১৫ এপ্রিল, ২০২০ ২৩:৫৩
করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়া সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক ডা. মঈন উদ্দিন বুধবার ভোরে মারা গেছেন। তবে কার মাধ্যমে তার শরীরে করোনা সংক্রমিত হয় তা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ডা. মঈনের পর সিলেটে আর কোনো করোনা আক্রান্ত রোগীও সনাক্ত হয়নি।
এতে করে সিলেটে দেখা দিয়েছে আতঙ্ক। ডা. মঈনকে করোনা ছড়ানো ব্যক্তি এখনও সনাক্ত না হওয়ায় তিনি আরও মানুষকে সংক্রমিত করতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বুধবার ভোরে ঢাকার কুর্মিটোলা হাসপাতালে মারা যান ডা. মঈন উদ্দিন। এরআগে ৫ এপ্রিল করোনা আক্রান্ত হিসেবে তিনি সনাক্ত হন। প্রথমদিকে প্রবাসী স্বজনদের মাধ্যমে ডা. মঈনের করোনা সংক্রমিত হতে পারে বলে ধারণা করেছিলেন স্বাস্থ্য অধিপ্তরের কর্মকর্তারা। তবে এখন তাদের দাবি, ডা. মইনের প্রবাসী কোনো স্বজন দেশে আসার কোনো তথ্য তারা পাননি। কোনো রোগীর মাধ্যমেই মঈন সংক্রমিত হতে পারেন। ডা. মঈন আক্রান্ত হওয়ার পর তার পরিবার ও কর্মসস্থলের ১২ জনের করোনা পরীক্ষা করা হয়। তবে তাদের কারো শরীরেই করোনাভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। ফলে কার মাধ্যমে সংক্রমিত হলেন এই চিকিৎসক এ প্রশ্ন আরো জোরালো হয়েছে।
ডা. মঈন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া দেশের প্রথম চিকিৎসক। তিনি সিলেটের প্রথম এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র করোনা আক্রান্ত ব্যক্তি। বুধবার রাতে গ্রামের বাড়ি সুনামগঞ্জের ছাতকে তাকে সমাহিত করা হয়। ওসমানী হাসপাতালের পাশপাশি তিনি নগরীর ইবনে সিনা হাসপাতালেও রোগী দেখতেন। সেখানে চেম্বারে তিনি প্রাইভেট প্র্যাকটিসও করতেন।
সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজের উপ-পরিচালক ডা. হিমাংশু লাল রায় সিলেটটুডে টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ডা. মঈন আগে থেকেই তার ব্যক্তিগত চেম্বার বন্ধ করেছিলেন। তবে তিনি ইবনে সিনা হাসপাতালের কেবিনে ৪ থেকে ৫ জন রোগী দেখেছেন। ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কয়েকজন রোগীও দেখেছেন। এর মধ্যে আইসিইউতে একজন রোগী দেখেছেন। ওসমানীর আইসিইউতেই সেই রোগী মারা যান। আমাদের সন্দেহ ছিলো এই রোগীর মাধ্যমে মঈন আক্রান্ত হতে পারেন। তাই এই রোগী মারা যাওয়ার আগে তার নমুনা সংগ্রহ করে করোনা পরীক্ষা করানো হয়। কিন্তু তার রিপোর্ট নেগেটিভ আসে।
এছাড়াও ওই চিকিৎসকের সংস্পর্শে আশা সবারই খোঁজ খবর নেওয়া হয়েছে। তার পরিবারের সদস্য, তার সহকারি, তার কাছে চিকিৎসা নেওয়া রোগী, তার ফার্মাসিস্ট সবার খোজ খবর নেওয়া হয়েছে। এদের মধ্যে কেউই করোনাভাইরাস পজিটিভ নন বলে জানান ডা. হিমাংশু লাল রায়।
ডা. হিমাংশু বলেন, করোনা আক্রান্ত সব রোগীর শরীরে উপসর্গ দেখা দেয় না। অনেকেরই করোনার উপসর্গ আসে না কিন্তু তিনি ভাইরাস বহন করতে পারেন। তখন ওই ব্যক্তি যদি হাঁচি, কাশি দেন এর মাধ্যমেও ভাইরাস ছড়াতে পারে। এরকম কোনো রোগী বা রোগীর স্বজনের সংষ্পর্শে তিনি গিয়েছিলেন কি না তা এখন পর্যন্ত জানা যায়নি। আমরা তার সংস্পর্শে আসা অনেকেরই খোঁজখবর নিয়েছি। তাদের মধ্যে কেউই করোনাভাইরাসে আক্রান্ত নন।
৫ এপ্রিল ডা. মঈনের করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার তথ্য জানিয়ে সিলেটের সিভিল সার্জন ডা. প্রেমানন্দ মণ্ডল জানিয়েছিলেন, তিনি প্রবাসী স্বজনদের সংস্পর্শে এসে আক্রান্ত হতে পারেন।
তবে বুধবার প্রেমানন্দ মন্ডল বলেন, কিভাবে তিনি সংক্রমিত হয়েছেন এটা সনাক্ত করা খুব শক্ত। আমরা তার পরিবার ও কর্মস্থলের ১২ জনকে টেস্ট করিয়েছি। কারো পজেটিভ ধরা পড়েনি। এছাড়া এই সময়ে সিলেটে আর কোনো রোগীও সনাক্ত হয়নি। ডা মঈন সাম্প্রতিক সময়ে সিলেটের বাইরে যাননি, তার কোনো প্রবাসি স্বজনও দেশে আসেননি। ফলে তিনি কিভাবে আক্রান্ত হয়েছেন তা বলা যাচ্ছে না।
জানা যায়, অসুস্থ বোধ করার পর থেকেই নিজেকে হোম কোয়ারেন্টিন করে রাখেন ডা. মঈন উদ্দিন। চলতি মাসে তিনি চেম্বারে বসেন তিনি। আগে প্রতি সকালে নগরীর হাউজিং এস্টেট এলাকায় মর্নিং ওয়াক করলেও তাও বন্ধ রাখেন। ৫ এপ্রিল যখন তিতি করোনা আক্রান্ত হিসেবে সনাক্ত হন তখন হাউজিং এস্টেটের নিজ বাসায় ছিলেন ডা. মঈন।
সেখানে শারিরীক অবস্থার অবনতি হলে ৭ এপ্রিল রাতে তাকে সিলেট শহীদ শামসুদ্দিন হাসপাতালের করোনা আইসোলেশন সেন্টারে ভর্তি করা হয়। প্রথমে হাসপাতালের আইসিইউতে নেয়া হলেও পরে সাড়ে ১১টার দিকে কেবিনে নিয়ে আসা হয়। অক্সিজেন সাপোর্ট দিয়ে তার শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক রাখা হয়।
তবে পরদিন ৮ এপ্রিল ঢাকায় পাঠানো হয় এই চিকিৎসককে। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় বুধবার সকাল পৌনে সাতটায় তিনি মারা যান।
দুই সন্তানের জনক ডা. মঈনের স্ত্রীও একজন চিকিৎসক। তিনি নগরীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে কর্মরত আছেন।
আপনার মন্তব্য