শাকিলা ববি

০৩ মে, ২০২০ ০০:১৩

যান্ত্রিক যানবাহন বন্ধ, হাওরাঞ্চলের ভরসা এখন ঘোড়া ও মহিষের গাড়ি

হাওরে মহিষের গাড়িতে করে ধান পরিবহন করা হচ্ছে। ছবি : প্রভাত পাল

একটি সময় ছিল যখন ঘোড়াই ছিল মানুষের একমাত্র বাহন। সেই ঘোড়ার গাড়ি আবারও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে সিলেটের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। বিশেষত হাওরাঞ্চলে ধান ও নিত্যপণ্য আনা নেওয়ার কাজে ঘোড়ার গাড়ির উপর নির্ভশীলতা বেড়েছে। ঘোড়ার গাড়ির পাশাপাশি এসব এলাকায় জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে মহিষের গাড়িও।

দেশে ছড়িয়ে পড়েছে করোনাভাইরাস। তাই সকলপ্রকার যানবাহন বন্ধ। এদিকে এখন চলছে ধান কাটার মৌসুম। সিলেট বিভাগের বিভিন্ন হাওরে চলছে ধান কাটার উৎসব। কিন্তু কোনো যানবাহন না থাকায় ধান কেটে বাড়ি নিতে বা খলা থেকে ধান শুকিয়ে বাড়ি নিতে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে কৃষকদের। শুধু তাই নয় নিত্যপণ্য বাজার থেকে বাড়ি আনতেও বেগ পেতে হচ্ছে গ্রামের মানুষজনকে। তাই এসব প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষজন এখন ধান ও নিত্যপণ্য আনা নেওয়ার কাজে ঘোড়া ও মহিষের গাড়ি ব্যবহার করছেন।

বিজ্ঞাপন



খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হাওর বেষ্টিত সুনামগঞ্জ জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষজন ব্যবহার করছেন ঘোড়ার ও মহিষের গাড়ি। জেলার সদর, তাহিরপুর, দিরাই, শাল্লা, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ, দোয়ারাবাজার বাজার, ছাতক উপজেলার মানুষজনের কাছে এখন জনপ্রিয় বাহন হচ্ছে ঘোড়া ও মহিষের গাড়ি।  বিশেষ করে সুনামগঞ্জ সদর, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ, দোয়ারাবাজার ও ছাতক উপজেলা নিয়ে গঠিত সুনামগঞ্জের অন্যতম বৃহত্তম হাওর ‘দেখার হাওর’ এর কৃষকদের প্রধান বাহন এখন ঘোড়া ও মহিষের গাড়ি। এসব এলাকার বিভিন্ন গ্রামে কৃষিপণ্য ও নিত্যপণ্য বহনে এখন ব্যাপক ভূমিকা রাখছে ঘোড়া ও মহিষের গাড়ি।

পরিবহনের কাজে ব্যবহার করা এই ঘোড়াগুলো বেশিরভাগই ব্যক্তি মালিকানাধীন। হাওরাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী খেলা ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতা। এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে এসব এলাকার অনেক সৌখিন মানুষ ঘোড়া কিনেন। সেই ঘোড়াগুলোই এখন পণ্য পরিবহনের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। তাই অনেকেই নিজের জমির ধান পরিবহন করতে শখে কেনা ঘোড়া ব্যবহার করছেন। অনেক ঘোড়ার মালিক চালকের মাধ্যমে হাওর এলাকায় পরিবহন সেবা দিচ্ছেন। এত করে তার ব্যক্তিগত আয়ের পাশাপাশি আশপাশের কৃষকরাও স্বল্প খরচে সেবা পাচ্ছেন। আর গ্রামের অনেকেই গবাদিপশু হিসেবে গরুর পাশাপাশি মহিষ পালন করেন। তাই অনেক কৃষক এই মহিষের গাড়ি ব্যবহার করে নিজের চাহিদা পূরণ করে আশপাশের অন্যান্য কৃষকদেরও সহযোগিতা করছেন। পাশাপাশি আর্থিকভাবেও লাভবান হচ্ছেন।  

জানা যায়, ধান ও পণ্য পরিবহনে ঘোড়া ও মহিষের গাড়িতে পরিবহন খরচও অনেক কম। পণ্য পরিবহন করে পারিশ্রমিক হিসেবে কেউ টাকা নেন, কেউ ধান নেন। তবে হাওর এলাকার কারণে পারিশ্রমিক হিসেবে ধানের প্রচলন বেশি। ১৫ মন ধান বহন করলে চালক নেন ১ মন ধান। তবে পারিশ্রমিক এলাকা, দূরত্ব ও পরিমাণের ভিত্তিতে কিছুটা কম বেশি হয়। ঘোড়া ও মহিষের গাড়িতে পণ্য পরিবহন করতে ৩০০ থেকে ১০০০ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। তবে এই পারিশ্রমিক নির্ধারণ হয় পণ্যের পরিমাণ ও গন্তব্যের দূরত্বের ভিত্তিতে।

বিজ্ঞাপন



সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার হাসাউরা, শাহপুর, বানাইগাঁও, বনগাঁও, শিংপুরহাটি গ্রামে, দোয়ারাবাজার উপজেলার মাঠগাঁও, লক্ষ্মীপুর, পাণ্ডারগাঁও, দিরাই উপজেলার ভাটিপাড়া ইউনিয়ন ও রকিনগর ইউনিয়নের কালিয়াগুটা হাওর এলাকায়, তাহিরপুর উপজেলার কড়ইগড়, পুরানঘাট, উত্তর বড়দল, টিটিয়াপাড়াসহ বেশ কয়েকটি উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে কৃষিপণ্য ও নিত্যপণ্য পরিবহন করা হচ্ছে ঘোড়া ও মহিষের গাড়ি দিয়ে।

এদিকে দিরাই উপজেলার ভাটিপাড়া ইউনিয়ন ও রকিনগর ইউনিয়নে প্রায় ১ শত মানুষ রাজশাহীসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে এসেছেন ঘোড়া নিয়ে। তারা ধানের বিনিময়ে জমি ও খলা থেকে কৃষকের ধান বাড়িতে এনে দেন। এক বিঘা জমির ধান এনে দিলে, পারিশ্রমিক হিসেবে নেন এক মন ধান। তবে দূরত্ব অনুযায়ী পারিশ্রমিক কম বেশি হয়।

তাহিরপুর উপজেলার উত্তর বড়দল ইউনিয়নের কড়ইগড়া গ্রামের শাহাবুদ্দিন ও পুরানঘাট এলাকার কবির জানান, আগে তাদের এলাকার সড়ক যোগাযোগ ভাল ছিল না। তাই ঘোড়ার গাড়ি বেশি চলত। ওই সময়ই ঘোড়া কিনেছিলেন তারা। তবে এখন সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা কিছুটা উন্নতি হওয়ায় এলাকায় বিভিন্ন যানবাহন চলে। কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে এখন এলাকায় কোনো যানবাহন নেই তাই আবারও ঘোড়ার গাড়ি দিয়ে পরিবহন সেবা দিচ্ছেন তারা।

সুনামগঞ্জের সদর উপজেলার হাসাউরা গ্রামের রন্টু তালুকদার ও আক্তার হোসেন মহিষের গাড়ি করে কৃষকের ঘরে পৌঁছে দেন ধান। তারা জানান, করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে এলাকায় কোনো যানবাহন নেই। তাই খলা থেকে বাড়ি বাড়ি ধান পরিবহন করেন তারা।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত