শাকিলা ববি

১৮ মে, ২০১৯ ১৭:০২

শাহজালাল (রহ.) মাজারে ধনী গরীব নির্বিশেষে ঐতিহ্যের ইফতার

সিলেটের হজরত শাহজালাল (রহ.) মাজারে মুসাফিরদের সেহেরি ও ইফতার করানোর ঐতিহ্য প্রায় ৭০০ বছর আগের। তাই অতিতের ন্যায় এবারও প্রথম রমজান থেকে শাহজালাল (রহ.) মাজারে মুসাফিরদের জন্য আয়োজন করা হয়েছে সেহেরি ও ইফতারের। সেহেরিতে খাওয়ানো হয় ভাত তরকারি অথবা খিচুড়ি। ইফতারে খাওয়ানো হয় খেজুর, জিলাপি, পিঁয়াজি, খিচুড়ি অথবা আখনি।

বিকেল হওয়ার সাথে সাথে মাজারে জড়ো হতে থাকেন বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষজন। নারী ও পুরুষদের জন্য নিদিষ্ট বসার স্থান রয়েছে মাজারে। মাজারের লঙ্গরখানার পাশেই মুসাফিরখানায় নিচতলায় নারী মুসাফিররা। দ্বিতীয় তলায় পুরুষ মুসাফিররা বসে ইফতার করেন। নারীদের সংখ্যা বেশি হলে দ্বিতীয় তলার একটি বসার ব্যবস্থা করা হয়। আজান দেওয়ার সাথে সাথে ধনী গরিব নির্বিশেষে সবাই একসাথে বসে ইফতার করেন।

মাজারের লঙ্গরখানায় ইফতারের রান্নার আয়োজন শুরু হয় দুপুর থেকে। শনিবার ( ১৮ মে) মাজারের লঙ্গরখানার ঘরে গিয়ে দেখা যায়, ৫টি চুলায় আগুন দেওয়া হয়েছে। কয়েকজন মহিলা সবজি কাটছেন ও শিলপাটায় মশলা বাটছেন। বাবুর্চি পঞ্চাশউর্ধ্ব ইদ্রিস মিয়া তার সহকারীদের বিভিন্ন দিক নির্দেশনা দিচ্ছেন। আলাপ হয় ইদ্রিস মিয়ার সাথে।

ইদ্রিস মিয়া জানান, প্রায় ৩৫ বছর যাবত শাহজালাল (রহ.) মাজারে রান্নার কাজ করছেন তিনি। মানিক মিয়া নামে আরেকজন প্রধান বাবুার্চিও আছেন। রমজান মাসজুড়ে মাজারের ইফতার ও সেহেরির আয়োজন দুজনই নের্তৃত্ব দেন। তাদের সহকারী আছেন প্রায় ১২ জন।  

ইদ্রিস মিয়া বলেন, ইফতারে থাকে ভুনা খিচুড়ি, ছোলা খেজুর জিলাপি পিঁয়াজু। প্রতিদিন একরকম খাবার দেওয়া হয় না। মাঝে মাঝে অনেক মানুষজন ফল, মাংস দিয়ে যান। তখন খাবার পরিবর্তন করা হয়। সেহেরিতে নিয়মিত খাবার ভাত, মাছ বা মাংস থাকে। মাঝে মাঝে খিচুড়িও দেওয়া হয়।  

ইদ্রিস মিয়ার সহকারী বাচ্চু মিয়া বলেন, প্রায় ১০ বছর যাব মাজারে রান্নার কাজ করছি। সারা বছর মানুষের জন্য মাজারে রান্না করি কিন্তু রমজান মাসে মুসাফিরদের জন্য রান্না করে অন্য রকম শান্তি পাই।
বাচ্চু মিয়া জানান, ইফতার সবার মধ্যে বন্টন করে দেওয়ার জন্য প্রায় ১০ জন সেচ্ছা সেবকও রয়েছেন। যারা রোজদারদের সারিবদ্ধভাবে নির্দিষ্ট আসনে বসান ও তাদেরকে ইফতার পরিবেশন করেন।

মুসাফিরখানায় ইফতার করা বেশিরভাগ রোজদারই দরিদ্র শ্রেণীর। এর মধ্যে মাজারভক্ত অনেক অবস্থাসম্পন্ন মানুষ, কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীদেরও সকলের সাথে একসারিতে বসে ইফতার করতে দেখা যায়। শুধু সিলেটের মানুষজন নয় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকেও শাহজালাল (রহ.) মাজারে ভক্তবৃন্দ শুধু ইফতারের স্বাদ গ্রহন করতে এখানে আসেন।

ঢাকা থেকে আগত রিনা বেগম (৪০) বলেন, আমারা চার জন এসেছি ঢাকা থেকে। এবারই প্রথম এসেছি এই মাজারে। বাবার মাজারের এই ইফতারের সুনাম অনেক আগে শুনেছি। তাই এবার চলে এসেছি।

নগরের মিরাজার এলাকার গৃহিনী সুরাইয়া খাতুন তার মেয়েকে নিয়ে এসেছিলেন মাজার জিয়ারত করতে। এর ভিতরে ইফতারের সময় হয়ে যাওয়ায় তিনি মেয়েকে নিয়ে মুসাফিরখানায় প্রবেশ করেন। ইতোমধ্যে মুসাফিরখানার নিচ তলায় পরিপূর্ণ হয়ে গিয়েছে। তাই তিনি দ্বিতীয় তলায় নারীদের জন্য বরাদ্ধকৃত রুমে বসলেন মেয়েকে নিয়ে।

সুরাইয়া খাতুন বলেন, চাইলে আমি পাশের রেস্তোরাতে ইফতার করতে পারতাম। সেই সামর্থ্য আমার আছে। কিন্তু দরগাহে বসে সবার সাথে ইফতার করার সুযোগ সব সময় আসে না তাই এখানে ইফতার করতে এসেছি। তিনি আরো বলেন, ধনী, গরীব সবার জন্যই রোজা সমান। তাই শুধু রোজা রাখলেই হবে না। আমাদের মন মানসিকতাকেও পরিবর্তন করতে হবে। ধনী গরিবের ভেঁদাভেদ ভুলে সবার সাথে এককাতারে বসে ইফতার করার মধ্যে প্রশান্তি পাওয়া যায়। তাছাড়া এই মাস হলো আত্মশুদ্ধির মাস, সংযমের মাস। মনের মধ্যে বেষম্য লালন করে রোজা রাখলে কোনো প্রাপ্তি থাকবে না।

এ ব্যাপারে হজরত শাহজালাল (রহ.) ৩৬০ আউলিয়ার ভক্তবৃন্দ নামক সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক শেখ মো. মকন মিয়া বলেন, রমজানে মাসে মুসাফিরদের ইফতার করানো মাজারের র্দীঘদিনের ঐতিহ্য। এখানে ধনী গরীব সবাই এককাতারে বসে প্রতিদিন ২৫০ থেকে ৩০০ মানুষ দরগাহ ইফতার করেন। বৃহস্পতিবারে এই সংখ্যা প্রায় ৫০০ হয়ে যায়। এখানে প্রতিদিন সেহেরি খাওয়ানোর ব্যবস্থাও রয়েছে। সেহেরিতে কোনোদিন ১০০ জন কোনোদিন ৮০ জন মানুষ খাবার খান। মানুষকে তৃপ্তির সহিত খাওয়ানোর জন্য আমরা আমাদের সাধ্যমত চেষ্টা করি।  

আপনার মন্তব্য

আলোচিত