১৪ এপ্রিল, ২০১৫ ০০:৪০
বিকেলে প্রশাসনের অভিযানে গোপালটিলায় টিলা কাটায় ব্যবহৃত এই এসকেভেটর জব্দ করা হয়
দিনে প্রশাসন বন্ধ করে গেলেও রাতের আঁধারে সিলেট নগরীর গোপাল টিলায় ফের শুরু হয়েছে টিলা কাটা। সোমবার রাত ১২ টায় টিলা কাটার সংবাদ পেয়ে শাহপরান থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে টিলা কাটার সত্যতা পায়। মন্দির সংস্কারের নামে ঐতিহ্যবাহী এই টিলাটি কেটে ফেলা হচ্ছে।
টিলাগড় জিউড় আখড়া কমিটির সাধারণ সম্পাদক বিষ্ণুপদ দে রাতের আঁধারে টিলা কাটার কথা অস্বীকার করেন। তবে শাহপরান থানার ওসি সাখাওয়াত হোসেন, জানিয়েছেন, রাতের আঁধারে টিলা কাটা হচ্ছে সংবাদ পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে অভিযোগের সত্যতা পায়। এসময় পুলিশ দেখে টিলা কর্তনকারীরা কেটে পড়ে।
এরআগে সোমবার বিকেলে জলা প্রশাসকের নির্দেশে সদর উপজেলা এসি (ল্যান্ড) আবদুল্লাহ আল মাহমুদ গোপালটিলায় অভিযান চালিয়ে টিলা কর্তনকালে একটি এসকেভেটর জব্দ করে শাহপরান থানার কাছে হস্তান্তর করেন। এসময় পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন। অভিযানকালে এসি (ল্যান্ড) পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এই টিলায় সব ধরনের কর্মকান্ড বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন। পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে টিলা কাটার ব্যাপারে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়।
গোপাল টিলায় মন্দির সংস্কারের নামে টিলা কেটে সাবাড় করে ফেলা নিয়ে সোমবার দুপুরে সিলেটটুডে তে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এই প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়- গত ৪/৫ দিন ধরে এসকেভেটর দিয়ে ঐতিহ্যবাহী গোপাল টিলা কেটে সমতল ভূমিতে পরিণত করে ফেলা হয়েছে। কেটে ফেলা হয়েছে অসংখ্য গাছ। এতে ঝুঁকির মুখে পড়েছে টিলার নিচে বসবাসরত পরিবারগুলো।
সিলেটে পাহাড়-টিলা কাটায় হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা থাকলেও তা অমান্য করে টিলা কাটা হচ্ছে। স্থানীয় মন্দির কমিটির নামে টিলা কাটা চললেও এর পেছনে একটি প্রভাবশালী গোষ্টি জড়িত রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
দিনদুপুরে টিলা কাটা চললেও এতোদিন নিরব ভূমিকায় ছিলো প্রশাসন। সোমবার সকালে গোপাল টিলা ভূমি আত্মসাত প্রতিরোধ কমিটি বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক ও পরিবেশ অধিদপ্তরে লিখিত অভিযোগ জানালে টনক নড়ে প্রশাসনের।
সরেজমিনে দেখা যায়, দুটি এসকেভেটর দিয়ে সুউচ্চ গোপাল টিলার ১৪ থেকে ১৫ ফুট মাটি কেটে প্রায় সমতল ভূমিতে পরিণত করে ফেলা হয়েছে। টিলার মাটি কেটে পাশের ভূমিতেই ফেলা হচ্ছে। গোপালটিলার যে ভূমি প্লট করে দখলের চেষ্টা চালিয়েছিলো একটি প্রভাবশালী মহল সেখানেই ফেলা হচ্ছে টিলার কর্তনকৃত মাটি। দখল ঠেকাতে আন্দেঅরনকারীদের রিটের প্রেক্ষিতে এই ভূমির উপর উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ রয়েছে।
টিলা কেটে ফেলার ফলে স্বীয় বৈশিষ্ট হারিয়ে ফেলছে গোপাল টিলা। টিলা ভূমির কারনেই এই অঞ্চলের নামকরণ হয়েছিলো গোপাল টিলা।
মন্দিরের নামে টিলা কাটার সংবাদ পেয়ে বুধবার গোপালটিলা ভূমি আত্মসাত প্রতিরোধ কমিটি গোপালটিলা এলাকা পরিদর্শন করে। এসময় টিলা কাটার সত্যতা পায় তারা।
মঙ্গলবার সকালে নেতৃবৃন্দ জেলা প্রশাসকের সাথে দেখা করে টিলা কাটা বন্ধে স্মারকলিপি প্রদান করেন। একই স্মারকলিপি তারা বিভাগীয় কমিশনার, সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ পরিচালকের কাছে প্রদান করেন।
এরই প্রেক্ষিতে সদর উপজেলা ভূমি কর্মকর্তাকে গোপালটিলায় পাঠান জেলা প্রশাসক। তিনি ঘটনাস্থলে অভিযান চালিয়ে এসকেভেটর জব্দ করেন।
টিলা কাটার বিষয়টি স্বীকার করে গোপাল টিলা মন্দির কমিটির সাধারণ সম্পাদক বিষ্ণুপদ দেব বলেন, আমরা পরিবেশ অধিপ্তরের অনুমতি নিয়েই টিলা কাটছি।
তবে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, ৩ বছর পূর্বে মন্দির কমিটির পক্ষে টিলার উপরিভাগের মাটি কাটার জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরে একটি আবেদন করা হয়। পরিবেশ অধিপ্তর বিষয়টি বিবেচনা করার জন্য জেলা প্রশাসককে অনুরোধ করেন। তবে মন্দির কমিটি জেলা প্রশাসকের কাছে না গিয়ে টিলা কাটা শুরু করেন।
এ ব্যাপারে পূজা উদযাপন পরিষদ, সিলেট মহানগরের সাধারণ সম্পাদক রজতকান্তি গুপ্ত বলেন, মন্দির হোক এটা আমরাও চাই। কিন্তু পরিবেশের বিপর্যয় ঘটিয়ে, টিলা কেটে মন্দির নির্মান কখনোই কাম্য নয়। তিনি বলেন, টিলা কাটা বন্ধে প্রশাসনের ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
এ ব্যপারে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ, সিলেট মহানগরের সভাপতি মৃত্যুঞ্জয় ধর ভোলা বলেন, আমরা সরেজমিনে গিয়ে টিলা কাটার দৃশ্য দেখেছি। টিলা কাটার ফলে বৈশিষ্ট হারিয়ে ফেলছে গোপালটিলা।
তিনি বলেন, মন্দির নির্মান ও সংস্কারের ব্যাপারে আমাদের কারোরই আপত্তি নেই। বেশী বেশী মন্দির হোক এটা আমরা চাই। কিন্তু পরিবেশের বিপর্যয় না ঘটিয়ে ও আইন মেনেই মন্দির নির্মান করতে হবে। টিলা কাটা কখনোই সমর্থন যোগ্য নয়।
এ ব্যাপারে সোমবার দুপুরে সিলেটের জেলা প্রশাসক শহিদুল ইসলাম বলেন, গোপাল টিলার টিলা কাটার ব্যাপারে একটা অভিযােগ আমি পেয়েছি। এই ব্যাপারে খোঁজ নিতে একজন কর্মকর্তাকে পাঠিয়েছি।
আপনার মন্তব্য