নিজস্ব প্রতিবেদক

১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২৩:২০

শাহজালাল মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনা: মন্ত্রীর নেতৃত্বে কমিটি আড়াই মাসেও নীতিমালা করতে পারেনি

সিলেটের হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনতে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের নেতৃত্বে গঠিত কমিটি আড়াই মাসেও কোন নীতিমালা বা পদ্ধতি নির্ধারণ করতে পারেনি। যদিও কমিটি গঠনের সময় বলা হয়েছিল একমাসের মধ্যে ‘যৌক্তিক পদ্ধতি’ নির্ধারণ করা হবে।

এদিকে, দীর্ঘদিনের মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনার বিষয়ে কোন সুরাহা না হওয়ায় শাহজালাল (রহ.) পরিচালনার ক্ষেত্রে অনেকটা অচলাবস্থা দেখা দিয়েছে। মাজারের দৈনন্দিন খরচ মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারের দানবাক্সের টাকা নিয়ে বিদায়ী জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলমের উদ্যোগ ও এ নিয়ে বিতর্কের প্রেক্ষিতে গত ২৩ জুন মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও সার্বিক পরিচালনায় স্বচ্ছতা আনতে বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের নেতৃত্বে ১৩ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। এক মাসের মধ্যে কমিটি ব্যবস্থাপনার জন্য একটি যৌক্তিক ও সমন্বিত কাঠামোর সুপারিশ দেবে বলে সেদিন জানানো হয়েছিল। তবে আড়াই মাসেও বিষয়টির সুরাহা হয়নি।

এ প্রসঙ্গে এই কমিটির অন্যতম সদস্য সিলেট উন্নয়ন সংস্থার চেয়ারম্যান রেজাউল হাসান কয়েস লোদী সিলেটটুডেকে বলেন, সবশেষ যে সভাটি হয়েছে সেখানে বাণিজ্যমন্ত্রীসহ কমিটির সকলেই উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু মাজারের মোতোয়াল্লি অনুপস্থিত ছিলেন। আশা করছি, আগামী মিটিংয়েই এই বিষয়টি সমাধান হবে।

জানা যায়, হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারের আয়-ব্যয়ের ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সিলেট জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একপাক্ষিক উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর অংশ হিসেবে গত ১৮ জুন বিকেলে মাজারে থাকা আগের দানবাক্স সিলগালা করে নতুন দানবাক্স স্থাপন করা হয়। পাশাপাশি মাজারে মানুষের দান করা নগদ অর্থ ও অন্যান্য সামগ্রী রাখার ঐতিহাসিক তিনটি দানের ডেগও সিলগালা করা হয়। দানবাক্স ও ডেগ সিলগালার পর জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলমের পক্ষে-বিপক্ষে সিলেটজুড়ে আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়। এক পক্ষের দাবি, মাজারের আয়-ব্যয়ে স্বচ্ছতা আনতে জেলা প্রশাসক কার্যকর উদ্যোগ নিয়েছেন। অন্যদিকে আরেক পক্ষের অভিযোগ, মাজারে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার নামে তার সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলো ছিল একতরফা ও জোরপূর্বক, যা মাজারকেন্দ্রিক প্রচলিত ব্যবস্থার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

এ আলোচনা-সমালোচনার মধ্যেই ২১ জুন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে সারওয়ার আলমকে প্রত্যাহার করে মন্ত্রণালয়ের উপসচিব পদে সংযুক্ত করা হয়। এর পরদিন তার উপস্থিতিতে দানবাক্স সিলগালার চার দিন পর জনসমক্ষে বাক্সের তালা খুলে টাকা গণনা করা হয়। গণনায় প্রায় ১৮ লাখ টাকা পাওয়া যায়। এর পর থেকে মাজারের ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়। এরই মধ্যে বাণিজ্যমন্ত্রীর উদ্যোগে মাজারের ব্যবস্থাপনা ও সার্বিক পরিচালনায় স্বচ্ছতা আনতে কমিটি গঠন করা হয়।

বাণিজ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন কমিটিতে সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদের প্রশাসক, সিলেট উন্নয়ন সংস্থার চেয়ারম্যান, বিভাগীয় কমিশনার, সিলেট রেঞ্জের ডিআইজি, সিলেট মহানগর পুলিশের কমিশনার, মাজারের মোতোয়াল্লি পরিবারের দুই প্রতিনিধি এবং মাদ্রাসা ও মসজিদের দুই প্রতিনিধি রয়েছেন। কমিটির সদস্যসচিব হিসেবে আছেন সিলেটের জেলা প্রশাসক।

কমিটি গঠনের পর বাণিজ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, এই কমিটির প্রধান লক্ষ্য পুরো ব্যবস্থাপনার মধ্যে পরিপূর্ণ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। আগামী এক মাসের মধ্যে আমরা একটি যৌক্তিক পদ্ধতি নির্ধারণ করব এবং তা দেশের মানুষের সামনে উপস্থাপন করব।’

গত ১৫ আগস্ট তৃতীয় দফায় মাজারের দানবাক্সের অর্থ প্রকাশ্য গণনা শেষে গণনা শেষে সিসিক প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনার নীতিমালা তৈরি করতে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও বাণিজ্যমন্ত্রী আব্দুল মুক্তাদিরের নেতৃত্বে আমাদের কয়েকজনকে দিয়ে একটি কমিটি গঠন করে দেওয়া হয়। আমরা অচিরেই একটি নীতিমালা নির্ধারণ করে দেবো। সেই নীতিমালার আলোকেই পরবর্তীতে টাকা গণনা ও ব্যবস্থাপনা হবে।

এদিকে, নতুন নীতিমালা না হওয়ায় বিদায়ী জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলমের উদ্যোগের পর থেকে মাজারের টাকা প্রকাশ্যে গণনা হচ্ছে এবং গণনার পর টাকা জেলা প্রশাসনের খোলা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা রাখা হচ্ছে।

এতে মাজার পরিচালনায় অচলাবস্থা দেখা দিয়েছে জানিয়ে হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের খাদেম রায়হান উদ্দিন মুন্না শনিবার সিলেটটুডেকে বলেন, মাজার পরিচালনায় অনেক টাকার প্রয়োজন হয়। প্রতিদিন ৫০ থেকে এক লাখ টাকা খরচ হয়। এছাড়া মাসিক খরচ আছে। দানবাক্সের টাকা সব জেলা প্রশাসনের অ্যাকাউন্টে রাখায় এই খরচ মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। অনেককে পকেট থেকে টাকা দিয়ে খরচ মেটাতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, গত মিটিংয়ের সময় মোতোয়াল্লি সুনামগঞ্জ ছিলেন। তাই মিটিংয়ে উপস্থিত থাকতে পারেননি। আশা করছি, বাণিজ্যমন্ত্রী পরেরবার সিলেট এলে বিষয়টির একটি সুরাহা হবে।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত