিন্ন সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে পড়বে।
বড়লেখা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান খান জানান, রাহেদ উগ্রবাদী সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার বিষয়ে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। তিনি বড়লেখা উপজেলার দুর্গম বোবারথল সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে ভারতে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। বৃহস্পতিবার প্রায় ১২ ঘণ্টাব্যাপী অভিযানের একপর্যায়ে একটি টিলা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার বিরুদ্ধে ঢাকার শাহবাগ থানায় মামলা রয়েছে। আইনগত প্রক্রিয়া শেষে বৃহস্পতিবার রাতেই তাকে সিটিটিসি ইউনিটের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এছাড়া বিজিবি আটক আরও দুজনকে থানায় সোপর্দ করেছে। তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
আপনার মন্তব্য