মারূফ অমিত

১৩ এপ্রিল, ২০১৫ ১৬:১৫

বর্ষবরণ ১৪২২: সিলেট জুড়ে চলছে প্রস্তুতি

সিলেট জেলা শিল্পকলা একাডেমী, সম্মিলিত নাট্য পরিষদ সিলেট, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্টী সিলেট জেলা সংসদ, শ্রুতি, আনন্দলোক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, এমসি কলেজ, লিডিং ইউনিভার্সিটি, মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি, নর্থ ইস্ট ইউনিভার্সিটি, এবং ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজসহ সিলেটের সর্বত্র চলছে প্রস্তুতি।

চলছে মুখোশ, ঘুড়িসহ মঙ্গল শোভাযাত্রার বিভিন্ন উপকরণ নির্মাণ প্রস্তুতি। শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছবিটি তুলেছেন মোহাম্মদ আলী

রাত পেরোলেই বাংলা নতুন বছরের প্রথম দিন, পহেলা বৈশাখ! সর্বত্র উৎসবের আমেজ। সাজ সাজ রব। বাঙালীর সবচেয়ে বড় এই উৎসবকে বরণ করতে সারা দেশের মতো সিলেটে চলছে নানা আয়োজন। প্রতিবারের মতো এবারো বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও পেশাজীবী সংগঠনের পক্ষ থেকে থাকছে সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি ।

নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে ব্যাপক প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে সিলেট জেলা শিল্পকলা একাডেমী। ‘এসো মিলি প্রাণের উৎসবে’ এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে একশো এক কণ্ঠে বৈশাখকে বরণে জেলা শিল্পকলা একাডেমী আয়োজন করেছে দিনব্যাপী বর্ষবরণ উৎসবের। উৎসব প্রাঙ্গণ অপরূপ সাজে সজ্জিত করেছে একাডেমীর চারুকলা বিভাগের শিক্ষার্থীরা।

ওই দিন সকাল সাড়ে ৭টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা পর্যন্ত শিল্পকলা একাডেমী প্রাঙ্গণে চলবে এই বর্ণাঢ্য উৎসবটি। মঙ্গল প্রদীপ প্রজ্জ্বলন ও ঢাকের বাদ্যের মধ্য দিয়ে মাঙ্গলিক শুভ উদ্বোধন হবে বর্ষবরণ উৎসবের। দিনব্যাপী পরিবেশিত হবে বৈশাখের গান, লোকসংগীত, কাঠিনৃত্য, ঝুমুরনৃত্য, লোকনৃত্য, লাঠি খেলা, একক ও সম্মেলক সংগীত, বৃন্দ আবৃত্তি, জারিগান, ধামাইল, মণিপুরীনৃত্য, আবৃত্তি, বাউলগান এবং চিত্রাংকন প্রতিযোগিতা। এ বর্ষবরণ উৎসবের উদ্বোধন করবেন প্রবীণ লোকসংগীত শিল্পী সুষমা দাস। প্রধান অতিথি হিসেবে সিলেটের জেলা প্রশাসক মোঃ শহিদুল ইসলাম ও বিশেষ অতিথি হিসেবে মদন মোহন কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডক্টর আবুল ফতেহ ফাত্তাহ উপস্থিত থাকবেন।

এছাড়াও সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অঙ্গণের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং সুধীজন উপস্থিত থাকবেন। ওইদিন বেলা ১টায় সিলেট জেলা শিল্পকলা একাডেমী ও সিলেট আর্ট এন্ড অটিস্টিক স্কুলের যৌথ উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হবে চিত্রাংকন প্রতিযোগিতা। সকলের জন্য উন্মুক্ত চিত্রাংকন প্রতিযোগিতায় ‘ক’ বিভাগে প্লে থেকে কেজি শ্রেণী ইচ্ছেমতো, ‘খ’ বিভাগে প্রথম থেকে তৃতীয় শ্রেণী, মাধ্যম কালার পেন্সিলে গ্রামবাংলা; ‘গ’ বিভাগে চতুর্থ থেকে ষষ্ঠ শ্রেণি, মাধ্যম প্যাস্টল, বিষয় নবান্ন; ‘ঘ’ বিভাগে সপ্তম থেকে দশম শ্রেণি, মাধ্যম জলরং, বিষয় বৈশাখী মেলা; ‘ঙ’ বিভাগে উন্মুক্ত (একাদশ থেকে তদুর্দ্ধ) পেন্সিল স্কেচে কালবৈশাখী এবং বিশেষ বিভাগে (অটিজম বা প্রতিবন্ধী) ইচ্ছেমতো বিষয় ও মাধ্যমে আগ্রহীরা অংশগ্রহণ করতে পারবে।

দুপুর ১টায় পূর্ব শাহী ঈদগাহস্থ জেলা শিল্পকলা একাডেমীতে রেজিস্টেশন পূর্বক চিত্রাংকন প্রতিযোগিতায় সকলেই অংশগ্রহণ করতে পারবে। বর্ষবরণ উৎসব ও চিত্রাংকন প্রতিযোগিতায় সকলের অংশগ্রহণ, উপস্থিতি ও সহযোগিতা কামনা করেছেন জেলা কালচারাল অফিসার অসিত বরণ দাশ গুপ্ত ও সিলেট আর্ট এন্ড অটিস্টিক স্কুলের মেম্বার সেক্রেটারী তরুণ চিত্রশিল্পী ইসমাইল গণি হিমন।

সম্মিলিত নাট্য পরিষদ সিলেট’র আয়োজনে গত বছরের ন্যায় এবারও ১৪২১ বাংলাকে বিদায় ও ১৪২২ বাংলাকে স্বাগত জানিয়ে সুরমা নদীর তীরে ঐতিহাসিক চাঁদনিঘাটের সিঁড়িতে লোকজ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। আজ সোমবার বিকেল ৫টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত উন্মুক্ত এই অনুষ্ঠান চলবে। সূর্যাস্তের সাথে সাথে অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দেওয়া হবে ১৪২১ বাংলাকে বিদায়।

মঙ্গল প্রদীপ জ্বালিয়ে আহ্বান করা হবে ১৪২২ বাংলাকে। অনুষ্ঠানে লোকনৃত্য, লোকগান ও বাউলগান পরিবেশন করবেন সিলেটের বিভিন্ন সংগঠনের শিল্পীবৃন্দ। এতে সকলের উপস্থিতি কামনা করেছেন সম্মিলিত নাট্য পরিষদ সিলেটের সভাপতি অনুপ কুমার দেব ও সাধারণ সম্পাদক রজত কান্তি গুপ্ত। 

বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্টী সিলেট জেলা সংসদ বর্ষবরণ উপলক্ষে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। ‘রক্তে আনো লাল/রাত্রির গভীর বৃত্ত থেকে ছিড়ে আনো ফুটন্ত গোলাপ’ এই শ্লোগানকে সামনে রেখে মঙ্গলবার সকালে নগরীর মিরাবাজারস্থ মডেল হাইস্কুল মাঠে বর্ষবরণ উৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন মুক্তিযোদ্ধা প্রবীণ সাংস্কৃতিক সংগঠক পুরঞ্জয় চক্রবর্তী বাবলা। এরপর এক বর্ণাঢ্য মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করা হবে।

উৎসবের দ্বিতীয় পর্ব শুরু হবে বিকেল ৩ টায়। এসময় থাকবে স্বরচিত কবিতা পাঠের আসর। বিকেল সাড়ে ৩টায় থাকবে নৃত্যানুষ্ঠান। ৪টায় আলোচনা পর্বে মূখ্য আলোচক হিসেবে থাকবেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ প্রফেসর মো. আব্দুল আজিজ। বিকেল ৫টায় থাকবে উদীচী সিলেটের ‘তৃতীয় প্রজন্মের শিল্পীদের পরিবেশনায় সঙ্গীতানুষ্ঠান।

এরপর লাক্কাতুরা চা বাগানের প্রত্যাশা সাংস্কৃতিক দল তাদের ঐতিহ্যবাহী ঝুমুর নাচ ও লাঠি নাচ উপস্থাপন করবে। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা থেকে শুরু হবে উদীচী সিলেটের মূল অনুষ্ঠান। এতে লোকগান এবং কবি নির্মলেন্দু গুণের ভূমিহীনের পালা পরিবেশিত হবে।

এবার সাংস্কৃতিক সংগঠন শ্রুতি আয়োজন করেছে ‘শ্রুতি শতকন্ঠে বর্ষবরণ উৎসব-১৪২২ বাংলা’। মোবাইল ফোন অপারেটর গ্রামীণফোন এর সহযোগিতায় পহেলা বৈশাখ ব্লু-বার্ড স্কুল এন্ড কলেজের প্রাথমিক ক্যাম্পাসে সকাল ৭ টায় দিনব্যাপী এ উৎসব শুরু হবে। উৎসব উদ্বোধন করবেন, কবি তুষার কর। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার জামাল উদ্দিন আহমেদ, জেলা প্রশাসক শহীদুল ইসলাম, ব্লু-বার্ড স্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ হুসনে আরা, গ্রামীণ ফোন সিলেটের হেড অব রিজন এম শাওন আজাদ সহ অন্যান্য অতিথিবৃন্দ।

দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের মধ্যে থাকছে সকাল সাড়ে ৭ টায় বিষয় ও বিভাগ ভিত্তিক হাতের লেখা প্রতিযোগিতা, ৮টায় চিত্রাংকন প্রতিযোগিতাসহ সাংস্কৃতিক আয়োজন ও বৈশাখী মেলা। সাংস্কৃতিক আয়োজনে প্রথমেই থাকবে মঙ্গল ঢাকে নতুন বছরকে আবাহন, সপ্তসুরে আহ্বান, শতকন্ঠে বর্ষবরণ, শ্রুতি সম্মাননা ১৪২১ বাংলা প্রদান। এবারের গুনীজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মোহাম্মদ আরশ আলী। থাকবে সম্মেলক পরিবেশনা, একক পরিবেশনা।

এতে উপস্থিত থাকবেন কুষ্টিয়া হতে আগত ফকির আব্দুল কুদ্দুস ও তার দল, বাউল আব্দুর রহমান, লাভলী দেব, প্রদীপ মল্লিক সহ আরো অনেকে। বিকাল ৪টা থেকে থাকছে বাউল মেলা , রাধা রমনের গান। শতকন্ঠে বর্ষবরণে অংশ নেবে বাংলাদেশ ব্যাংক স্কুল, সিলেট অগ্রগামী বলিকা উচ্চ বিদ্যালয়, ব্লু-বার্ড স্কুল এন্ড কলেজ সহ বিভিন্ন স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীবৃন্দ। এছাড়াও থাকবে সাংস্কৃতিক পরিবেশনা।

নববর্ষকে বরণ করার জন্য রবীন্দ্রসঙ্গীত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আনন্দলোকও প্রস্তুত। উৎসবের উদ্বোধন করবেন বীর মুক্তিযোদ্ধা, নাট্য ব্যক্তিত্ব ভবতোষ রায় বর্মন। সকাল ৭ টা থেকে সন্ধ্যা ৬ টা পর্যন্ত আয়োজিত দিনব্যাপি অনুষ্ঠানমালায় থাকছে একক ও সম্মেলক কণ্ঠে সংগীত, আবৃত্তি, নৃত্যসহ নানান অনুষ্ঠানমালা। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করবে সিলেটের শিল্পীবৃন্দ ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রস্তুতি চলছে বর্ষবরণের। শিক্ষার্থীরা আলপনা একে বর্ণিল সাজে সাজিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। র‍্যালী, বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে উদযাপন করবে দিনটি।

ঐতিহ্যবাহী মুরারী চাঁদ কলেজে (এমসি কলেজ)ও চলছে বর্ষবরণের শেষ প্রস্তুতি। কলেজের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ বিভাগ সাজিয়েছেন বর্ণিল ভাবে। এম সি কলেজ সংলগ্ন টিলাগড় পয়েণ্টে হবে মনমুগ্ধ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

তাছাড়া বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় লিডিং, মেট্রোপলিটন, নর্থ ইস্ট এবং ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতেও চলছে নতুন বছরকে বরণ করার শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। মঙ্গল শোভাযাত্রা, লোকগীতি উৎসব, মঞ্চ নাটকের আয়োজন করা হয়েছে সিলেটের এসব বেসরকারি বিশবিদ্যলায়ে।

তাছাড়া সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজেও বিভিন্ন অনুষ্ঠান কর্মসূচি গ্রহণ করেছে পহেলা বৈশাখ উপলক্ষ্যে।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত