নিজস্ব প্রতিবেদক

১৭ মে, ২০১৯ ২৩:২৫

ঐতিহাসিক ভবন ভেঙ্গে হাসপাতাল নির্মাণের সিদ্ধান্ত অবিবেচনাপ্রসূত: সুলতানা কামাল

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) এর সহ-সভাপতি সুলতানা কামাল বলেছেন, ‘আজকে যারা ক্ষমতায় আছেন তাঁর যৌক্তিভাবে নিজেদের মুক্তিযোদ্ধের স্বপক্ষের দল বলে দাবি করেন। সেই দলের পক্ষ থেকে ঐতিহাসিক ভবন ভেঙে হাসপাতাল নির্মাণের মত অবিবেচক সিদ্ধান্ত মেনে নেয়া যায় না। আমরা কেউই হাসপাতাল তৈরির বিপক্ষে নই। আমরা হাসপাতাল বা সরকারের কারো বিরোধীতা করতে আসিনি। আমরা চাই ঐতিহ্য রক্ষা করে উপযুক্ত স্থানে হাসপাতাল নির্মাণ করা হোক। আবু সিনা ছাত্রবাস ভবণ রক্ষার লড়াইটি নিজেদের অস্তিত্ব টিকানোর লড়াই।’   

শুক্রবার বিকেল ৩টায় সিলেট কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদের সুলেমান হলে বাপার উদ্যোগে আয়োজিত 'সিলেটের বিপন্ন স্থাপত্য ঐতিহ্য ও আবু সিনা ছাত্রাবাস ভবন: নাগরিক উদ্বেগ' শীর্ষক সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন।

উক্ত সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা ছিল সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ। উনার মাধ্যমেই সরকারের কাছে এই ঐতিহ্যবাহী ভবণের গুরুত্ব ও হাসপাতালবান্ধব স্থানে নবনির্মিতি ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল স্থানান্তর করার বিষয়টি পৌঁছে দিতে চেয়েছিলেন সেমিনারের আয়োজকরা। বিষয়টি উল্লেখ করে সেমিনারে সভাপতির বক্তব্যে সুলতানা কামাল বলেন, ‘ঐতিহ্যবাহী আবু সিনা ছাত্রবাস ভবন রক্ষার্থে দীর্ঘদিন যাবত সিলেটের নাগরিক সমাজ আন্দোলন করছে। আমরা চেয়েছিলাম মন্ত্রী মহোদয়ের মাধ্যমে সরকার পর্যন্ত আমাদের যৌক্তিক দাবি উপস্থাপন করা। তবে অনিবার্যকারণবশত মন্ত্রী আসেননি। আমরা মনে করি সরকারের উচিত জনগণের কথা শোনা। জনগণের নির্বাচিত সরকার জনগণের কথা শুনতে ভয় পায় তখন বুঝতে হবে সরকার ও জনগণের সম্পর্কের অবস্থার অবনতি হয়েছে।’

বাপার কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক শরীফ জামিলের পরিচালনায় সেমিনারে আরো বক্তব্য দেন জালালাবাদ এসোসিয়েশনের সভাপতি এ কে আব্দুল মুবিন, বাংলাদেশ হেরিটেজ সোসাইটির সভাপতি সোহেল আহমদ চৌধুরী, বাংলাদেশ স্থপতি ইনিস্টিটিউট সিলেট শাখার সভাপতি স্থপতি সৈয়দা জেরিনা হোসেন, জাসদের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট জাকির আহমদ, সিলেট জেলা আইনজীবি সমিতির সাবেক সভাপতি এমাদ উল্লাহ শহীদুল ইসলাম,  ব্যারিষ্টার আরশ আলী, জালালাবাদ এসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি সিএম তোফায়েল সামি, সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মোর্শেদ আহমদ চৌধুরী প্রমুখ।

সেমিনারে স্বাগত বক্তব্য দেন বাপার সিলেটের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল করিম ক্বিম ও ধারণাপত্র পাঠ করেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কৌশিক সাহা।

