টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।
Advertise
ইমতিয়াজ মাহমুদ | ৩১ ডিসেম্বর, ২০২১
নারীকে যে ধর্ষণের শিকার হতে হয় বা যৌন নির্যাতন বা যৌন হয়রানির শিকার হতে হয় এর কারণ কী? এই প্রশ্ন করছি তার প্রেক্ষাপট হচ্ছে কক্সবাজারে সমুদ্র সৈকতে দেড়শ মিটারের মতো একটা অংশকে যে জেলা প্রশাসন নারী ও শিশুদের জন্যে সংরক্ষিত করেছিল সে প্রসঙ্গটি। না, জেলা প্রশাসনের সেই সিদ্ধান্ত দিনের শেষ নাগাদ এসেই বাতিল করতে হয়েছে, সুতরাং সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা এখন অতোটা জরুরি নয়। সেটা ঠিক আছে। কিন্তু আপনি যদি জেলা প্রশাসকের সেই সিদ্ধান্ত ঠিকমতো ভেবে দেখেন, সিদ্ধান্তের কারণ ভাবেন তাহলে দেখবেন যে ধর্ষণের কারণ আর আর সেই সিদ্ধান্তের কারণ এক ও অভিন্ন- পিতৃতান্ত্রিক দৃষ্টিতে সমাজে নারীর অবস্থান তথা লৈঙ্গিক রাজনীতি।
এটা এখন আমরা প্রায় সকলেই জানি যে কোন পুরুষ সাধারণত যৌন তাড়না থেকে বা যৌন আকাঙ্ক্ষা মেটানোর জন্যে ধর্ষণ করে না বা নারীকে হয়রানি করে না। ধর্ষণ হচ্ছে লৈঙ্গিক রাজনীতিতে রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্যের বহিঃপ্রকাশ মাত্র। একদম সহজ করে বলি। পিতৃতন্ত্রে নারী হচ্ছে পুরুষের ভোগের পণ্য। এই ভোগ প্রথমত যৌন সম্ভোগই বটে, তবে যৌন সম্ভোগ ছাড়াও পুরুষের দৃষ্টিতে নারী হচ্ছে পণ্য মাত্র। একটি শিশু যখন জন্ম নেয় তখন থেকে শুরু হয়ে তাকে নারী তৈরি করার অনুশীলন। পিতামাতার কাছে কন্যা সন্তানটি হচ্ছে একটি আমানত মাত্র। পিতামাতা মনে করে যে শিশু কন্যাটিকে লালনপালন করে বড় করে তাকে একজন সক্ষম মালিকের কাছে হস্তান্তর করাই হচ্ছে ওদের কাজ।
এ যেন অনেকটা চাষি তার গাছে রসালো ফলটি যত্ন করে বড় করছে ভোক্তার হাতে তুলে দেবে বলে। ঠিকঠাক ভোক্তার কাছে পৌঁছে দিতে না পারলে সেই চাষির জীবন ব্যর্থ। আর একজন আদর্শ নারীর জীবন হচ্ছে নিজেকে একজন মালিকের কাছে সমর্পণ করা, মালিককে খুশি রাখা, তার নিজের শরীরের উপর মালিকের মনোপলি বজায় রাখা ইত্যাদি। যে নারী এটা করতে ব্যর্থ হয় সে হচ্ছে উচ্ছিষ্ট, রাস্তায় ছুড়ে ফেলে দেওয়া বাজে মাল বা পোকায় খাওয়া ফল। তার কোন মর্যাদা নাই, কোন সম্মান নাই। কেউ যদি জোর করেও তাকে খেয়ে দেয়, সেটাও নারীরই দোষ। নারীর শ্লীলতা নাকি তাতে শেষ হয়ে গেল!
পিতৃতন্ত্র যেহেতু কন্যা শিশুকে বা নারীকে পণ্যের অধিক কোন মর্যাদা দেয় না, সে কারণে পুরুষ নারীর 'সম্ভ্রম' রক্ষার দায়িত্বও নিজের কাঁধে তুলে নেয়। কৃষক যেমন তার গরু ছাগল হাস মুরগি দেখাশুনা করে, পিতা ও ভাইয়ের কাজ হচ্ছে একই রকম, কন্যা বা ভগিনীকে রক্ষা করা। এই জন্যে প্রয়োজনে তাকে শাসন করা, শৃঙ্খলিত করা, অবরুদ্ধ করা। পিতৃতন্ত্রের উদ্ভবই হয়েছে নারীকে অবরুদ্ধ করার মধ্য দিয়ে, পিতৃতান্ত্রিক সমাজের তাই লক্ষ্য। এই পিতৃতান্ত্রিক জোশ আপনি প্রতিদিনই দেখতে পান। নারীকে পর্দার মধ্যে রাখতে হবে, ঘরের মধ্যে আটকে রাখতে হবে- যেরকম করে রসগোল্লা ঢেকে রাখতে হয়। এক ক্রিকেটার নিজের বোনের সাথে ফটো পোস্ট করেছিল, লোকে ওকে ধমকাতে শুরু করেছে। কেন? সে কেন ওর বোনের চেহারা দেখাচ্ছে!
এর অনিবার্য অনুষঙ্গ হচ্ছে ধর্ষণ ও নির্যাতন। কেননা নারী হচ্ছে ওদের চোখে পণ্য মাত্র, নারীকে ধর্ষণ করা, যৌন হয়রানি করা পুরুষের জন্যে পরের সম্পদ খেয়ে দেওয়া ছাড়া বাড়তি কিছু নয়। নারী যেহেতু পণ্য মাত্র, নারীর সম্মতির কোন গুরুত্ব নাই। নারীর আবার সম্মতি কী? পাশের বাড়ির মুরগি চুরি করতে কেউ মুরগির সম্মতি নেয়? প্রতিবেশীর গাছ থেকে আম চুরি করতে কেউ আমটির সম্মতি নেয়? নারীর আবার সম্মতি কী? উল্টো নারীটারই তো দোষ। সে কেন বাইরে গেল? সে কেন অবরোধবাসিনী হয়ে থাকলো না। কেন সে বস্তার আড়ালে বা ইট কাঠের দেওয়ালের আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে রাখলো না।
এই পিতৃতান্ত্রিক চেতনারই বহিঃপ্রকাশই হচ্ছে এটা- কক্সবাজারে বেড়াতে গিয়ে একজন নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছে; আটকে রাখো নারীদের। ওই যে কথাটা, খাবার ঢেকে রাখতে হবে, রসগোল্লা ঢেকে রাখতে হবে, কাঁঠাল আড়াল করে রাখতে হবে- সেই নীতি। কক্সবাজারের জেলা প্রশাসন যে নারীদের জন্যে সৈকতের একটা অংশ সংরক্ষিত করে রাখতে চেয়েছিলেন সেটার পেছনে যে নীতিটা কাজ করেছে সেটা হচ্ছে এই নীতি। নারী হবে অবরোধবাসিনী, সে কেন খোলামেলা ঘুরে বেড়াবে? অবরুদ্ধ করে রাখো। এই নীতি।
নারীর ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার হয়ে যে নীতিতে, নারীকে অবরুদ্ধও করা হয় সেই একই নীতিতে। নীতিটা হচ্ছে পিতৃতন্ত্র। আঘাতটা যদি সেখানে না করেন, তাইলে নারীকে এই স্ট্যাটাস নিয়েই বাঁচতে হবে। কয়জন জেলা প্রশাসককে দোষ দেবেন, কয়জন ধর্ষককে দোষ দেবেন?
মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।
আপনার মন্তব্য