নিজস্ব প্রতিবেদক

২৭ জুন, ২০১৫ ১৩:৫৯

বটবৃক্ষের বিদায়

আমরা অত্যন্ত দুঃখের সাথে জানাচ্ছি, সিলেটের সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব হেমচন্দ্র ভট্টাচার্য আর নেই। সিলেটের সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের বটবৃক্ষতুল্য এই ব্যক্তিত্ব, সিলেটের সংস্কৃতিকর্মীদের কাছে যিনি বাবুলদা নামেই পরিচিত, আজ সকাল সাড়ে ১১ টায় নগরীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। । মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিলো ৭৫ বছর।

হেমচন্দ্র দীর্ঘদিন ধরে নিউমোনিয়া, যকৃতের সমস্যাসহ নানাবিধ জটিল রোগে ভোগছিলেন। প্রায় ১৫ দিন হাসপাতালের নিবিড় পর্যবক্ষণ কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় আজ সকালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়ে রেখে গেছেন।

সিলেটের সংস্কৃতিকর্মীদের অভিভাবক হেমচন্দ্র ভট্টাচার্যের মৃত্যুতে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। মৃত্যুর খবর শোনে অনেকেই ছুটে গেছেন হাসপাতালে। সর্বস্তরের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য বিকেল ৪ টায় হেমচন্দ্র ভট্টাচার্যের মরদেহ সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আনা হবে বলে জানিয়েছেন সিলেট সম্মিলিত নাট্য পরিষদের সাধাারণ সম্পাদক রজতকান্তি গুপ্ত। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত এই সংগঠনটির প্রধান পরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন হেমচন্দ্র।

রজত জানান, শহীদ মিনারে আনার আগে মরদেহ হাসপাতাল থেকে নিয়ে যাওয়া হবে উপশহরস্থ নিজ বাসায়।

হেমচন্দ্র ভট্টাচার্যের জন্ম ১৯৪০ সালের ১৮ অক্টোবর নগরীর কাষ্টঘরে। স্কুলজীবন থেকেই তিনি সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত হন। ৪র্থ শ্রেণী থেকে ৭ম শ্রেণী পর্যন্ত তিনি শিলঙে পড়াশোনা করেন। সেই সময় সমগ্র আসাম আবৃত্তি প্রতিযোগীতায় অংশগ্রহণ করে তাঁর সাংস্কৃতিক প্রতিযোগীতার শুরু। ১৯৫৮ সালে ‌'শ্রী মধূসূদন' নাটকে অভিনয়ের মাধ্যমে তাঁর মঞ্চে পদার্পন।

১৯৬১ সালে সিলেটে আয়োজিত রবীন্দ্র জন্মবার্ষিকীতে আবৃত্তি প্রতিযোগীতায় প্রথম স্থান অর্জন করেন হেমচন্দ্র। এমসি কলেজে এইচএসসি পড়াকালীন সময়ে অভিনয় করেন বিধায়ক ভট্টাচার্য রচিত 'বিশ বছর আগে' নাটকে। মদন মোহন কলেজে বি.কম ভর্তি হলে সেখানেও জড়িয়ে পড়েন সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে। অভিনয় করেন 'ভাড়াটে চাই' ও 'কেদারদা' নাটকে।

কেবল আবৃত্তি শিল্পী বা মঞ্চ অভিনেতা হিসেবেই নয় সাংস্কৃতিক সংগঠক হিসেবেও হেমচন্দ্র ভট্টাচার্য অগ্রগণ্য। ১৯৬৩ সালে হেমচন্দ্র ভট্টাচার্যসহ কিছু নাট্যানুরাগী তরুণ মিলে গঠন করেন 'বৈশাখি নাট্যগোষ্ঠি'। যা সিলেটের নাট্যচর্চায় নতুন মাত্রা যোগ করে। এই গ্রুপ থেকে হেমচন্দ্রের নির্দেশনায় একে একে মঞ্চস্থ হয়- বিসর্জন, এখন দুঃসময়, স্পার্টাকাস বিষয়ক জটিলতা, সুবচন নির্বাসনে, রজনীগন্ধা, পলাতক পলিয়ে গেছে, জীবন্ত স্ট্যাচু, ভোলা ময়নার বায়োস্কোপসহ আরো অনক নাটক।

১৯৬৩ সালে যোগ দেন সিলেট বেতারে। সেখানেও দক্ষতার পরিচয় রাখেন। সিলেট বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত প্রথম নাটকেই অভিনয় করেন তিনি। বেতারে হেমচন্দ্র ভট্টাচার্যের নির্দেশিত ও অভিনিত নাটকের মধ্যে অন্যতম- একুশের নাম বাংলাদেশ, জীবন মানেই তৃষ্ণা, ডাকঘর, পোস্টমাস্টার।

১৯৭১ সালে দেশজুড়ে যখন চলছে মুক্তিসংগ্রাম হেমচন্দ্রও তখন এই সংগ্রামে জড়িয়ে পড়েন। '৭১-এ সৃষ্ট 'কলম তুলি কণ্ঠ সংগ্রাম পরিষদ'-এর সক্রিয় সদস্য ছিলেন হেমচন্দ্র। একাত্তরের ২২ মার্চ সিলেট রেজিস্ট্রারি মাঠে কবি দিলওয়ার রচিত 'দূর্জয় বাংলা' শীর্ষক গীতি আলেখ্যর অন্যতম আয়োজক ছিলেন তিনি। এই আলেখ্যতে ধারাভাষ্যও দেন হেমচন্দ্র। এছাড়া মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্যার্থে সেসময় বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনু্ষ্ঠানের আয়োজন ও পারফরম করেন তিনি।


হেমচন্দ্র ভট্টাচার্য সিলেট শিশু একাডেমী ও শিল্পকলা একাডেমীর আবৃত্তি প্রশিক্ষক হিসেবে যুক্ত ছিলেন। সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার বাস্তবায়ন পরিষদেরও সদস্য ছিলেন তিনি।

জীবনভর সাংস্কৃতিক চর্চা ও প্রসারের জন্য সিলেট ও ঢাকায় অসংখ্য সম্মাননাও পেয়েছন হেমচন্দ্র ভট্টাচার্য। তবে সবচেয়ে বেশী পেয়েছন সিলেটের সংস্কৃতিকর্মীদের ভালোবাসা। শ্রদ্ধা। সেই শ্রদ্ধা আর ভালোাসাটুকু নিয়েই আজ না ফেরার দেশে চলে গেলেন হেমচন্দ্র ভট্টাচার্য।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত