২১ অক্টোবর, ২০১৯ ২৩:৪০
পুরনো বইয়ের কথা মাথায় আসতেই সবার আগে মনে পড়ে রাজধানীর নীলক্ষেতের কথা। বাংলাদেশের পুরনো বই বিক্রয়ের জন্য প্রসিদ্ধ স্থান এটি। তবে শিক্ষার ক্ষেত্রে অগ্রসর এমন শহরের অলিগলি বা গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের ক্যাম্পাসের পাশে বা বড় শহরের ফুটপাতেও আমরা এখন হামেশাই পুরনো বইয়ের দোকান দেখে থাকি।
তবে সিলেটের বই প্রেমীদের জন্য ঢাকার নীলক্ষেত বা অন্যান্য বড় শহরের মতো কোন পুরনো বইয়ের নির্দিষ্ট মার্কেট বা স্থান না থাকলেও এ শহরে রয়েছেন কিছু পুরনো বইয়ের বিক্রেতা। নগরীর নানা স্থানের ফুটপাতে তারা গড়ে তুলেছেন নিজেদের বিক্রয়কেন্দ্র। সাজিয়ে বসেছেন পুরনো বইয়ের পসরা। নগরের পুরনো বইয়ের অধিকাংশ ক্রেতাদের চাহিদা তারাই মিটিয়ে যাচ্ছেন কয়েক বছর ধরে।
ফুটপাতে গড়ে ওঠা পুরনো এসব দোকানে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি পাওয়া যায় দেশী-বিদেশী ম্যাগাজিন, উপন্যাস, রিসার্চ পেপার, জার্নাল, রেফারেন্স বই, নামী-দামী দেশী-বিদেশী লেখকের বই। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদন, বিশ্বখ্যাত নতুন-পুরনো সাহিত্যসমূহের বাংলা অনুবাদসহ বিভিন্ন দেশী-বিদেশী ক্যাটালগ ও ইংরেজি, ফরাসী, আরবিসহ বিভিন্ন ভাষা শিক্ষার বই। আরও পাওয়া যায় বিভিন্ন ধরনের থ্রিলার ও আত্মোন্নয়নমূলক দেশী-বিদেশী লেখকের বই।
পুরনো বইয়ের ক্রেতাদের মাঝে পরিচিত এক বিক্রেতার নাম সাজির ইসলাম। ইসলাম নামেই তাকে চেনেন তার ক্রেতারা। নগরীর চৌহাট্টা পয়েন্টে ফুটপাতের একপাশে বই নিয়ে বসেন তিনি। তার সাথে কথা বলে জানা যায়, ২০০৬ সাল হতে এখানে পুরাতন বই বিক্রয় করেন তিনি।
শুরুটা হয়েছিল কিভাবে? জানতে চাইলে তিনি বলেন, এক সময় ঢাকা ও চট্টগ্রাম হতে পুরনো বই পাইকারি মূল্যে কেনার জন্য ব্যবসায়ীরা সিলেটে আসতেন। তাদেরকে পুরনো বই সরবরাহ করতেন তিনি। একদিন ভাবলেন নিজেই কেন ক্রেতাদের হাতে বই পৌঁছে দিচ্ছেন না? এতে মুনাফাও হত বেশি। তাই একদিন চৌহাট্টায় রাস্তার পাশে বইয়ের পসরা সাজিয়ে বসে পড়েন। এভাবে প্রায় গত চৌদ্দ বছর যাবত ক্রেতাদের পুরনো বই সরবরাহ করছেন সাজির ইসলাম।
তার কাছে পাঠ্য বইসহ বিসিএস পরীক্ষার প্রস্তুতি বই, গল্প-উপন্যাস, অনুবাদ ও রেফারেন্স বই সবই পাওয়া যায়। বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেলের ছাত্র-ছাত্রীসহ অনেক বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষকরা তার কাছ থেকে বই কেনে থাকেন। জানালেন বই বিক্রয় করে বাবা-মা, স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে ভালই চলে যায় তার দিনকাল। শিক্ষা সামগ্রী বিক্রয় করেন বলে সকলেই তাকে উৎসাহ দেন ও ভালবাসেন। শুক্রবার ব্যতীত সপ্তাহের ছয়দিনই তিনি বসেন চৌহাট্টা পয়েন্টে। প্রতিদিন সকাল ১০টা হতে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত চলে কেনা-বেচা।
সাজির ইসলামের মত পুরনো বই বিক্রয় করে জীবিকা নির্বাহ করেন আরেক পুরনো বইয়ের বিক্রেতা মোহাম্মদ আবদুল্লাহ। তিনি তার ভ্যান নিয়ে বসেন নগরের দরগা গেইট এলাকায় আম্বরখানা দরগা গেইট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশে। তাকে পাওয়া যাবে প্রতিদিন দুপুর ১২টা হতে রাত ৯টা পর্যন্ত।
আবদুল্লাহর সাথে কথা বলে জানা যায়, এক সময় কিণ ব্রিজ এলাকায় ব্যবসা করতেন তিনি। মাঝখানে ব্যবসা ছেড়ে দিয়ে চার বছর পূর্বে আবারও বসেন আম্বরখানা এলাকার দরগা গেইটে। সম্প্রতি ‘আবদুল্লা বুক হাউস’ নাম দিয়ে সেখানেই একটি ছোট দোকান দিয়েছেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের বইসহ গল্পের বই, উপন্যাস, বিসিএস প্রস্তুতিমূলক বই, লেখার জন্য প্যাড ইত্যাদি বিক্রয় করেন তিনি।
আবদুল্লাহ বই সংগ্রহ করেন দেশের নানান স্থান হতে। ছাত্র ও বই পড়ুয়ারা তার কাছ থেকে এসব বই কিনে নিয়ে যান। এই করেই নিজের সংসার চালাচ্ছেন তিনি।
এদিকে সিলেটের প্রথম পুরনো বইয়ের বিক্রেতা দাবি করে মিরের ময়দান এলাকার ‘রাফি লাইব্রেরি’র কর্ণধার বাচ্চু মিয়া বলেন, সিলেটে তিনি প্রায় বিশ বছর ধরে ব্যবসা করছেন পুরনো বইয়ের। এক সময় খোলা আকাশের নিচে তিনি বই বেচতেন। পরে দোকান নিয়ে ছেলের নাম দিয়ে ‘রাফি লাইব্রেরি’ চালু করেন তিনি।
ফেরিওয়ালাদের কাছ থেকে বই সংগ্রহ করে ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে বই বিক্রয় করেন বাচ্চু মিয়া। আইন, মেডিকেল বিষয়ক বইসহ গল্প-উপন্যাস, মাসুদ রানা- তিন গোয়েন্দা ইত্যাদি বই আছে তার কাছে।
সাজির ইসলাম, মোহাম্মদ আবদুল্লাহ ও বাচ্চু মিয়ার মত আরও কিছু পুরনো বই বিক্রেতা আছেন নগরের কালীঘাট ও কাজির বাজার এলাকায়। তাছাড়া জিন্দাবাজারের রাজা ম্যানশনেও রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরনো বই বিক্রির দোকান।
পুরনো বই বিক্রয় সবসময় লাভজনক না হলেও বইয়ের প্রতি ভালবাসা থেকে অনেকেই এ ব্যবসা ছাড়তে পারেন না। বইয়ের ক্রেতাদের সাথে ভালবাসা ও সুসম্পর্ক নিয়ে তারা মিটিয়ে যাচ্ছেন নগরে পুরনো বইয়ের চাহিদা।
আপনার মন্তব্য