নিজস্ব প্রতিবেদক

০৬ মার্চ, ২০১৯ ০০:৩৮

স্মৃতিস্তম্ভ আড়াল করে বৈদ্যুতিক খুঁটি

সড়কের পাশে দেয়ালের গায়ে একটি স্মৃতিস্তম্ভ। স্মৃতিস্তম্ভের উপর লেখা- ‘জ্ঞানের জ্যোতি ছড়াবে অনন্ত, অনন্তকাল’। সড়ক দিয়ে যাওয়া-আসার পথে যে কারোরই চোখ যেতো এই স্মৃতিস্তম্ভের দিকে। কিন্তু এখন আর সে সুযোগ নেই। জ্ঞানের জ্যোতি ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানানো এই স্মৃতিস্তম্ভটি ঢেকে ফেলা হয়েছে বিদ্যুতের খুঁটি দিয়ে।

নগরীর সুবিদবাজারে এই স্মৃতিস্তম্ভের ঠিক সামনে নিজেদের একটি খুঁটি বসিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। ফলে ঢাকা পড়েছে স্মৃতিস্তম্ভটি।

বিজ্ঞান লেখক ও ব্লগার অনন্ত বিজয় দাশ স্মরণে ২০১৫ সালে এই স্মৃতিস্তম্ভটি নির্মাণ করেন স্থানীয় এলাকাবাসী ও অনন্ত’র সুহৃদদের নিয়ে গঠিত ‘অনন্ত বিজয় দাশ স্মৃতি রক্ষা পরিষদ’। তার আগের বছর ২০১৪ সালের ১২ মে লেখক ও গণজাগরণ মঞ্চের সংগঠক অনন্ত বিজয়কে কুপিয়ে হত্যা করে উগ্রবাদীরা। নিজের বাসার সামনে যে জায়গায় অনন্তকে হত্যা করা হয়েছিলো সে জায়গায়ই নির্মিত হয় এই স্মৃতিস্তম্ভ। প্রতিবছর অনন্ত হত্যার দিনটিতে এই স্মৃতিস্তম্ভে শ্রদ্ধার্ঘ অর্পণ করে বিভিন্ন সংগঠন।

স্মৃতিস্তম্ভ আড়াল করে বিদ্যুতের খুঁটি বসানোতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এর উদ্যোক্তারা। আর অনন্ত’র স্বজনদের অভিযোগ, ইচ্ছে করেই স্মৃতিস্তম্ভের ঠিক সামনে খুঁটিটি বসানো হয়েছে। যাতে ঢাকা পড়ে যায় মুক্তবুদ্ধি চর্চার জন্য প্রাণ দেওয়া এই লেখকের স্মৃতি।

এই স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন প্রক্রিয়ার সাথে সম্পৃক্ত, গণজাগরণ মঞ্চ, সিলেটের সংগঠন আব্দুল করিম কিম বলেন, ২০১৩ সালের পর সারাদেশে বেশকয়েকজন লেখক-প্রকাশক খুন হলেও তাদের স্মৃতি রক্ষার্থে তেমন কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। সিলেটে অনন্ত বিজয় খুন হওয়ার পর তাঁর স্মৃতি রক্ষার্থে আমরা অস্থায়ীভাবে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করি। আগামী প্রজন্ম যাতে বিজ্ঞান ও মুক্তবুদ্ধি চর্চার প্রেরণা পায় তাই এটি নির্মাণ করা হয়েছিলো। কিন্তু এই স্তম্ভের সামনেই বিদ্যুৎ বিভাগের খুঁটি স্থাপন কেবল অবিবেচনামূলকই নয়, এটি একটি অসভ্য কাজ হয়েছে। আমরা চাইবো তারা অচিরেই এটি সরিয়ে নিয়ে পাশেই যে খালি জায়গা আছে তার কোনো এক জায়গায় স্থাপন করবেন।

মঙ্গলবার (৫ মার্চ) সকালে সরজমিনে গিয়ে দেখা যায় নগরীর সুবিদবাজারের নূরানি আবাসিক এলাকার দস্তিদার দিঘির পাড়ে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভের ঠিক সামনে ও গাঁ ঘেঁষে স্থাপন করা হয়েছে একটি বৈদ্যুতিক খুঁটি। স্মৃতিস্তম্ভের কারণে সড়ক থেকে আর স্মৃতিস্তম্ভটি দেখা যাচ্ছে না।

অনন্ত’র পরিবারের অভিযোগ, কারো ইন্ধনে ইচ্ছাকৃতভাবেই স্মৃতিস্তম্ভের সামনে খুঁটি বসানো হয়েছে। অনন্ত বিজয় দাশের ভগ্নীপতি কর আইনজীবী সমর বিজয় শী শেখর বলেন, এটা পরিকল্পিত এবং ইচ্ছাকৃত। না হলে এতো জায়গা থাকতে কেনো স্মৃতিস্তম্ভের সামনেই খুঁটিটি বসাতে হবে?

এই স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপনের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন সিলেট সিটি করপোরেশনের ৫নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর রেজওয়ান আহমদ। তিনি বলেন, এ কাজটা যে বা যারাই করে থাকেন না কেনো খুব খারাপ একটা কাজ হয়েছে, এটা কোনভাবেই ঠিক নয়। দ্রুত এটি অপসারণ করা উচিত।

সুবিদবাজার সিটি করপোরেশনের ৭ ওয়ার্ডের আওতাধীন এলাকা। স্মৃতিস্তম্ভের সামনের বৈদ্যুতিক খুঁটিটি অপসারণে উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন ওই ওয়ার্ড কাউন্সিলর আফতাব আহমদ। তিনি সিলেটটুডে টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, কেউ সচেতনভাবে তো এটা করার কথা না। বেখেয়ালে হয়তো বসানো হয়ে গেছে। আমি কাউন্সিলর হিসেবে অবশ্যই এটা খেয়াল রাখবো যেন অনন্ত বিজয়ের স্মৃতি রক্ষা হয়। ওই খুঁটিটি অপসারণে আমি দ্রুত ব্যবস্থা নেবো।

আর বিদ্যুৎ বিতরণ বিভাগ সিলেটের প্রধান প্রকৌশলী সরদার আজম মোহাম্মদ বলেন, সিলেটে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার উন্নয়নে কয়েকটি প্রকল্পের কাজ চলছে। কোনো প্রকল্পের অধীনে এই খুঁটি স্থাপন করা হতে পারে। বিষয়টি আমি খোঁজ নিয়ে দেখবো।

উল্লেখ্য, ২০১৫ সালে ১২ মে সিলেট নগরীর সুবিদবাজারের নূরানি আবাসিক এলাকায় নিজ বাসার সামনে উগ্রবাদীদের চাপাতির কোপে খুন হন বিজ্ঞান লেখক ও ব্যাংকার অনন্ত বিজয় দাশ। বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখির পাশাপাশি তিনি যুক্তি নামে বিজ্ঞান বিষয়ক একটি পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। এছাড়া বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত