নিজস্ব প্রতিবেদক

২৫ জুন, ২০১৯ ০০:৪৫

ঝুঁকিপূর্ণ সেতু আর অতিরিক্ত যাত্রীতেই দুর্ঘটনা!

ট্রেনে ধারণ ক্ষমতার চাইতে অধিক যাত্রী আর ঝুঁকিপূর্ণ সেতুর কারণেই রোববার কুলাউড়ার ট্রেন দুর্ঘটনাটি ঘটে। রেলওয়ের কর্মকর্তা, ট্রেনের যাত্রীদের আর স্থানীয়দের সাথে আলাপ করে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। সেতুটি পার হওয়ার সময় ট্রেনের গতি বেশি ছিলো বলেও জানিয়েছেন অনেকে।

রোববার রাত পৌনে ১২টায় মৌলভীবজারের কুলাউড়া উপজেলার বরমচালে সেতু ভেঙ্গে উপবন এক্সেপ্রেসের ৪টি বগি খালে পড়ে যায়। এতে নিহত হন ৪ জন। আহত হন শতাধিক। এই দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে দুটি বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠনের কথা জানিয়েছেন রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোফাজ্জল হোসেন।

মো. মোফাজ্জেল হোসেইন জানান, লাইনের দুর্বলতা কিংবা চাকার কম্বিনেশনের কারণে ঘটতে পারে এ দুর্ঘটনা। তিনি জানান, একটি ট্রেনে সচরাচর ১২-১৪টি বগি থাকে। কিন্তু, দুর্ঘটনা কবলিত ট্রেনটিতে বগি লাগানো হয়েছিল ১৭টি। প্রতিটি বগিতে সিট ছিল ৬৫টি। এ হিসাবে ট্রেনটিতে প্রায় ১ হাজার ১০৫ জন যাত্রী ছিলেন। এর বাইরে আরও  অনেক যাত্রী দাঁড়িয়ে ছিলেন।

রেলওয়ে সচিব জানান, দুর্ঘটনা কবলিত ট্রেনের সর্বশেষ বগি বড়ছড়া রেলসেতুর নিচে পড়ে যায়। পরে দুটি বগি উল্টে যায় এবং এর পরের দুটি বগি রেলে দাঁড়ানো অবস্থায় কাত হয়ে পড়ে।

তিনি জানান, তদন্তকারীরা দুর্ঘটনা কবলিত ট্রেন এবং ব্রিজের (রেলসেতু) ছবি নিয়ে গেছে। তদন্ত কমিটি সার্বিক বিষয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে। এ দুর্ঘটনার কারণে প্রায় ৮শ’ গজ রেললাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একটি সেতুতে ভাঙ্গনের কারণে গত ১৯ জুন থেকে সিলেট-ঢাকা মহাসড়কে সরাসরি যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে বেড়েছে ট্রেনের উপর চাপ। ১৯ জুন থেকে ট্রেনের টিকিটের জন্য ভিড় করেন বিপুল সংখ্যক যাত্রী। গত পাঁচদিন ধরে বাড়তি যাত্রী নিয়েই সিলেটে যাওয়া আসা করছে ট্রেন। সড়ক পথ বন্ধ. যাত্রীর চাপ বেড়েছে। তবে এজন্য ট্রেনের বগি বাড়ানো হয়নি। ফলে টেনে বসে-দাঁড়িয়ে গাদাগাদি করেই যাওয়া আসা করছিলেন যাত্রীরা। রোববার রাত ১০টায় সিলেট রেলওয়ে স্টেশন থেকে ছেড়ে যায় উপবন এক্সপ্রেস।

সিলেট রেলওয়ে স্টেশন সূত্রে জানা যায়, উপবন এক্সপ্রেসে সিলেট স্টেশনের জন্য বরাদ্ধ ছিলো ৭৮২ টি টিকিট। তবে এই স্টেশনে বিক্রি হয় ৭৮২টি টিকিট।

টিকিট ছাড়া আরও শতাাধিক যাত্রী ট্রেনটিতে উঠেন বলে রেলওয়ে স্টেশন সংশ্লিস্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে।
দুর্ঘটনাস্থল বরমচাল যাওয়ার আগে আরও অন্তত ৮ টি স্টেশন থেকে যাত্রী ওঠেন ট্রেনে। এতে যাত্রী সংখ্যা ট্রেনের ধারণক্ষমতা ছাড়িয়ে যায়।

এদিকে, সিলেট-আখাউরা সেকশনের সবগুলো সেতুই দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। এসব সেতুতে যে কোনো সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কা করে আসছিলেন রেলওয়ে সংশ্লিস্টরাও। সেতুর স্লিপার বাঁকা হয়ে যাওয়া, স্ক্রু খুলে পড়া ও পাথর কমে যাওয়ায় ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠেছিলো এগুলো। এই সেকশনের একাধিক সেতুতে ‘ডেড স্টপ’ জারি করেছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। ‘ডেড স্টপ’ জারি করা সেতুগুলো গতি কমিয়ে ধীরে ধীরে পার হওয়ার নির্দেশনা রয়েছে চালকের উপর।

রেলওয়ের প্রকৌশল শাখা সূত্রে জানা যায়, সিলেট-আখাউড়া সেকশনের অনেকগুলো সেতুই অতি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এরমধ্যে রয়েছে- শমসেরনগর-টিলাগাঁও সেকশনের ২০০ নম্বর সেতু, মোগলাবাজার-মাইজগাঁও সেকশনের ৪৩, ৪৫ ও ৪৭ নম্বর সেতু, কুলাউড়া-বরমচাল সেকশনের ৫ ও ৭ নম্বর সেতু, সাতগাঁও-শ্রীমঙ্গল সেকশনের ১৪১ নম্বর সেতু, শ্রীমঙ্গল-ভানুগাছ সেকশনের ১৫৭ নম্বর সেতু, মাইজগাঁও-ভাটেরাবাজার সেকশনের ২৯ নং সেতু এবং মনতোলা-ইটাখোলা সেকশনের ৫৬ নম্বর সেতু। সেতু সংস্কারের কোনো প্রকল্প না থাকায় এগুলো সংস্কার হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন রেলওয়ের কর্মকর্তারা।

দুর্ঘটনা কবলিত ট্রেনটিতে করে ঢাকায় যাচ্ছিলেন সিলেটের জৈন্তাপুর কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ শাহেদ আহমদ। তাঁর সামনের বগিই ব্রিজ ভেঙ্গে খালে পড়ে যায়।

শাহেদ আহমদ বলেন, ট্রেনটির সবকটি আসনই যাত্রীতে পূর্ণ ছিলো। এছাড়া প্রতিটি বগিতেই ২০/২৫ জন করে স্ট্যান্ডিং (দাঁড়ানো) যাত্রী ছিলেন।

শাহেদ আহমদ বলেন, দুর্ঘটনার পর আমরা ওই সেতুতে গিয়ে দেখেছি, সেতুর উপরের স্লিপার বাঁকানো, নাটগুলোও খুলে পড়েছে।

বরমচালের স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, এই সেতুর দুরবস্থা নিয়ে অনেক আগে থেকেই রেলওয়ে কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছিলেন তারা।

দুর্ঘটনার পর উদ্ধারকাজে এসেছিলেন দুর্ঘটনা এলাকার পাশের গ্রাম নন্দনগরের বাসিন্দা ফারুক মিয়া (৪৫)। তিনি বলেন, এই সেতুর স্লিপার জোড়া লাগানো নাটের বেশিরভাগই অনেক আগে খোয়া গেছে। ট্রেন পার হওয়ার সময় সেতু কেঁপে ওঠে। বিষয়টি রেলে কর্মকর্তাদের একাধিকবার জানানো হয়েছে বলে জানান তিনি।
সিলেট রেলওয়ে স্টেশনের ভারপ্রাপ্ত স্টেশন ম্যানেজার সচিব কুমার মালাকার বলেন, এই সেকশনের বেশিরভাগ সেতুই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। এরমধ্যে মাইজগাঁও-ভাটেরাবাজার সেকশনের ২৯ নং সেতুতে ‘ডেড স্টপ’ জারি করা হয়েছে। তবে ঝুঁকিপূর্ণ সেতুই দুর্ঘটনার কারণ কী না তা এখনই বলা যাবে না।

অতিরিক্ত যাত্রী প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ১৯ জুন সিলেটের সড়ক পথ বন্ধ হওয়ার পর থেকেই ট্রেনে যাত্রীর চাপ বেড়েছে। অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে ট্রেন যাওয়া আসা করছে। প্রয়োজনে বগিও বাড়ানো হচ্ছে। দুর্ঘটনাকবলিত ট্রেনে ১৫ বগির স্থলে ১৭ টি করা হয়েছিলো।

এ ব্যাপারে রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের বিভাগীয় রেলওয়ে ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী বোরহান উদ্দিনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত