নিজস্ব প্রতিবেদক

০২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০০:৪৭

ধর্ষণের শাস্তি ২০ হাজার টাকা!

প্রতীকি ছবি

হবিগঞ্জের মাধবপুরে এক কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। তবে এ ঘটনায় থানায় মামলা না করে স্থানীয়ভাবে সালিস বসিয়ে বিষয়টি মীমাংসার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সালিসে কিশোরীর পরিবারকে ‘ক্ষতিপূরণ’ হিসেবে ৯০ হাজার টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এর মধ্যে ২০ হাজার টাকা ইতিমধ্যে দেওয়া হয়েছে। বাকি ৭০ হাজার টাকা দেওয়ার কথা আগামী ১০ সেপ্টেম্বর।

গত শুক্রবার স্থানীয় এক ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) সদস্যের মধ্যস্থতায় ওই সালিস বসে। এতে পাশের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার হরিপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যানসহ স্থানীয় লোকজন উপস্থিত ছিলেন। তবে মঙ্গলবার পর্যন্ত এ ঘটনায় থানায় কোনো মামলা হয়নি।

ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য, হানিফ মিয়া (২৫) নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে ওই কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। হানিফের স্ত্রী প্রবাসে থাকেন। তিনি মেয়েকে নিয়ে বেশির ভাগ সময় শ্বশুরবাড়িতে থাকেন।

গত ২০ আগস্ট দুপুরে বাড়ির লোকজনের অনুপস্থিতির সুযোগে হানিফ কৌশলে কিশোরীকে নিজের ঘরে ডেকে নিয়ে ধর্ষণ করেন বলে অভিযোগ। পরে বাড়িতে ফিরে বিষয়টি মাকে জানায় মেয়েটি। এরপর আত্মীয়স্বজন নিয়ে হানিফের বাড়িতে গেলে তিনি সেখান থেকে পালিয়ে যান।

ওই দিন বিকেলেই কিশোরীকে হবিগঞ্জ ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে স্বাস্থ্য পরীক্ষা শেষে গত ২৩ আগস্ট সে বাড়ি ফিরে আসে।

এরপর স্থানীয় ইউপি সদস্য আবেদুর রহমানের মধ্যস্থতায় গত শুক্রবার সালিস বসে। এতে স্থানীয় লোকজনের পাশাপাশি নাসিরনগর উপজেলার হরিপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান জামাল মিয়াও উপস্থিত ছিলেন বলে জানা গেছে।

সালিসে কিশোরীর পরিবারকে ৯০ হাজার টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। তাৎক্ষণিকভাবে কিশোরীর মাকে ২০ হাজার টাকা দেওয়া হয়। বাকি ৭০ হাজার টাকা আগামী ১০ সেপ্টেম্বর দেওয়ার তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে।

কিশোরীর মা বলেন, ‘খালি বাড়িত আমার মেয়েরে পুশলাইয়া নিয়া ধর্ষণ করছে হানিফে। আমরা মামলা করতে চাইছিলাম। গ্রামের মুরব্বিরা দিল না। তারা কইছে ক্ষতিপূরণ লইয়া দিব। ইউপি সদস্য আবেদুর রহমানসহ কয়েকজন সালিস কইরা ওই ৯০ হাজার টেকা ধার্য করছে। ওই টাকার মইধ্যে আমি ২০ হাজার টেকা পাইছি।’

তবে ইউপি সদস্য আবেদুর রহমান ধর্ষণের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, মেয়েটিকে ধর্ষণ করা হয়নি, ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে। দুই পক্ষই অসহায় ও দরিদ্র হওয়ায় মামলা-মোকদ্দমায় না জড়িয়ে সালিসের আয়োজন করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

আবেদুর রহমান বলেন, ‘দুটি পক্ষই অসহায় ও গরিব। এ কথা বিবেচনায় নিয়ে আমরা তাঁদের মামলা-মোকদ্দমায় না জড়িয়ে ওই সালিসের আয়োজন করি। এতে আমাদের পাশের বাসিন্দা ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান জামাল মিয়াসহ স্থানীয় অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। তাঁরাই ৯০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ ধার্য করে দেন।’

ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধ স্থানীয় সালিসের মাধ্যমে বা অর্থের বিনিময়ে মীমাংসা করা যায় কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে আবেদুর রহমান বলেন, ‘সবকিছু আইনে হয় না।’ দুই পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, মামলা পরিচালনা করার মতো সামর্থ্য তাঁদের নেই।

সালিসে উপস্থিত থাকার বিষয়ে জানতে সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান জামাল মিয়ার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন ধরেননি। পরে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি।

মাধবপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সোহেল রানা বলেন, মঙ্গলবার পর্যন্ত ভুক্তভোগীর পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় কোনো অভিযোগ করা হয়নি। তাঁরা আইনগত সহযোগিতা চাইলে পুলিশ তাঁদের পাশে থাকবে।

সালিসের বিষয়ে জানতে চাইলে ওসি বলেন, বিষয়টি পুলিশ খতিয়ে দেখছে।

ধর্ষণের অভিযোগ সত্য হোক বা ধর্ষণের চেষ্টা—দুটিই গুরুতর অপরাধ। এমন অভিযোগের ক্ষেত্রে স্থানীয় সালিসে অর্থ নির্ধারণ করে বিষয়টি মীমাংসার উদ্যোগ নেওয়া কতটা আইনসম্মত, তা নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠেছে।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত