২১ এপ্রিল, ২০১৫ ১৩:১৬
সুনামগঞ্জ জেলার অন্যতম বোরো ফসলের হাওর নলুয়ার হাওরে এখন সোনালী ধানের রঙিন। পুরো হাওর জুড়ে এখন শুধু সোনালী ধান আর ধান। কৃষক কৃষাণীরা ব্যস্ত ধান তোলা মাড়াই আর শুকানোর কাজে। হাওরপাড়ে এ যেন এক অন্যরকম কর্মচঞ্চল পরিবেশ।
নলুয়ার হাওর এলাকা ঘুরে দেখা গেছে,হাওরের অধিকাংশ ধান এখন সোনালী রঙ্গে রঙ্গিন। কৃষকরা ধান কাটতে ব্যস্ত। কৃষক-কৃষাণীর সাথে ধান তোলার আনন্দযজ্ঞে যোগ দিয়েছেন পরিবারের সকল সদস্য। শিশু কিশোর থেকে শুরু করে বয়স্করা সবাই মিলে একে অন্যকে সহযোগিতা করে ধান তুলছেন। হাওরপাড়েরর স্কুলগুলোর শিক্ষাথীরা এখন ধান তুলতে হাওরে কাজে নেমে পড়েছে। এসব শিক্ষার্থীদের কেউ বা বাবার জন্য ভাত নিয়ে হাওরে যাচ্ছে। কেউ আবার ধানের গাড়িতে উঠে ধান নিয়ে বাড়ি ফিরছে। উৎসব আনন্দে ধান তোলার কাজ চলছে।
কারণ একমাত্র বোরো ফসলের ওপর নিভর্রশীল্ হাওরপাড়ের কৃষকরা। ধান তুলতে পারলে সারা বছরের আহার জোগাড় করে সাচ্ছ্যন্দে চলাফেরা করতে পারেন। আর ধান না উঠলে তাদের দুঃখ কষ্টের সীমা থাকে না। এখন পর্যন্ত দিনের অবস্থা ভালো থাকায় কৃষকরা মনের আনন্দে ধান তোলার কাজ করছেন।
হাওরের জমিগুলোতে লাগানো সবুজ চারায় সোনালী ধানের শীষ বাতাসে দোল খাচ্ছে। আর কৃষক পরিবারের খুশির দোলা লেগেছে। মনের সুখে তারা ঘরে তুলছেন কষ্টার্জিত সোনালী ফসল। এ চিত্র শুধু নলুয়ার হাওরে নয় উপজেলার মইয়ার হাওর,পিংলার হাওর, দৌলা হাওর,মমিনপুরের হাওর,জামাইকাটা হাওর, সহউপজেলার সবকটি হাওরে।
তবে হাওরগুলো এখন আর সনাতনী পদ্বতিতে ধান মাড়াইয়ের চিত্র দেখা যায়নি। গরুর গাড়ি বদলে মেশিন দিয়েই কৃষকরা ধান মাড়াই দিচ্ছেন। এছাড়াও হাওর অঞ্চলে ছোঁয়া লেগেছে প্রযুক্তির কমবাইন্ড হারভেস্টার মেশিনের সাহায্যে অনেক কৃষক এবার এক সাথে ধান কাটা মাড়াই ও বস্তাজাত করতে দেখা গেছে।
কৃষকরা জানান, ধান কাটার মৌসুমে কৃষি বিভাগ যদি কমবাইন হারভেস্টার মেশিনের সুব্যবস্থা করে দিতে পারলে কৃষকরা সহজে ধান তুলতে পারতেন। নলুয়ার হাওরে কমবাইন্ড হারভেস্টার মেশিন দিয়ে ধান কেটেছেন তেমনি একজন কৃষক সুহেল মিয়া বলেন, এ মেশিন দিয়ে ধান কাটলে সময় খরচ ও পরিশ্রম কম হয়। তাই কৃষকদের সুবিধার্থে এ মেশিন হলে ভাল হতো।
কৃষকরা জানান, কৃষি শ্রমিক সংকটের কারণে এবার কৃষকরা পাকা ধান সময়মতো তুলতে পারছেন না। নলুয়ার হাওরের কৃষক চিলাউড়া গ্রামের আব্দুল গফুর জানান,এবার চার হাল জমিতে বোরো আবাদ করেছেন। ইতোমধ্যে সব ধান পাকা হয়ে গেছে। শ্রমিক সংকটের কারণে কাটতে পারছি না। মাত্র এক হাল জমির ধান কেটেছেন।
আরেক কৃষক সুলেমান মিয়া বলেন, প্রতি বছর উত্তরবঙ্গ থেকে ৩০জন শ্রমিক ধান কাটতে আসে। এবার যোগাযোগ করার পরও তারা না আসায় বিপদে পড়েছি। স্থানীয় লোকদের দিয়ে একটু একটু করে ধান কাটছি। তিনি বলেন, দিনের অবস্থা কখন কি হয় এ নিয়ে চিন্তায় আছি।
যুক্তরাজ্য প্রবাসী চিলাউড়া গ্রামের লীল রশীদ বলেন, আমরা প্রবাসী হলেও কৃষিই আমাদের প্রধান অবলম্বন। বাপ-দাদার বুনিয়াদী ধারা ধরে রেখেছি। তিনি জানান, নলুয়ার হাওরে তাদের ২০ হাল (১২ কেদারে এক হাল) বোরো জমি রয়েছে। প্রতি বছর দেশে এসে শ্রমিক দিয়ে জমি চাষ করি। আবার ধান তোলার সময় দেশে আসি। এবারও ধান তুলতে এসেছি। ধান গোলায় তুলতে পারলেই কৃষক খুশি এ কথা জানিয়ে বাউধর গ্রামের কৃষক ফারুক মিয়া বলেন, একমাত্র বোরো ফসলের ওপর আমার ১৩ সদস্যের পরিবারের রিজিক। এবার ৩০ কেদার বোরো চাষাবাদ করেছি। বৈশাখী তোলার পর বছরের খোরাক (খাদ্য) রাখার পর ছেলে মেয়ের বিয়ে সাদি দেব বলে ঠিক করেছি।
জগন্নাথপুর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান মুক্তাদীর আহমদ মুক্তা বলেন, হাওরপাড়ে এখন অন্যরকম কর্মচঞ্চল পরিবেশ বিরাজ করছে। ধান তোলার পর শুরু হবে আরেক রকম পরিবেশ। ধান গোলায় উঠলে আতœীয়-স্বজনদের নাইয়র আনা নেয়ার পাশাপাশি নতুন ধানের চালের পিঠা খাওয়ার ধুম পড়বে ঘরে ঘরে। বর্ষা চলে আসলে হাওরপাড়ে গ্রামে গ্রামে চলবে কিচ্ছার কিংবা বাউল গানের আসর।
জগন্নাথপুর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, চলতি মৌসুমে জগন্নাথপুর উপজেলার ২০ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে বোরো চাষাবাদ করা হয়। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ১ লাখ ২০ হাজার মেট্রিকটন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান বলেন, জগন্নাথপুরের নলুয়ার হাওরসহ সবগুলো হাওরে ধানের এবার বাম্পার ফলন হয়েছে। প্রাকৃতিক বিপর্যয় জগন্নাথপুরে তেমন ক্ষতি হয়নি। আমরা যে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিলাম। বাম্পার ফলন হওয়ায় উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করছি। ইতিমধ্যে হাওরে ৩০ ভাগ ধান কাটা হয়ে গেছে বলে তিনি দাবি করেন।
আপনার মন্তব্য