নিজস্ব প্রতিবেদক

২৬ অক্টোবর, ২০২৬ ২১:৪৯

সিলেটে পারিবারিক বিরোধে একদিনে ঝরল ৩ প্রাণ

সিলেটে সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ ও পারিবারিক সংঘাতে একদিনে তিন জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। বালাগঞ্জ, জকিগঞ্জ ও কোম্পানীগঞ্জে এসব ঘটনা ঘটে। পৃথক এসব ঘটনায় জকিগঞ্জে ছেলের হাতে মা, বালাগঞ্জে ভাতিজার হাতে চাচা ও কোম্পানীগঞ্জে চাচাতো ভাইয়ের হাতে যুবক খুন হয়েছেন।

বালাগঞ্জ: বালাগঞ্জে পাওনা টাকা চাওয়ায় ভাতিজার হাতে খুন হয়েছেন চাচা আবুল মিয়া (৬৫)। রবিবার রাত ৮টার দিকে উপজেলার পুর্ব গৌরীপুর ইউনিয়নের মুসলিমাবাদ ডেকাপুর গ্রামে এঘটনা ঘটে। ঘটনার সময় আবুল মিয়ার ভাই আব্দুল কাদিরকেও দা দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর আহত করা হয়েছে।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, নিহত আবুল মিয়া ও তার অভিযুক্ত ভাতিজা টিটু মিয়া একই বাড়িতে বসবাস করতেন। টিটুর পিতার নাম আব্দুল হক ফরিদ মিয়া। আবুল মিয়া ও তার ভাই আব্দুল কাদিরের জমি বিক্রির ১২ লাখ টাকা পাওনা ছিল তাদের ভাতিজা টিটু মিয়ার কাছে। একাধিকবার টাকা চাওয়া হলেও গুরুত্ব দেননি টিটু। পাওনা পরিশোধ না করেই ওই জমিতে ঘর নির্মাণের কাজ করছিলেন তিনি।
রবিবার রাতে টাকা চাওয়া নিয়ে কথা কাটাকাটি হলে টিটু উত্তেজিত হয়ে ধারালো ছুরি দিয়ে আবুল মিয়ার বুকে আঘাত করেন। এসময় টিটু দা দিয়ে তার আরেক চাচা আব্দুল কাদিরের মাথা ও হাতে কূপ দেন। আবুল মিয়াকে ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। গুরুতর আহত আব্দুল কাদিরকে সিলেট ওসমানী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আবুল মিয়ার ৪ ছেলের মধ্যে বড় ছেলে যুক্তরাজ্যে থাকেন।

আহত আব্দুল কাদির বলেন, ১৫ বছর আগে বসতবাড়ির জায়গা বিক্রি করলেও টাকা দেয়নি টিটু। সে সন্ত্রাসীদের মত চলাফেরা করে। টাকা চাইলে আমাদেরকে মেরে ফেলার হুমকি দিতো। সে আমার ভাইকে হত্যা করেছে, আমাকেও হত্যা করতে চেয়েছিল। আমি তার দৃষ্ঠান্তমূলক শাস্তির দাবি করছি। ঘটনার সময় গ্রামের কনর মিয়ার ছেলে হাসান তার সাথে ছিল। হাসান টিটুকে বাধা না দিয়ে উস্কানি দিয়ে এই ঘটনা ঘটিয়েছে বলে তার অভিযোগ।

বালাগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আব্দুল লতিফ তরফদার ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, গতকাল সোমবার ময়না তদন্তের জন্য লাশ সিলেট ওসমানী হাসপাতালের মর্গে প্রেরণ করা হয়েছে। অভিযুক্ত টিটু পালিয়ে গেছে। এঘটনায় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আবুল মিয়া ও আব্দুল কাদিরসহ তারা ৬ ভাই দুই বাড়িতে বসবাস করেন। প্রায় ১৬ বছর আগে টিটুর বসতবাড়ি তার চাচা আবুল মিয়া ও আব্দুল কাদিরের কাছে ১২ লক্ষ টাকায় বিক্রি করেন। চাচারা ওই সময়ে সরল বিশ্বাষে সম্পূর্ণ টাকা পরিশোধ করে দেন। কিন্তু টিটু জায়গা রেজিস্ট্রি করে দেননি। টিটু ওই টাকা দিয়ে তার মামার বাড়ি ফেঞ্জুগঞ্জ উপজেলার পালবাড়ি এলাকার কচুয়াবর গ্রামে বাড়ি কিনে সেখানে চলে যান। ভাই মিটুকে গ্রীসে পাঠান। এক বছর পর টিটু সেই বাড়ি বিক্রি করে দিয়ে ফের বাড়িতে চলে আসেন। চাচা আবুল মিয়া ও আব্দুল কাদিরের কাছে বিক্রিত জায়গা সমমূল্যে ফেরৎ নেওয়ার দাবি করেন। চাচারা রাজি হয়ে যান। টিটু পারবার নিয়ে ওই জায়গায় বসবাস শুরু করলেও চাচাদের টাকা ফেরৎ দিতে টালবাহানা করেন।

আব্দুল কাদির অভিযোগ করে বলেন, টিটু ও তার ভাই মিটু অত্যান্ত খারাপ প্রকৃতির এবং পরধন লোভী। তারা মানুষের জমি ও টাকা আত্মসাতের ধান্ধায় লিপ্ত। এক মহিলার টাকা আত্মসাৎ করায় মিটুর বিরুদ্ধে ২২ লাখ টাকার চেক ডিজঅনার মামলা রয়েছে। সে আওয়ামী লীগের প্রয়াত এমপি মাহমুদ উস সামাদের আস্থাভাজন হওয়ায় বিগতদিনে মানুষের টাকা আত্মসাৎ ও প্রতারণা করতো। টিটুর বিবাহিত দুই বোন বেড়াতে আসলে তার মা ও বোনদের সাথে আমি ও আমার ভাই পাওনা টাকা নিয়ে কথা বলি। ওই সময়ে টিটু গ্রামের বাজারে জোয়া খেলছিল। তার ঘর থেকে একথা ফোনে টিটুকে জানানো হয়। টিটু তার সহযোগী হাসানকে সাথে নিয়ে বাজার থেকে ছুরি নিয়ে এসেই আমার ভাইকে হত্যা করে। হত্যার উদ্দেশ্যে আমাকেও দা দিয়ে কুপিয়েছে।

কোম্পানীগঞ্জ: সিলেটের কোম্পানীগঞ্জে পুকুরে মাছ ধরা নিয়ে বিরোধকে কেন্দ্র করে হামলায় আফতাব উদ্দিন (২৪) নামে এক যুবক নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় নিহতের চাচাতো ভাই জুয়েল আহমদ (২৮) কে আটক করেছে পুলিশ।

রোববার (২৫ অক্টোবর) দিবাগত রাত ১টার দিকে উপজেলার দুপরিরপাড় গ্রামে হামলার ঘটনা ঘটে। এরপর সোমবার (২৬ অক্টোবর) ভোর ৫টার দিকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আফতাবের মৃত্যু হয়। নিহত আফতাব উদ্দিন দুপরিরপাড় গ্রামের কালা মিয়ার ছেলে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পুকুরের মালিকানা নিয়ে আফতাবের পরিবারের সঙ্গে তাঁর চাচা আব্দুল হালিমের ছেলেদের বিরোধ চলে আসছিল। রোববার রাত সাড়ে ১২টার দিকে আফতাব ও তাঁর সহযোগী জাহাঙ্গীর আলম পুকুরে সেচ দিয়ে মাছ ধরছিলেন। এ সময় আফতাবের চাচাতো ভাইসহ কয়েকজন দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তাঁদের ওপর হামলা চালান বলে অভিযোগ রয়েছে।

এতে আফতাব গুরুতর আহত হন। তাঁকে উদ্ধার করে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় জাহাঙ্গীর আলমও আহত হয়েছেন। তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
কোম্পানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) উজমান গণি বলেন, পুকুর নিয়ে আফতাবের সঙ্গে তাঁর চাচাতো ভাইদের বিরোধ ছিল। ওই পুকুরে মাছ ধরাকে কেন্দ্র করে গতরাতে আফতাবের উপর হামলা হয়। ভোরে তিনি মারা যান।
ওসি বলেন, এ ঘটনায় একজনকে আটক করা হয়েছে। মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।

জকিগঞ্জ: সিলেটের জকিগঞ্জে ছেলের হামলায় গুরুতর আহত মা পিয়ারা বেগম (৬৩) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। এ ঘটনায় আড়াই বছরের শিশুকন্যাসহ পরিবারের আরও চার সদস্য গুরুতর আহত হয়েছেন।

ঘটনার পরপরই প্রধান অভিযুক্ত ছেলে সুমন আহমদকে (৩২) গ্রেফতার করেছে পুলিশ। রোববার তাকে জকিগঞ্জের সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ইব্রাহিম সরকারের আদালতে হাজির করা হলে বিচারক তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

পিয়ারা বেগম জকিগঞ্জ পৌর এলাকার পঙ্গবট গ্রামের মৃত ফয়জুল ইসলামের স্ত্রী।
পুলিশ ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জায়গা-সম্পত্তি নিজের নামে লিখে দেওয়ার দাবিতে ও টাকা চাওয়াকে কেন্দ্র করে গত শুক্রবার সৎমা কুটিনা বেগমকে (৪৫) লাঠি দিয়ে আঘাত করে ছেলে সুমন আহমদ। এতে সৎমায়ের চোখে আঘাত লাগে। পরে তাকে উদ্ধার করে চিকিৎসা দেওয়া হয়।

এরপর সুমনের মা পিয়ারা বেগম ছেলের হামলা থেকে রক্ষা করার জন্য সতীন কুটিনা বেগমকে তার অপর ছেলে শাহীন আহমদের ঘরে নিরাপদে রাখেন।
পরদিন শনিবার রাত প্রায় ১১টার দিকে সুমন আবারও পরিবারের সদস্যদের কাছে টাকা দাবি করেন এবং জায়গা-সম্পত্তি তার নামে লিখে দিতে বলেন। এ নিয়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে সুমন লাঠি দিয়ে তাদের ওপর হামলা চালায়। এতে তার মা পিয়ারা বেগম, সৎমা কুটিনা বেগম, ভাই শাহীন আহমদ (৩৮), ভাইয়ের স্ত্রী শাহানা বেগম (৩২) এবং আড়াই বছরের ভাতিজি ইসরাত জাহান গুরুতর আহত হন।

স্থানীয় লোকজন আহতদের উদ্ধার করে জকিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাদের সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রোববার মধ্যরাতে পিয়ারা বেগমের মৃত্যু হয়।

পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, সুমন কয়েক দিন ধরে তাদের কাছে টাকা দাবি করছিলেন। একই সঙ্গে বাড়ির জায়গা-সম্পত্তি নিজের নামে লিখে দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করছিল। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, সুমন দীর্ঘদিন ধরে নেশাগ্রস্ত। নেশার টাকার জন্য পরিবারের নিয়মিত চাপাচাপি করে আসছিল।
এ ঘটনায় সুমনের আপন বড় ভাই শাহীন আহমদ বাদী হয়ে সুমন আহমদ ও অপর ভাই শামীম আহমদকে (৪৭) আসামি করে মামলা করেছেন।

মামলার বাদী শাহীন আহমদ জানান, হামলায় আহতদের মধ্যে তার স্ত্রী শাহানা বেগম ও মেয়ে ইসরাত জাহানের অবস্থা আশঙ্কাজনক। সৎমা কুটিনা বেগমের চোখের জখমও গুরুতর। তিনি নিজেও মারাত্মক আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছেন।

জকিগঞ্জ থানার ওসি মুহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ছেলের হামলায় আহত পিয়ারা বেগম চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। ঘটনার পরপরই অভিযান চালিয়ে প্রধান অভিযুক্ত সুমন আহমদকে তার বসতঘর থেকে গ্রেফতার করা হয়। রোববার তাকে আদালতে পাঠানো হলে বিচারক কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। হামলার ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায় হত্যা মামলায় দণ্ডবিধির ধারা সংযোজন করা হবে।

ওসি আরও বলেন, প্রাথমিকভাবে জানা গেছে- জায়গা-সম্পত্তি নিজের নামে লিখে দেওয়ার জন্য সুমন কয়েক দিন ধরে পরিবারের সদস্যদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছিল। এ বিরোধ থেকেই ঘটনার সূত্রপাত হয়েছে। সুমনের বিরুদ্ধে থানায় একাধিক মামলা রয়েছে।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত