২৪ জুলাই, ২০২৬ ১৫:০০
মো. সাহাবুদ্দিন ২৪ এপ্রিল ২০২৩ তারিখে দেশের ২২তম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী তাঁর দায়িত্বকাল ২০২৮ সালের ২৩ এপ্রিল শেষ হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু ২০২৬ সালের ২৪ জুলাই শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে তিনি পদত্যাগ করেন।
সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী স্পিকারকে দেওয়া পদত্যাগপত্রে রাষ্ট্রপতি লেখে: আমি মো. সাহাবুদ্দিন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হয়ে ২০২৩ খ্রি. সনের ২৪ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করি এবং অদ্যাবধি নিষ্ঠা, সততা ও সংবিধানের প্রতি পূর্ণ আনুগত্যের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছি। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ৫ই আগস্ট ২০২৪ সনে ছাত্র জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে তৎকালীন সরকারের পতনের পর দেশে শাসনতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক সংকটের সৃষ্টি হয়। সাংবিধানিক সংকট থেকে উত্তরণের অভিপ্রায়ে সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদের ক্ষমতাবলে আমি রাষ্ট্রপতি হিসেবে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের মতামত কামনা করি। অতঃপর বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের পরামর্শক্রমে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রাজনৈতিক দলসমূহের সাথে পরামর্শক্রমে জাতীয় সংসদের সাধারণ নির্বাচন আয়োজন করে। নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে বর্তমান সরকার গঠিত হয়ে সরকার পরিচালনা করছে। বর্তমানে সরকারি দল ও বিরোধী দল গণতান্ত্রিক চর্চার মধ্য দিয়ে জাতীয় সংসদে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করছে। আমার সুদৃঢ় ও ইতিবাচক ভূমিকার কারণে দেশে কোন সাংবিধানিক বিপর্যয় ঘটেনি।
রাষ্ট্রপতি লেখেন: আমি গুরুতর অসুস্থ। হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কিডনি জটিলতায় ভুগছি। আমার হৃদযন্ত্রে বাইপাস সার্জারি হয়েছে। ইদানীং স্বাস্থ্য পরীক্ষায় Autonomic Neuropathy নামক রোগ শনাক্ত হয়েছে। এই রোগের কারণে আমি মাঝে মাঝে ক্ষণিক অচেতন হয়ে যাই। রোগ সমূহের প্রাদুর্ভাবে শারীরিক ও মানসিক অসামর্থ্যতার কারণে রাষ্ট্রপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদের দায়িত্ব পালন করা আমার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। আমার দীর্ঘ মেয়াদে চিকিৎসা প্রয়োজন। এমতাবস্থায়, সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদের বিধান অনুযায়ী আমি রাষ্ট্রপতির পদ হতে পদত্যাগ করছি।
মো. সাহাবুদ্দিন ১৯৪৯ সালের ১০ ডিসেম্বর পাবনা শহরের শিবরামপুরে অবস্থিত জুবিলি ট্যাঙ্ক পাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা শরফুদ্দিন আনসারী এবং মাতা খায়রুন্নেসা। তাঁর পিতা পাবনা শহরের অন্যতম একটি সাবান ফ্যাক্টরির মালিক ছিলেন।
শিক্ষাজীবনে তিনি ধারাবাহিকভাবে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। ১৯৬৬ সালে রাধানগর মজুমদার একাডেমি থেকে এসএসসি, ১৯৬৮ সালে পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ থেকে এইচএসসি এবং ১৯৭১ সালে (পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭২ সালে) বিএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন।
পরবর্তীতে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭৪ সালে মনোবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর এবং ১৯৭৫ সালে পাবনা শহিদ আমিনুদ্দিন আইন কলেজ থেকে এলএলবি ডিগ্রি লাভ করেন। উক্ত পরীক্ষায় ১০৩ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে তিনিই একমাত্র উত্তীর্ণ হয়ে বিশেষ কৃতিত্বের পরিচয় দেন।
পাকিস্তান আমলে ১৯৬৭ সনে রেশনের ভুট্টা খেয়ে পাবনায় বিষক্রিয়ায় কতিপয় মৃত্যুর ঘটনা ঘটলে সেখানে সশস্ত্র বিদ্রোহ হয়। তিনি এ বিদ্রোহে অংশগ্রহণ করেন। তাঁর বিরুদ্ধে হুলিয়া জারী হলে কিছুদিন তাঁকে আত্মগোপনেও থাকতে হয়েছিল।
তিনি মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন দীর্ঘ সময়। ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ তিনি পাবনা টাউন হল ময়দানে প্রথম বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনকারীদের অন্যতম ছিলেন। মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি পাবনা জেলা স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং প্রশিক্ষণ শেষে সরাসরি সশস্ত্র যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।
মো. সাহাবুদ্দিন পেশাগত জীবনে একজন বিচারক, প্রশাসক ও দুর্নীতিবিরোধী কর্মী হিসেবে সুপরিচিত। তিনি শিক্ষাজীবন শেষে বেসরকারি কলেজে প্রভাষক হিসেবে এবং পাশাপাশি সাংবাদিকতা পেশাতেও নিয়োজিত ছিলেন।
মো. সাহাবুদ্দিন ১৯৭৯ সালে পাবনা জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য হন এবং আইন পেশায় যোগ দেন। ১৯৮২ সালে তিনি বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিচার) ক্যাডারে যোগদান করেন। ১৯৯৫-৯৬ সালে বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন-এর কেন্দ্রীয় মহাসচিব নির্বাচিত হন। চাকরি জীবনে অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ এবং জেলা জজদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের উভয়টিতে প্রথম স্থান অর্জন করেন।
১৯৯৮-২০০০ সময়ে তিনি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পরিচালক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে তিনি বিভিন্ন জেলায় জেলা জজের দায়িত্ব পালন শেষে শ্রম আদালতের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
২০০৬ সালে জেলা ও দায়রা জজ পদ থেকে অবসর গ্রহণের পর তিনি সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে আইন পেশায় প্রত্যাবর্তন করেন। অতঃপর ২০১১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত তিনি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কমিশনার পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তাঁর ও কমিশনের দক্ষ ও নিরপেক্ষ নেতৃত্বে পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগের অনুসন্ধানে বিশ্বব্যাংকের অভিযোগকে ভিত্তিহীন হিসেবে চিহ্নিত করে রিপোর্ট উপস্থাপন করা হয় যা পরবর্তীতে কানাডার টরন্টোর ওন্টারিও কোর্ট অব জাস্টিস কর্তৃক সম্পূর্ণভাবে সমর্থিত হয়।
তিনি পাবনা ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে তিনি ১৯৭২-১৯৭৪ সাল পর্যন্ত পাবনা জেলা রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির মহাসচিব এবং ১৯৭৩-৭৪ সালে জেলা পরিবার পরিকল্পনা সমিতির কোষাধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি পাবনা প্রেস ক্লাব, অন্নদা গোবিন্দ পাবলিক লাইব্রেরি, বনমালী শিল্পচর্চা কেন্দ্র ও পাবনা ডায়াবেটিক সমিতির আজীবন সদস্য।
ব্যক্তিগত জীবনে মো. সাহাবুদ্দিন একজন পারিবারিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ। তাঁর স্ত্রী ড. রেবেকা সুলতানা শিক্ষাজীবনে ১৯৭৩ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রসংগঠন (রাকসু) নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে বিপুল ভোটে মহিলা বিষয়ক সম্পাদক পদে বিজয়ী হন। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় হতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি প্রাপ্ত হন এবং পরবর্তীতে চাকুরির সময়ে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি ১৯৮২ বিসিএস (বিশেষ) পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে প্রশাসন ক্যাডারে উত্তীর্ণ হন।
উল্লেখ্য যে, তৎসময়ে রাজশাহী বিভাগের উত্তরাঞ্চলে একজনই নারী প্রশাসন ক্যাডারে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। চাকুরিজীবনে ড. রেবেকা সুলতানা ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও কালেক্টর, সিনিয়র সহকারী সচিব, রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর, জেনারেল সার্টিফিকেট অফিসার, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক, উপসচিব ও যুগ্মসচিব পদে কর্মসম্পাদন করে ২০০৯ সালে চাকুরি হতে অবসর গ্রহণ করেন। অতঃপর তিনি একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন ও পরবর্তীতে তথায় প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
এই দম্পতির একমাত্র পুত্র সন্তান মোহাম্মদ আরশাদ আদনান (রনি) বিদেশে পড়াশোনা শেষ করার পর দেশীয় একটি ব্যাংকে ব্রাঞ্চ ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে নাটক ও সিনেমা প্রযোজনা পেশায় কাজ করার জন্য Versatile Media নামে একটি মিডিয়া হাউজ প্রতিষ্ঠা করেন। এই মিডিয়া হাউজ-এর একাধিক নাটক ও সিনেমার মধ্যে ২০২৩ সনে প্রযোজিত “প্রিয়তমা” ও “রাজকুমার” সিনেমা দু’টি সুদীর্ঘকাল পর সাম্প্রতিক সময়ে সর্বোচ্চ দর্শকপ্রিয় ও ব্যবসা সফল সিনেমা হিসেবে পরিচিতি পায় এবং দর্শক সিনেমা হলমুখী হয়। মো. সাহাবুদ্দিন ও ড. রেবেকা সুলতানার যমজ দৌহিত্র তাহমিদ মোহাম্মদ আদনান ও তাহসিন মোহাম্মদ আদনান বর্তমানে লন্ডনে শিক্ষা গ্রহণ করছে।
ভ্রমণ, বইপাঠ ও সংগীতশ্রবণ রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের প্রিয় শখ। তথ্যসূত্র: রাষ্ট্রপতি কার্যালয়ের ওয়েবসাইট।
আপনার মন্তব্য