২৭ আগস্ট, ২০১৬ ২০:০৩
মুক্তিযুদ্ধ করেও হতে পারলাম না মুক্তিযোদ্ধা, পেলাম না মুক্তিযোদ্ধার সনদ। মহিলারা বললেন, ১৯৭১ সালে ইজ্জত হারিয়ে হতে পারলাম না বীরাঙ্গনা। এই কথাগুলি বললেন সুনামগঞ্জ জেলার শাল্লা উপজেলার ৪নং শাল্লা ইউনিয়নের কামারগাঁও গ্রামের একদল নারী-পুরুষ।
কামারগাঁও গ্রামের মো: শহীদ মিয়া (৬০), মো: কালু মিয়া (৬৫), রহমত আলী (৭০), জুনাব আলী (৬০), জয়নাল মিয়া (৭৫), গিয়াস উদ্দিন (৭০), এলামধর মিয়া (৭৫) বলেন, সেই ১৯৭১ সাল জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সেই ভাষণ “আমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে, তেমনি আমরাও সেই ভাষণে একাত্মতা প্রকাশ করে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ি। হিন্দু, মুসলিম, খ্রিষ্টান কৃষক, জেলে, চাষি, মাঝি সর্ব পেশার মানুষ সেই মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। আমরাও আমাদের শেষ সম্বল একটি নৌকা, সেই নৌকা নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করি।
তারা আরো বলেন, তখনকার সময়ে ইঞ্জিন চালিত কোন নৌকা ছিল না। আমরাই ইঞ্জিন চালিত নৌকার মত দাড়-বৈঠা এবং লগি দিয়ে সেই মুক্তিযোদ্ধাদের এ প্রান্ত থেকে ঐ প্রান্তে নিয়ে যাই এবং আমরা তাদের সাথে যুদ্ধে শরিক হই। আমরা যাদের সাথে যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছি তারা হলেন, কমান্ডার সুকুমার দাস, উকিল দাস, বীরেন্দ্র দাস, সুবোধ দাস তাদের নেতৃত্বে। খালিয়াজুরী উপজেলার মরা গাংগী নামক স্থানে যুদ্ধ ক্ষেত্রে প্রাণ হারিয়েছিল আমাদের সহচরী জয়নাল মিয়া।
আমরা যুদ্ধে অংশ নিয়েছি আজমিরীগঞ্জ উপজেলার পাহাড়পুর, দিরাই উপজেলার কুলঞ্জ, শাল্লা উপজেলার পিটুয়ারকান্দা, শ্যামারচর বাজারেও। সেই শ্যামারচর বাজারে পাক-বাহিনীদের বুলেটের আঘাতে আমাদের নৌকাটি ভেঙ্গে-চুরে পরে। আর আমরা আমাদের গ্রামের বাড়ির কোন খোজ-খবর রাখতে পারিনি।
এদিকে শ্যামারচর গ্রামের আব্দুল খালেক মিয়ার নির্দেশে কামারগাঁও গ্রামের অসহায় সেই নারীদেরকে রাজাকার ও পাক-বাহিনী ধরে নিয়ে আসে শ্যামারচর বাজারে। তারা হলেন, ললিতা বিবি (৬৫), আমেনা বিবি (৬৫), মনোয়ারা বেগম (৬৫)। তাদেরকে এনে শ্যামারচর বাজারের একটি ঘরে রাজাকার ও পাক সেনাদের উপহার দেন রাজাকার আব্দুল খালেক মিয়া। ৩ দিন চলে তাদের উপর পাশবিক নির্যাতন। তারপর নিয়ে আসা হয় ঘুঙ্গিয়ার বাজারে। আরম্ভ হয় নতুন ভাবে নির্যাতন ও ধর্ষণ। পরে অচেতন অবস্থায় ফেলে আসে দামপুর গোদারা ঘাটের সামনে। জ্ঞান ফিরে আসলে আশপাশের লোকদের সহায়তায় আমরা গোবিন্দপুর গ্রামে কোন রকমে পৌছতে পারি। পরে গ্রাম্য ডাক্তার দ্বারা চিকিৎসা নেই।
কিন্তু দু:খের বিষয় এতকিছু হারানোর পরেও আমরা পাইনি মুক্তিযোদ্ধা ও বীরঙ্গনার কোন সনদ। দ্বারে দ্বারে ঘুরেও পাইনি আমরা কোন সহায়তা। তাহলে আমরা কি এভাবেই থেকে যাব। দেশের জন্য ইজ্জত দিয়েছি, রক্ত দিয়েছি, প্রাণ দিয়েছেন একজন কিন্তু আমরা কি পেলাম, আমরা তো কিছুই পেলাম না। আমাদের সবকিছু যাচাই-বাছাই করে আমরা যদি সত্যিকারের মুক্তিযুদ্ধ করে থাকি আর আমাদের মহিলারাও যদি ইজ্জত হারিয়ে থাকেন, তাহলে আমাদেরকে মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনার সনদ দেওয়া হোক।
এ ব্যাপারে শাল্লা উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার গোপিকা রঞ্জন দাস (গৌরাঙ্গ) বলেন, কামারগাঁও অনেকেই মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করিছেন। তারা ছিল সক্রিয় মুক্তিযোদ্ধা।
ডুমরা গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা প্রেমবাসী দাসের সাথে আলাপ হলে তিনি বলেন, কামারগাঁও গ্রামে যাদের নাম বলেছেন তারা মুক্তিযুদ্ধে নৌকা চালক ছিল এবং তারা মুক্তিযুদ্ধও করেছে। তবে তারা প্রথমে জোড়ালো কোন সুরাহা করেনি বলে এখন পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধা সনদ পায়নি।
আপনার মন্তব্য