বাংলাদেশ স্থপতি ইনিস্টিটিউট সিলেট শাখার সভাপতি স্থপতি সৈয়দা জেরিনা হোসেন বলেন, ‘পরিকল্পনাবিহনী কোনো উন্নয়নই উন্নয়ন নয়। এই জায়গায় হাসপাতাল নির্মাণের কোনো যৌক্তিকতা নেই। এই ভবণের আশপাশের পরিবেশ ও জনসমাগম হাসপাতাল নির্মাণের প্রধান বাঁধা। ঐতিহ্য নিয়ে সারা দুনিয়ায় ব্যবসা হচ্ছে। আমরাও পারি সিলেটের ঐতিহ্যকে কাজে লাগিয়ে ব্যবসায়িক পরিবেশগত উন্নয়ন সাধন করতে। এই জায়গাটাকে নাগরিক পরিসরে রূপ দিতে। যেখানে সিলেটের মানুষজন ও আগত পর্যটকরা সময় কাটাবেন।’

বাংলাদেশ হেরিটেজ সোসাইটির সভাপতি সোহেল আহমদ চৌধুরী বলেন, ‘সারা বাংলাদেশের মত সিলেটের ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাগুলো বিভিন্ন কারণে বিলীন হয়ে গেছে। এই ধরণের ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা সংরক্ষণ না করলে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম গালি দিবে। কারণ এতিহ্য শুধু দেখার বিষয় নয় শিক্ষার অংশ। তাই এই ঐতিহ্যকের সংরক্ষণ করতে বাপার ছয় দফা দাবিকে সমর্থন করি।’

জালালাবাদ এসোসিয়েশনের সভাপতি এ কে আব্দুল মুবিন বলেন, ‘আবু সিনা ছাত্রবাস একটি ঐতিহাসিক ভবন। এই ধরণের স্থাপনা নিয়ে গর্ব করা যায়। এটাই আমাদের ইতিহাস। হাসপাতালের প্রয়োজন রয়েছে। আমরা ঐতিহ্যের বিরুদ্ধে বা স্বাস্থ্যসেবার বিরুদ্ধেও নই। এই সরকার জনগণের সরকার। এই সরকারও ঐতিহ্যের বিরুদ্ধে নয়, স্বাস্থ্যসেবার বিরুদ্ধেও নয়। আমাদের সিলেটে পাঁচজন মন্ত্রী আছেন, তারা চাইলে ঐতিহ্য রক্ষা করে হাসপাতাল নির্মাণ করতে পারেন। এটা আন্দোলন নয় এটা আমাদের প্রাণের দাবি, যৌক্তিক দাবি। আমাদের পরিচিতি আমাদের ঐতিহ্যে।’

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) এর পক্ষ ছয় দফা দাবি জানানো হয়েছে। এতিহ্যবাহী ছাত্রাবাস ভবন ভাঙার কাজ বন্ধ করতে হবে ও ভবনটি সংস্কার-সংরক্ষণে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে, ঐতিহ্য সমীক্ষার মাধ্যমে সিলেটের সাংস্কৃতিক ও প্রাকৃতিক নিদর্শনগুলোর তালিকা তৈরি করে ডকুমেন্টেশন তৈরি করতে হবে তন্মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ প্রতœতাত্ত্বিক ও ঐতিহ্যসমূহ প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তরের তালিকভূক্তি করার ব্যবস্থা নিতে হবে, সিলেটে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের বিভাগীয় অফিস স্থাপন করে গুরুত্বপূর্ণ প্রতœতত্ত্ব ও স্থাপত্য ঐতিহ্যসমূহ পর্যায়ক্রমে সংরক্ষণের আওতায় নিয়ে আসতে হবে, সিলেট নগরের ঐতিহ্য সংরক্ষণে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা প্রণয়ন করে পরবর্তী সময়ে মহাপরিকল্পনার সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে, সিটি করপোরেশনের ঐতিহ্য সেল গঠনের মাধ্যমে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ও দেখাশোনার ব্যবস্থা করতে হবে এবং সিলেটের ঐতিহ্য রক্ষার কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন ও তদারকির জন্য বিভিন্ন পেশাজীবি, গবেষক, সাংস্কৃতি কর্মী ও পরিবেশকর্মী, জনপ্রতিনিধি, স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে উচ্চ পর্যায়ে নাগরিক কমিটি গঠন করতে হবে।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত