মৌলভীবাজার প্রতিনিধি

২৫ জুন, ২০১৮ ১৬:২৮

বন্যা প্রতিরোধে মনু নদ ও ধলাই নদী খননের দাবি

সিলেট বিভাগের অন্যান্য নদীর মত উজানের থেকে আসা স্রোতের সাথে পলি জমে ভরাট হয়ে গেছে নদীর মনু নদ ও ধলাই নদীর তলদেশ। হারিয়েছে নাব্যতা, নদীর গভীরতা কমে যাওয়ায় কমেছে পানি প্রবাহ। আর এই পানি প্রবাহ কমে যাওয়ায় দ্রুত জমছে পলি। বিশেষজ্ঞদের মত পানির প্রবাহ যত কমবে পলির জমার সম্ভাবনা তত বাড়বে।

আর এভাবেই ভরাট হয়ে গেছে মৌলভীবাজার মনু নদ ও ধলাই নদী। এক সময় যে নদীতে জাহাজ চলত সেই মনু নদ এখন শুষ্ক মৌসুমে খেলার মাঠে পরিণত হয়। মনু নদ এবং ধলাই নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ঠিক রাখতে তাই দাবি উঠেছে নদী খননের।

প্রতি বছর মনু ও ধলাই নদীর ভাঙনে বন্যার মোকাবেলা করতে হয় মৌলভীবাজার জেলাবাসীকে। গত সপ্তাহে বন্যায় আঘাত আসে পৌর শহরেও। আর এতেই সব মহল থেকে দাবি উঠে নদী খননের এবং নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে দেওয়া। খনন করে মাটি বাঁধের বাইরে ফেলে স্থায়ী বাঁধ মেরামতের জোরালো দাবি উঠেছে সর্বত্র। দেশ-বিদেশে অবস্থানরত জেলাবাসী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় খননের দাবিতে।

মৌলভীবাজারে হাওর ও নদী রক্ষা আঞ্চলিক কমিটির সভাপতি মো. দুরুদ আলীর সভাপতিত্বে সোমবার (২৪ জুন) কমলগঞ্জে এক জরুরী সভায় মনু নদ ও ধলাই নদী খননের জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানানো হয়।

তারা জানান, কখনো খনন না হওয়ায় উজানে একটানা ৩/৪ দিন বৃষ্টি হলে মনু নদ ও ধলাই নদীর পানি উপচে প্লাবিত হয় বিস্তৃত এলাকা। কারণ পলি পরে নদীর ৬০ শতাংশ ভরাট হয়ে পানি ধারণ ক্ষমতা কমে গেছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, পাহাড়ি ঢলে প্রচুর পলি মনু নদ ও ধলাই নদীতে আসে এতে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে ৬০ শতাংশ পানি ধারণ ক্ষমতা কমে গেছে। শীত মৌসুমে কোথাও হাঁটু পানি কোথাও একেবারে শুকনো। ফুটবল ক্রিকেট খেলায় মাঠ হয়ে যায় শীত মৌসুমে। এত বছরেও খনন না করা এবং পানি প্রবাহ কমে যাওয়ায় মনু হারিয়েছে পানি ধারণের ক্ষমতা। মূলত বন্যায় শহর প্লাবিত হওয়ার পরেই জোরালো হচ্ছে নদী খননের দাবি।

পানি ও নদী বিশেষজ্ঞরাও মত দিয়েছেন সুষ্ঠু মাস্টার প্লানের মাধ্যমে খননের।

পানি ও নদী বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত জানান, চরম অবহেলায় আছে প্রতিটি নদ-নদী। মনু নদ ও ধলাই নদীতে উজান থেকে পানি নামে। উঁচু এলাকা এবং পাহাড় থেকে অবাধে গাছ কেটে আমরাই আমাদের বিপদ ঢেকে এনেছি। গাছপালা কাটার কারণে যখন বৃষ্টি হয় তখন পানির সাথে প্রচুর পলি আসে যা নদী ভরাটের কারণ।

তিনি আরও বলেন, ১৯৮৪ সাল থেকে বাংলাদেশ ভারত যৌথ নদী ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা শুরু হলেও ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে উভয় দেশ নদী রক্ষায় যৌথ সিদ্ধান্তে গেছেন। সেই মোতাবেক সীমান্ত নদীতে উভয় দেশকে একসাথে খনন করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, নদ-নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণে স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করতে হবে এবং কোনভাবেই মার্চ থেকে সেপ্টেম্বরে বাঁধের কাজ করা যাবে না।

বাঁধ নির্মাণ করে তা রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে এবং যেহেতু নদীতে পলি এসে ভরাট হয় গভীরতা কমে গেছে তাই প্রতিরক্ষা বাঁধ আরও উঁচু করতে হবে।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ নদী রক্ষা আন্দোলনের নেতা ও পরিবেশ আন্দোলন সিলেট বিভাগীয় সাধারণ সম্পাদক আব্দুল করিম কিম বলেন, ব্রিটিশরা চলে যাওয়ার পর অবহেলায় আছে নদ নদী, নেই ড্রেজিং, না কোন মাস্টার প্লান। দিনে দিনে মানুষের অত্যাচারে নদীর স্বাভাবিক চলাচলকে ব্যাহত করা হয়েছে। তাই সময়ে সময়ে নদী বিদ্রোহ করছে।

তিনি আরও বলেন, এ থেকে মুক্তি পেতে, প্রথমে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করে হবে। বৈজ্ঞানিক ফর্মুলায় বালু তুলতে হবে। নদী খনন করতে হবে এবং সে মাটি প্রতিরক্ষা বাঁধের বাইরে ফেলে বাঁধ আরও উঁচু এবং প্রশস্ত করতে হবে। বাঁধে মাটি ধরে রাখার জন্য প্রচুর বনায়ন করতে হবে। বাঁধ বানানোর পর তা রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে।

সমাজকর্মী ও সাংবাদিক হাসানাত কামাল জানান, ত্রাণ নিয়ে জেলার এক পাশ থেকে অন্য পাশে দৌড়াচ্ছি, খুব কাছ থেকে দেখছি মানুষের দুর্ভোগ। বছর বছর বন্যায় প্লাবিত হয়ে যে ক্ষতি হয় তার থেকে মুক্তি পাবার জন্য খুব দ্রুত নদী খনন করতে হবে।

সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ভিপি মিজানুর রহমান মিজান বলেন, একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে আমি সরকারের কাছে জোর দাবি জানাই মনু নদ ও ধলাই নদী খননের। বছর বছর বন্যা থেকে মুক্তি পেতে খননের বিকল্প নেই।

জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রনেন্দ্র শংকর চক্রবর্তী জানিয়েছেন, এলাকাবাসীর দাবির প্রতি সমর্থন রেখে বাস্তবসম্মত প্রস্তাব খুব দ্রুত মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।

নদী খননের দাবির বিষয়ে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, প্রতি বছর কোটি কোটি কাজ হচ্ছে নদী রক্ষার্থে। মনু ও ধলাই নদীর সামগ্রিক বিষয়ে খোঁজ নিয়ে স্থায়ী সমাধানের জন্য এলাকাবাসীর দাবির বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখবো।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত