তপন কুমার দাস, বড়লেখা :

২৬ মার্চ, ২০১৬ ২২:৫৭

ইউপি নির্বাচন বড়লেখা : আস্থার সংকটে ভোটাররা

(দক্ষিণভাগ উত্তর, দক্ষিণ ও সুজানগর ইউনিয়ন)

মৌলভীবাজারের বড়লেখায় ছয় দফার এবারের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের দ্বিতীয় দফায় ভোট গ্রহণ হবে ৩১ মার্চ। কিন্তু এ নির্বাচনকে ঘিরে জনমনে এমন ধারণা বদ্ধমূল হচ্ছে বা এমন ধারণা প্রচার পাচ্ছে যে, নির্বাচনে জনগণ ভোট দিতে পারবে কি না। অবশ্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই বিষয়ে শঙ্কা অমূলক বলে উড়িয়ে দিয়ে সকল ধরণের আশ্বাস দেয়া হচ্ছে। সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের জন্য সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।     

নির্বাচন নিয়ে মাঠে-ঘাটে-বাজারে চায়ের স্টলে কথার ঝড় বইছে। নানা আলোচনা-সমালোচনার কথা উঠছে নির্বাচন নির্বিঘ্ন হবে কি না। আর এ প্রশ্নে সরকার বিরোধীরাতো বটেই জনমনে আস্থার বড় সংকট তৈরি হচ্ছে বা করা হচ্ছে। অনেককে বলতে শোনা যাচ্ছে, দলীয় মার্কার এই ভোটে ক্ষমতাসীন দলের বাইরে ভোট দেয়া যাবে কি না। আবার এমনও বলতে শোনা গেছে, ভোটতো কেন্দ্রে কেন্দ্রে গণনা করা হবে না। উপজেলায় গণনা করা হবে।

সরেজমিনে বুধবার (২৩ মার্চ) ও বৃহস্পতিবার (২৪ মার্চ) উপজেলার দক্ষিণভাগ দক্ষিণ, সুজানগর ও দক্ষিণভাগ উত্তর (কাঁঠালতলী) ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম ও স্থান ঘুরে ইউনিয়নবাসীর সাথে কথা বলে এ ধারণাটি পাওয়া গেছে।


সরেজমিনে দক্ষিণভাগ উত্তর ইউনিয়ন ঘুরবার সময় কাঁঠালতলী বাজারে ৫নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা নূর উদ্দিনের সাথে কথা হয়, তিনি বলেন, ‘মারামারি একবার অইগেছে। জানিনা ভোট দিমাত পারমু কি না। আতঙ্কে আছি।’  


এই বাজারে কথা হয় বাছিত আহমদ (৪৫) নামের এক রিকশা চালকের সাথে। তিনি বলেন, ‘আমরার এলাকায় কোনো সমস্যা অইতো নায় আশা করিয়ার। তবে একবার মারামারি অইছে। মনে অর আর মারামারি অইতো নায়। হকলউ (সবাই) সতর্ক থাকবা।’

এই ইউনিয়নের পরে সরেজমিনে সুজানগর ইউনিয়ন এলাকায় ঘুরবার সময় দুপুরে সুজানগর বাজারে পাওয়া গেল বিএনপি প্রার্থী ও বর্তমান চেয়ারম্যান নছিব আলীকে। গণসংযোগ করছেন তিনি। নছিব আলী বলেন, ‘আওয়ামী লীগ প্রার্থীর লোকজন ভোটারদের কাছে প্রচার করছেন নৌকায় ভোট না দিলে সকল উন্নয়ন কাজ বন্ধ হয়ে যাবে। ভোট দিলেও পাশ, না দিলেও ‘নৌকা’ পাশ। তাদের এসব কথায় ভোটাররা আতঙ্কে রয়েছেন।’ তিনি বলেন, ‘সুষ্ঠু ভোট গ্রহণ হলে আমি বিপুল ভোটে জয়ী হবো।’  

তবে সুজানগর ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ প্রার্থী ইমরুল ইসলাম লাল বিএনপি প্রার্থীর এসব অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘এসব প্রচারণা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট। আমার জনপ্রিয়তা দেখে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন হবে। উন্নয়নের মার্কা নৌকায় ভোট দিয়ে জনগণ অবশ্যই আমাকে জয়ী করবে।’


সুজানগর ইউনিয়ন ঘুরতে ঘুরতে ততক্ষণে বেলা বিকেলের দিকে গড়িয়ে গেছে। প্রার্থীদের প্রচারের মাইক বেরিয়েছে। গ্রামের ভেতরে, প্রধান সড়কে চলছে গানে গানে ভোট প্রার্থনা।  


সরেজমিনে বৃহস্পতিবার (২৪ মার্চ) দক্ষিণভাগ দক্ষিণ ইউনিয়নের কালাজুরা গ্রামে গণসংযোগে পাওয়া গেলো আওয়ামী লীগের ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী মহিউদ্দিন আহমদ আদনানকে। দলের বাইরে কেন ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী হলেন এই প্রশ্নটা করতেই তাঁর সাথে থাকা সমর্থকরা কে কার আগে কারণটা ব্যাখ্যা করবেন-এ নিয়ে একটা রীতিমতো সোরগোল পড়ে গেল।


আদনানের সাথে থাকা ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সহসভাপতি নূরুল হক বললেন, ‘আমি বঙ্গবন্ধুর সময় থেকে আওয়ামী লীগ করিয়ার। আমরা তাঁর মহিউদ্দিনের সাথে আছি।’ এই আওয়ামী লীগ নেতা অভিযোগ করলেন, তৃণমূলে প্রার্থী বাছাইয়ের সময় প্রার্থীদের কেউ কাউন্সিলরদের টাকা দিয়ে ভোট কিনেছেন।


কথা হয় দক্ষিণভাগ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের আইন বিষয়ক সম্পাদক গোলাম রব্বানী ও ৩নং ওয়ার্ড যুবলীগ সভাপতি আব্দুর রবের সাথে তারা বলেন, ‘আওয়ামী লীগকে বাঁচাতে আমরা আদনানের সাথে আছি। সুষ্ঠু ভোট হলে অদনান বিপুল ভোটে জয়ী হবে।’


কলাজুরা গ্রাম থেকে বের হয়ে সমনভাগ চা বাগান এলাকার একটি চা-স্টলে বসে কথা হয় কয়েকজনের সাথে। সমনবাগ চা বাগানের শ্রমিক আনন্দ মুন্ডা বললেন, ‘দলীয় প্রতীক থাকলেও ইবার আমরা ব্যক্তি দেখিয়া ভোট দিমু। ভোট নিয়ে কোনো ডর (ভয়) নাই।’


স্টল থেকে বের হয় এই পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে পাওয়া গেল কলাজুরা গ্রামের বাসিন্দা মালিক আহমদকে। ভোটের প্রসঙ্গে কথা বলার সময় তিনি বলেন, ‘দলীয় নির্বাচন হলেই কালাজুরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে মারামারি হয়। এবারও মারামারি আশঙ্কা আছে। দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হওয়ার কারণেই তিনি এ আশঙ্কা করছেন।’


এরপর এই ইউনিয়নের নিজ দক্ষিণভাগ এলাকায় প্রচারণায় পাওয়া গেল বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী ইকবাল আহমদকে। ইকবাল আহমদ বলেন, ‘উৎসবের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। মানুষ উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট দিতে চায়। তবে কিছু এলাকায় সরকার দলের লোকজন আমার ভোটারদের হুমকি দিচ্ছেন।’ তবে ভোটের পরিবেশের বিষয়টি ছাপিয়ে তাঁর ক্ষোভ দলের নেতৃবৃন্দের উপর। বলেন, ‘আমি বিদ্রোহী প্রার্থী না। আমি তৃণমূলের প্রার্থী। তৃণমূলে সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে আমি নির্বাচিত হয়েছিলাম। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে কেন্দ্র থেকে আমার মনোনয়ন পাল্টে দেওয়া হয়েছে।’ জনগণ আমার সাথে আছে। আমি অবশ্যই সবার দোয়ায় জয়ী হবো।


কথা হয় নিজ দক্ষিণভাগ গ্রামের আহমদ আলী ও সমছ উদ্দিন নামের দুজন ভোটারের সাথে। তাঁরা বলেন, ‘দেখাতো যার আমারার গ্রামে কোনো সমস্যা নাই। মানুষের কথাবার্তায় মনে অর (হচ্ছে) কেউ প্রতীক আবার কেউ ব্যক্তি দেখিয়া ভোট দিব।’

এ ব্যাপারে বড়লেখা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম আব্দুল¬াহ আল মামুন ‘সিলেটটুডে টুয়েন্টিফোরকে’ বলেন, ‘ভোট গ্রহণ নিয়ে এরকম প্রচারণার কথা আমরাও শুনেছি। তবে এগুলো গুজব। এবারের নির্বাচনে ভোট কেন্দ্রে আগের চেয়ে চারগুণ বেশি পুলিশ থাকবে, আনসার থাকবে। প্রশাসন নিরপেক্ষ ও শক্ত অবস্থানে থাকবে। কাউকে কোনো অবৈধ সুযোগ দেওয়া হবে না। কেন্দ্রে কেন্দ্রে ভোট গণনা করে ফলাফল ঘোষণা করা হবে। সুষ্ঠু ভোট নিয়ে ভোটারদের শঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।’

(আগামী কাল পড়ুন-তালিমপুর, বর্ণি ও দাসের বাজার ইউনিয়ন পরিষদের ভোট নিয়ে ভোটারদের ভাবনা।)

আপনার মন্তব্য

আলোচিত