সিলেটটুডে ডেস্ক

২৭ জুন, ২০১৫ ২০:৪৩

মেধাবী জাতি বিনির্মানে পুষ্টি সচেতনতা অপরিহার্য : সিলেটে গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা

কারো হাতে সাদা ককসিট, কারো হাতে মোটা লেখার কাগজ। তারা প্রত্যেকে খুবই ব্যস্ত। তাদের এ ব্যস্ততা নিজেদের লেখা দেওয়ালিকা নিয়ে। কিভাবে টানাবে দেওয়ালিকা। সিলেটের ৮ টি বিদ্যালয়ের শতাধিক শিক্ষার্থী নিজ হাতে দেওয়ালিকা নিয়ে হাজির হয় সিলেট নগরীর দি এইডেড হাই স্কুল অডিটোরিয়ামে।

এক পর্যায়ে দেওয়ালিকা টানিয়ে শেষ হয় তাদের ব্যস্ততা। পাশাপাশি পুষ্টি নিয়ে দিনব্যাপী চলে গোলটেবিল বৈঠক। গোল টেবিল বৈঠকে বক্তারা বলেন মেধাবী জাতি বিনির্মানে পুষ্টি সচেতনতা অপরিহার্য।

শনিবার সমকাল ও সিএসএ ফর সান এ উৎসবের আয়োজন করে। এছাড়াও অনুষ্ঠান শেষে শিক্ষার্থীদের ফলের চাহিদা পূরণের অনুষঙ্গ হিসাবে প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে একটি করে ফলজ বৃক্ষের চারা উপহার দেওয়া হয়।

গ্লোবাল ডে অব অ্যাকশন উদযাপন উপলক্ষে আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে পুষ্টি বিষয়ের ওপর তথ্যচিত্র উপস্থাপন করেন সিএসএ ফর সান’র জাতীয় সমন্বয়ক ডা. সাহিদা আক্তার। পুষ্টি নিয়ে সমকালের এ আয়োজন বর্ণনা করে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন সমকাল সুহৃদ সমাবেশের বিভাগীয় সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম আবেদ।

পরে দৈনিক সমকাল সিলেটের ব্যুরো প্রধান চয়ন চৌধুরীর সঞ্চালনায় গোলটেবিল বৈঠকে বক্তব্য রাখেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. আমিনুল হক ভূইয়া, মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির ভিসি প্রফেসর ড. সালেহ উদ্দিন, সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এনামুল হাবীব, সিএসএ ফর সান’র জাতীয় সমন্বয়ক ডা. শাহিদা আক্তার, সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. সুধাময় সিংহ মজুমদার, নর্থ ইস্ট মেডিকেল কলেজের পুষ্টি বিশেষজ্ঞ শাহনাজ বেগম, সিলেট জেলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সংগ্রাম সিংহ, বাংলাদেশ আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদের সভাপতি মণ্ডলীর সদস্য মোকাদ্দেস বাবুল, সমকাল সুহৃদ সমাবেশের বিভাগীয় সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম আবেদ, সমকালের টেকলাইনের বিভাগীয় সম্পাদক হাসান জাকির, সিলেট জজ কোর্টের আইনজীবি হোসাইন আহমদ শিপন, স্কলার্সহোম পাঠানটুলা শাখার প্রভাষক কণিকা ঘোষ, দি এইডেড হাই স্কুলের সিনিয়র শিক্ষক ফয়সল আহমদ, ব্রাকের পুষ্টি প্রকল্পের জেলা কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান, শাবি’র খাদ্য প্রকৌশল ও চা প্রযুক্তি বিভাগের শিক্ষার্থী সানজিদা ইসলাম তৃপ্তি এবং একই বিভাগের শিক্ষার্থী শোয়েব সাত-ঈল ইভান, রিলায়েন্ট উইমেন ডেভলাপমেন্ট অর্গানাইজেশনের নির্বাহী পরিচালক সমিতা বেগম মীরা, সীমান্তিকের কমিউনিটি বেসড মিডওয়াইফ ডিপ্লোমা প্রোগ্রামের সমন্বয়ক ডা. মো. রুহুল আমিন শিকদার এবং সমকাল সহৃদ সমাবেশের সিলেট জেলার আহ্বায়ক রাজকুমার দাস।

গোলটেবিল বৈঠক চলাকালে সিলেটের প্রবীণ নাট্য ব্যক্তিত্ব ও নাট্য পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক হেমচন্দ্র ভট্টাচার্য বাবুল স্মরণে এক মিনিট নিরবতা পালন করা হয়। তিনি শনিবার সকালে মৃত্যুবরণ করেন।

শাবি ভিসি প্রফেসর ড. আমিনুল হক ভূইয়া বলেন, আজকের শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করতে না পারলে ডিজিটাল এবং সফল বাংলাদেশের স্বপ্ন পূরণ হবে না। পুষ্টির অভাবে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী, হাবা-গোবা শিশু এবং বামন শিশুদের সংখ্যা বাড়ছে। পুষ্টি সচেতনতার প্রতি গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, সচেতনতা যত বৃদ্ধি পাবে, পুষ্টিহীনতা তত হ্রাস পাবে।

শাবি’র সাবেক ভিসি এবং বর্তমানে মেট্রোপলিটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. মো. সালেহ উদ্দিন বলেন, আমাদের দেশে আগের তুলনায় অনেক বেশি খাদ্য উৎপাদন হচ্ছে। কিন্তু বর্ধিত এ খাদ্য উৎপাদন পুষ্টিহীনতা রোধে কোন সমাধান দেয়নি। আজ পর্যন্তও আমরা কোন পুষ্টিনীতি পাইনি। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে পুষ্টি সম্পর্কিত জ্ঞান বিতরণ করলে পুষ্টিহীনতা হ্রাস পাবে বলে তিনি মনে করেন।

সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এনামুল হাবিব বলেন, পুষ্টি সচেতনতা বিষয়ক আজকের গোলটেবিল আলোচনা থেকে পাওয়া পরামর্শগুলোকে বাস্তবে রূপ দেওয়া উচিত। এক্ষেত্রে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও সংস্থাকে অন্তর্ভূক্ত করা যেতে পারে। পুষ্টি বিষয়ে কেউ কাজ করলে সিটি কর্পোরেশন তাদের সহায়তা করবে।

সিএসএ ফর সান’র জাতীয় সমন্বয়ক ডা. শাহিদা আক্তার বলেন, পুষ্টি
সমস্যা সমাধানের উদ্যোগে উৎসাহিত করতে সান কাজ করে যাচ্ছে। সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. সুধাময় সিংহ মজুমদার বলেন, পুষ্টি সমস্যা সমাধানে একটি পরিবারের পিতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

সমকাল সুহৃদ সমাবেশের বিভাগীয় সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম আবেদ বলেন, আমরা আমাদের নিজেদের দ্বায়িত্ব পালন করলে পুষ্টিহীনতার সমস্যা থেকে উত্তরন করা সম্ভব। পুষ্টিবিদ, আইনজীবি, সাংবাদিক, শিক্ষক সহ সকল শ্রেনীপেশার মানুষ নিজ নিজ জায়গা থেকে কাজ করলে, বাংলাদেশের পুষ্টি চিত্র বদলে দেওয়া সম্ভব। সমকালের টেকলাইনের বিভাগীয় সম্পাদক হাসান জাকির বলেন, বিভিন্ন খাদ্যে পুষ্টির পরিমান ও কম খরচে সুষম খাদ্যের তালিকার মোবাইল এপ্লিকেশন তৈরী করতে পারলে পুষ্টিহীনতা কমবে।

নর্থ ইস্ট মেডিকেল কলেজের পুষ্টি বিশেষজ্ঞ শাহনাজ বেগম বলেন, হাসপাতালের রোগীদের পুষ্টি বিষয়ক শিক্ষা দিলে তা উপকারে আসবে। সিলেট জেলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সংগ্রাম সিংহ বলেন, মোবাইল ফোন কলের ক্ষেত্রে পুষ্টি বিষয়ক বিভিন্ন তথ্য কলার টিউন হিসাবে ব্যবহার করলে, সচেতনতা বাড়বে। বাংলাদেশ আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদের সভাপতি মণ্ডলীর সদস্য মোকাদ্দেস বাবুল পুষ্টিহীনতা রোধে খেজুর ও ডালিম খাবার পরামর্শ দেন।

সমকালের সিলেট ব্যুরো প্রধান চয়ন চৌধুরী বলেন, সচেতনতার অভাব দেশে পুষ্টিহীনতার প্রধান কারণ। সিলেটের উদাহরণ টানলে দেখা যায় যে, অর্থনৈতিক সূচকে এগিয়ে থাকলেও মা ও শিশু স্বাস্থ্য পুষ্টি সূচকে পিছিয়ে আছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

সিলেট জজ কোর্টের আইনজীবি হোসাইন আহমদ শিপন বলেন, খাদ্য নিরাপত্তা আইনগুলো আরো কঠিন হতে হবে। ব্রাকের পুষ্টি প্রকল্পের জেলা কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান বলেন, অনেক শিক্ষিত মানুষেরা কুসংস্কারাচ্ছন্ন হওয়াতে পুষ্টি নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে। শাবি’র খাদ্য
প্রকৌশল ও চা প্রযুক্তি বিভাগের শিক্ষার্থী সানজিদা ইসলাম তৃপ্তি বলেন, শিশুর অপুষ্টি রোধ করতে হলে মায়ের পুষ্টি চাহিদার দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।

একই বিভাগের শিক্ষার্থী শোয়েব সাত-ঈল ইভান বলেন, পুষ্টিহীনতা রোধে বিভিন্ন ভিটামিন সমৃদ্ধ ‘ফোর্টিফাইড’ খাবার তৈরী করে বিতরণ করা যেতে পারে। গোলটেবিল বৈঠকের শেষে সমকাল সহৃদ সমাবেশের সিলেট জেলার আহ্বায়ক রাজকুমার দাস অতিথি এবং অংশগ্রহনকারী শিক্ষার্থীদের ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।

সিলেটে দেয়ালিকা প্রতিযোগিতায় সবার সেরা বাংলাদেশ ব্যাংক স্কুল
দেয়ালিকা প্রতিযোগিতায় অন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে টপকে প্রথম হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক স্কুল। তাদের তৈরি করা দেয়ালিকা ‘পুষ্টি কনিকা’কে বিচারকরা সবার সেরা বলে রায় দেন। দ্বিতীয় ও তৃতীয় হয়েছে যথাক্রমে সিলেট সরকারী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় ও স্কলার্সহোম পাঠানটুলা শাখা। এর মধ্যে পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় ‘হাওয়াই মিঠাই’ ও স্কলার্সহোম ‘পুষ্টি নিয়ে যত কথা’ শিরোনামের দেয়ালিকা তৈরি করে। প্রতিযোগিতায় এছাড়াও বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ, সরকারী অগ্রগামী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় এন্ড কলেজ, কিশোরী মোহন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, ব্ল-বার্ড স্কুল এন্ড কলেজ ও রসময় মেমোরিয়াল উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দেয়ালিকা প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়।

দিনভর নানা আয়োজন
গোলটেবিল বৈঠক ও দেয়ালিকা প্রতিযোগিতা ছাড়াও দিনভর নানা আয়োজনের মধ্যে ছিল বিভিন্ন জাতের পুষ্টি সমৃদ্ধ ফলমূল ও শাক-সবজির প্রদর্শনী। কাঠাল, আম, জাম, কলা, আনারস, পেয়ারা, তরমুজ, লুকলুকি, লটকন, জামরুল, আমলকি, তেতুলের পাশাপাশি প্রদর্শনী স্টলে সাজানো ছিল লাল শাক, পুঁইশাক, কলমী শাক, করলা, বরবটি, টমেটো, মিষ্টি কুমড়া, ঢেঁড়স, গাজর, শশা, লেবুসহ নানা জাতের শাক-সবজি। প্রদর্শনীতে এই সকল ফলমূল ও শাক-সবজির পুষ্টিগুণও উল্লেখ করা ছিল। অতিথিদের পাশাপাশি প্রচারাভিযানে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা পুষ্টি গুণ সমৃদ্ধ খাবার সম্পর্কে ধারণা পায়। সকালে জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে দিনের কর্মসূচি শুরুর পর অতিথি ও শিক্ষার্থীরা ‘শিশু-পুষ্টি নিশ্চিত করি, সুন্দর আগামী গড়ি’ স্লোগানে স্বাক্ষর অভিযানে অংশ নেয়।

দিনভর আয়োজনে সার্বিক সহযোগিতায় ছিলেন সমকালের সিলেট ব্যুরো স্টাফ রিপোর্টার মুকিত রহমানী, ফয়সল আহমদ বাবলু, ফটো সাংবাদিক ইউসুফ আলী, শাবি প্রতিনিধি তন্ময় মোদক, সুহৃদ সমাবেশ সিলেটের আহবায়ক রাজ কুমার দাস তনু, যুগ্ম আহবায়ক ইমরান আহমদ, সদস্য সচিব সুব্রত বসু, উজ্জ্বল ভট্টাচার্য, সুজিত দাস, মালেক সৈকত, সুইটি রায়, আবদুল আলীম, সুবোধ কর, মো. তৌকির হোসেন, প্রাঙ্গন দত্ত পুলক, শাওন দেব, প্রিতম দে, অজিত দেব, দিলীপ দাস, মো. হারুন মিয়া, মিসবাহ উদ্দিন তুহিন, জয় বিশ্বাস, রাজু তালুকদার, নিলয় দাস, সৌমেন চক্রবর্তী দ্বীপ ও ছোট্ট সুহৃদ শ্রেয়া দাস।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত