১৫ এপ্রিল, ২০১৫ ১৮:৪৩
টেন্ডারবাজী, গ্রাম আদালত নির্মানের নামে প্রতারণা, চাকুরী বাণিজ্যের পর এবার পুষ্টি প্রকল্পের নামে টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগ উঠেছে চাঁদের হাসি চিহ্নিত পারিবারিক স্বাস্থ্য ক্লিনিকের বিরুদ্ধে। নগরীর হাউজিং এস্টেটের এই ক্লিনিকের বিরুদ্ধে এবার পুষ্টি প্রকল্পের ৫ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ ওঠেছে। এ অভিযোগে আজ বুধবার দুপুরে প্রতাণার শিকার ২০০ মাঠকর্মী বিক্ষোভ করেন ও ক্লিনিকে তালা ঝুলিয়ে দেন।
এসময় পুলিশ ঘটনাস্থলে হাজির হয়ে ক্লিনিকের প্রকল্প সমন্বয়কসহ দু'জনকে আটক করে। এদিকে, গণমাধ্যমে ক্লিনিকটির প্রতারণার সংবাদ প্রকাশের পর থেকেই আন্তগোপনে রয়েছেন ক্লিনিকটির চেয়ারম্যান ডা. জুবায়ের আহমদ। অনুসন্ধান করে জানা যায়, দি চাঁদের হাসি চিহ্নিত পারিবারিক স্বাস্থ্য ক্লিনিকের চেয়ারম্যান ডা. জুবায়ের পুষ্টি প্রকল্পের নামে পাঁচ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এই প্রকল্পের জন্য তিনি ৫০০ জন মাঠ কর্মী নিয়োগ দেন। মাঠকর্মীদের বেশীরভাগই গ্রাম্য ফার্মাসিস্ট। নিয়োগের পর তাদের প্রত্যেককে ধরিয়ে দেওয়া হয় ২শ' টাকা মূল্যমানের কিছু পুষ্টি কার্ড। এই কার্ডগুলো গ্রামীন মানুষের কাছে বিক্রি করার দায়িত্ব দেওয়া হয় মাঠকর্মীদের। বলা হয়, চাঁদের হাসি ক্লিনিকে এসে এই কার্ড দেখালেই পুষ্টি সামগ্রী। কিন্তু আদেত কার্ড দেখিয়েও এখন পর্যন্ত ক্লিনিকে এসে কোনো কার্ড গ্রহিতাই পুষ্টি সামগ্রী পাননি। উল্টো কার্ড বিক্রির পুরো টাকা আত্মসাত করে দন ডা. জুবায়ের।
এতে গ্রাহকদের তোপের মুখে পড়তে হচ্ছে মাঠকর্মীদের। জানা যায়, জানুয়ারী থেকে এপ্রিল পর্যন্ত বিক্রিত পুষ্টি কার্ডের সমস্ত টাকা তিনি হাতিয়ে নেন তিনি। প্রতারিত মাঠকর্মী সাইদুর রহমান বলেন, নিয়োগের পর থেকে আমি প্রায় ২শ' কার্ড বিক্রি করেছি। কিন্তু কোনো কার্ড গ্রহীতাই ক্লিনিকে এসে পুষ্টি সামগ্রী পাননি। একারনে আমকে গাহকদের তোপের মুখ পড়তে হচ্ছে। তিনি বলেন, এই প্রতারণার জন্য আমি ক্লিনকটির কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছি। গত কয়েকদিন ধরে এই ক্লিনিকটির অনিয়ম-প্রতাণা নিয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে আজ দুপুরে পুষ্টি প্রকল্পের মাঠ কর্মীরা ক্লিনিকের সামনে এসে বিক্ষোভ করে এবং গেটে তালা ঝুলিয়ে দেন। এ ঘটনার খবর শুনে স্থানীয় কাউন্সিলর কয়েছ লোদী এবং এয়ারপোর্ট থানা পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে প্রকল্পের সমন্বয়ক হুমায়ূন কবির লিমন এবং একজন কর্মচারীকে আটক করেন।
এ ব্যাপারে প্রকল্পের সমন্বয়ক হুমায়ুন কবির লিটন বলেন, এব ঘটনাকে আমি ঠিক প্রতারণা বলবো না। আবার ভালোও বলবো না। এই মূর্হর্তে আমি নিজেই বিপদে আছি। তাই কোনো মন্তব্য করতে পারবো না। উল্লেখ্য, এর আগে ইউএনডিপি এবং গ্রাম আদালতের নামে ভুয়া টেন্ডারবাজির অভিযোগ এবং ১০০ জন যুবককে প্রকল্পে চাকরী দেওয়ার নাম করে প্রত্যেকের কাছ থেকে নিকট হতে তিন হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে। জানা যায়, সিলেট বিভাগের ১১১টি ইউনিয়নে গ্রাম আদালতের এজলাস তৈরী করে দেয়ার নামে প্রতারণা করেছে ‘দি চাঁদের হাসি চিহ্নিত পারিবারিক স্বাস্থ্য ক্লিনিক’। রুরাল এডুকেশন এন্ড হেলথ সোসাইটি (রেশ) নামক একটি এনজিও'র দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে।
২০১৪ সালের ৯ ডিসেম্বর নগরীর হাউজিং এস্টেটে একটি বাসা ভাড়া নিয়ে ‘রেশ’ এর স্বাস্থ্য প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু হয়। প্রকল্পের নাম দেয়া হয় সূর্যের হাসি চিহ্নিত পারিবারিক স্বাস্থ্য ক্লিনিক এর অনুকরণে ‘দি চাঁদের হাসি চিহ্নিত পারিবারিক স্বাস্থ্য ক্লিনিক’। প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন পদে লোক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দিয়ে সাড়া ফেলে দেয় সিলেটে। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, যাদেরকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে তাদের অনেকের কাছ থেকে জামানতের কথা বলে বেশ টাকা পয়সা নেন রেশ নির্বাহী পরিচালক ও চেয়ারম্যান ডাঃ জুবায়ের আহমেদ। অবশ্য পরে কথা মত বেতন না দেয়ার অভিযোগে চাকুরি ছেড়ে গেছেন অনেকেই। এরপরও বসে থাকেননি জুবায়ের। মাত্র কয়েক মাসের মাথায় নতুন নতুন ধান্ধা বের করতে থাকেন। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে দেশের সবকটি ইউনিয়নে গ্রাম আদালত তৈরী করা হবে-এই ইস্যুকে প্রতারণার কৌশল হিসেবে গ্রহণ করেন তিনি।
সিলেট বিভাগের ১১১টি ইউনিয়নে এজলাস তৈরীর প্রকল্প তার সংস্থা ‘রেশ’ পেয়েছে এমন তথ্য প্রচার করতে থাকেন সবখানে। এর অংশ হিসেবে চাঁদের হাসি চিহ্নিত পারিবারিক স্বাস্থ্য ক্লিনিক এর পাশাপাশি লিগ্যাল এইড প্রকল্পের নামে গ্রাম আদালত কার্যক্রম শুরু করার ঘোষণা দেন তিনি। সরকারের এজলাস বানানোর প্রকল্পের খবর নেই, অথচ ‘রেশ’ এর নামে শুরু করা হয় লোক নিয়োগ প্রক্রিয়া। ‘রেশ’ এর নির্বাহী পরিচালক ও চেয়ারম্যান ডাঃ জুবায়ের আহমদ নিজেই জানান, লিগ্যাল এইড প্রকল্পের আওতায় গ্রাম আদালতে নিয়োগের লক্ষ্যে ৭৩ জনকে বাছাই করা হয়। এর মধ্যে ৩৭ জনের কাছ থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা করে জামানত বাবদ নেয়া হয়েছে।
এ থেকে সংগৃহীত অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ লাখ ২৯ হাজার ৫ শ টাকা। তবে জুবায়ের জানান, এর মধ্যে চূড়ান্ত বাছাই করে মাত্র ২১ জনকে রেখেছেন। বাকী আবেদনকারীদের জামানত ফিরিয়ে দেয়ার জন্য সংস্থার হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তাকে জানিয়েছেন। ডাঃ জুবায়ের আরো জানান, এক মাস পর সকলের টাকা ফিরিয়ে দেয়া হবে। এছাড়া নগরীর একটি অভিজাত হোটেলে প্রায় দুই শতাধিক চাকুরী প্রত্যাশীর একদিনের প্রশিক্ষণও দিয়েছিলেন বলেও তিনি জানান। এদিকে, গ্রাম আদালতে লোক নিয়োগ ও জামানত নেয়ার বিষয়ে খোঁজ নিতে গিয়ে বেরিয়ে এসেছে নানা তথ্য। জানা গেছে, ডাঃ জুবায়ের আহমদের বাড়ি কিশোরগঞ্জ জেলায়। বর্তমান সরকারে কিশোরগঞ্জের ‘বিশেষ প্রভাব’কে কাজে লাগিয়ে তিনি ধর্ণা দেন বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে।
গ্রাম আদালত নির্মাণ কাজ তিনি পেয়ে গেছেন এমন কথা বার্তাও বলেন পরিচিত জনদের কাছে। আবার ঠিকাদারদেরও কাজ পাইয়ে দিবেন বলেও বেশ টাকা পয়সা হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি। এ ব্যাপারে সিলেটের জেলা প্রশাসক মোঃ শহিদুল ইসলাম জানান, গ্রাম আদালত নির্মাণ করতে হলে স্থানীয় সরকার করবে। এর জন্য এনজিও বা ‘রেশ’ এর দরকার নেই। তিনি বলেন, কেউ অনিয়মের অভিযোগ আনলে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে।
আপনার মন্তব্য