১৬ আগস্ট, ২০১৬ ০০:১৫
উগ্র মতাদর্শকে রুখতে পারে উন্নত মতাদর্শের বিস্তার। পৃথিবীর প্রাগ্রসর সমাজে ইতিবৃত্ত ঘাঁটলে দেখা যায় উন্নত মতাদর্শের বিস্তার হয়েছে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মধ্য দিয়েই। কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে উগ্র মতবাদ প্রতিরোধ সম্ভব নয় বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের উপর জোর দিয়ে থাকেন।
সম্প্রতি দেশে একাধিক জঙ্গি হামলার পর সরকারের পক্ষ থেকেও সাংস্কৃতিকভাবে জঙ্গি প্রতিরোধের আহবান জানানো হয়েছে।
এ সম্পর্কে মদন মোহন কলেজের অধ্যক্ষ ড. আবুল ফতেহ ফাত্তাহ বলেন, "বর্তমানে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের বিকল্প নেই। নাট্যকর্মীসহ সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। সমাজের মধ্যে যদি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছড়িয়ে দেয়া যায়, তাহলে জঙ্গিবাদ মোকাবেলা করা সম্ভব। আমরা সবাই যদি সম্মিলিতভাবে যার যার অবস্থান থেকে প্রতিবাদ জানাই, প্রতিরোধের চেষ্টা করি তাহলে এ সমস্যা সমাধান সহজ হবে।"
তবে সাংস্কৃতিক আন্দোলন তৈরি করে উগ্রবাদ প্রতিরোধে কতটা সক্রিয় আছে সিলেট এই নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে সিলেটের সাংস্কৃতিক আন্দোলন কেবল কিছু র্যালী আর মানববন্ধনেই সীমাবদ্ধ।
বিষয়টি স্বীকার করেন সিলেট সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক শামসুল আলম সেলিমও। সিলেটটুডে টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, "বিভিন্ন সময় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আয়োজিত মানববন্ধন বা র্যালীতে অংশ নিয়েছেন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীরা। কিন্তু সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের ব্যানারে এখনো কোনো অনুষ্ঠান করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। তবে ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবসের পরে 'গান-কবিতায় প্রতিবাদ' নামে আসছে কর্মসূচি।"
জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে মানববন্ধন আর র্যালীই কি যথেষ্ট জানতে চাইলে সম্মিলিত নাট্য পরিষদ, সিলেটের নতুন সভাপতি মিশফাক আহমদ মিশু বলেন " নাট্য পরিষদের নতুন কমিটি সম্প্রতি দায়িত্ব নিয়েছে। আগামী ১৯ তারিখ নাট্য পরিষদের কাউন্সিলরদের মিটিং ডাকা হয়েছে, সেখান থেকেই আসতে পারে নতুন ধরনের কর্মসূচী।"
মানববন্ধনের বাইরে অবশ্য ব্যতিক্রমী একটি কর্মসূচি পালন করেছে নাট্যদল নগরনাট। গত ২৯ জুলাই সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে তারা জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করে যেখানে "আদমটেস্ট" নামে জঙ্গিবাদ বিরোধী একটি পথনাটক পরিবেশিত হয়।
নগরনাটের মুখপাত্র অরূপ দাস বলেন, "আমরা এই নাটকটির মাধ্যমে সাধারণ জনগণের সামনে তুলে ধরতে চেয়েছি কিভাবে ধর্মের ভুল ব্যাখ্যায় বাংলাদেশের তরুণ সমাজ বিপথগামী হচ্ছে। আর এতে আশানুরূপ সাড়াও পাওয়া গেছে।"
প্রসঙ্গত সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়া ও পলাতক থাকা সিলেটের বেশ কয়েকজন তরুণ জঙ্গির খবর বের হবার পর এই অঞ্চলে জঙ্গিবাদের বিস্তার নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দেয়। ইতিমধ্যে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২ জন ও বেসরকারি লিডিং বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩ জন ছাত্রকে গ্রেপ্তার করে কাউন্টার টেররিজম ইউনিট। এছাড়াও আলোচিত জঙ্গি নেতা তামিম চৌধুরী ও সেনা বাহিনী থেকে জঙ্গি সমন্বয়ক হিসেবে বরখাস্ত মেজর জিয়াউদ্দিনের বাড়িও সিলেটে। গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে এই দুই হোতার মাধ্যমে এই অঞ্চলের আরও বেশ কয়েকজন তরুণ জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ার ধারনা করা হচ্ছে।
১৯৯৯ সালে রমনার বটমূলে বোমা হামলা চালায় জঙ্গিরা পরে ২০০৫ সালে সারাদেশে একযোগে সিরিজ বোমা হামলার মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করে জঙ্গি সংগঠন জেএমবি। সেই থেকেই শুরু, বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নাম নিয়ে নিজেদের অস্তিত্বের জানান দিয়ে গেছে তারা । কখনো দেশি হুজি, কখনো বিদেশী আল-কায়েদা কিংবা আইএস নাম নিয়ে চলে তাদের সহিংসতা। খুন হন ব্লগার, লেখক, শিক্ষক, বিদেশী নাগরিক, বিভিন্ন ধর্মীয় নেতা ও লোক সংস্কৃতির চর্চাকারীরা। এই সহিংসতা ধীরে ধীরে বিস্তার লাভ করে দানবাকৃতি ধারণ করেছে।
সর্বশেষ গত ১ জুলাই রাজধানীর গুলশানের হোলি আর্টিজেন রেস্তরায় বিদেশিসহ ২২ জনকে হত্যা করে জঙ্গিরা। পরে সেনা বাহিনীর কামান্ডো দলের অভিযানে ৫ জঙ্গির নিহত হবার মাধ্যমে উদ্ধার হন ১৩ জন জিম্মি। এই ঘটনার রেশ না কাটতেই পবিত্র ঈদুল ফিতরের দিনে ঐতিহাসিক শোলাকিয়া মাঠে হামলা চালাতে গেলে জঙ্গিদের বাধা দেয় পুলিশ। নিহত হন দুই পুলিশ সদস্য, পুলিশের সাথে সংঘর্ষে নিহত হয় এক জঙ্গিও। এরপর গত ২৬ জুলাই রাজধানীর কল্যাণপুরে জঙ্গি আস্তানায় অভিযান চালালে পুলিশের সাথে দফায় দফায় গুলাগুলির পর নিহত হয় ৯ জঙ্গি।
এসব ঘটনার পর নড়ে চড়ে বসে প্রশাসন। আইন শৃঙ্খলা বাহিনী প্রধানগণ, সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-মন্ত্রী, বিরোধীপক্ষসহ সমাজের সর্বস্তরের মানুষ এর প্রতিবাদে মুখর হয়ে ওঠেন। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের কণ্ঠে একটাই কথা উঠে আসে, শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একার পক্ষে এ সমস্যা মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবেলায় এগিয়ে আসতে হবে। সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক আন্দোলনই পারে জঙ্গিবাদ নামক বিষবৃক্ষকে রুখে দিতে।
পুলিশের পক্ষ থেকে বিভিন্ন মতবিনিময় সভা, সচেতনতামূলক র্যালির আয়োজন করা হচ্ছে, বাড়ানো হয়েছে পুলিশি তৎপরতা। রাজনৈতিক নেতারাও মানববন্ধন, প্রতিবাদ সমাবেশ করে যাচ্ছেন। প্রতিবাদ চলছে যার যার অবস্থান থেকে।
আপনার মন্তব্য