আজ বৃহস্পতিবার, ২০ জুন, ২০২৪

Advertise

ধর্ষণের বিচার কেন চাচ্ছেন?

এস এম নাদিম মাহমুদ  

আচ্ছা আপনারা কেন ধর্ষকদের বিচার চাচ্ছেন? কেন মিছামিছি ফেসবুক স্ট্যাটাসে তর্জন-গর্জন করছেন? আপনাদের সাহস দেখি তো অবাক হই, তনুকে দেখার পরও আপনাদের লজ্জা হয়নি তাই না? কয়েকদিন আগে গাজীপুরে বাবা-মেয়ে ট্রেনে যে আত্মহত্যা করলো সেটার কিছু করতে পেরেছেন? চলন্ত বাসে, বৈশাখের অনুষ্ঠানের ধর্ষকদের কিছু করতে পেরেছেন? প্রতিদিনই তো পত্রিকার পাতায় ‘ধর্ষণ’ শব্দ গিলছেন, ওইগুলো কি থেমে গেছে?

এই রাষ্ট্র এখন ধর্ষকদের জন্য উর্বর বিচরণ ক্ষেত্র। এই রাষ্ট্রে রন্ধ্রে রন্ধ্রে ধর্ষকদের নিঃশ্বাসে ভারি হয়ে উঠলেও আপনার কিংবা আমার মস্তিষ্কে আস্তে আস্তে গা সওয়া হয়ে গেছে। ধর্ষকদের পোষতে পোষতে রাষ্ট্র এখন পোষক হয়ে গেছে। প্রজাতন্ত্রের শ্রমিকরা ভাবতে শুরু করেছে, ধর্ষণ মানে পুরুষদের অধিকার, আর তাকে বৈধতা দিতে সর্বদা দাতব্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করেছে। চোখের রঙ পরিবর্তন করার মতো নিজেদের সঙ সাজ দেখিয়ে যেমন ধর্ষিতদের এবং তাদের পরিবারকে বারবার ধর্ষণ করে তৃপ্তির ঢেকুর তুলে বলে, আহা বাছা পুরুষ যখন হয়েছ তখন তো ধর্ষণ করবেই। আর ধর্ষকদের বাপ-চাচারা বলছে, মাসুম বাচ্চা আপসে একটু-আধটু ফুর্তি করছে মাত্র, কি এমন হয়েছে? বাপের সাগরেদরা বলছে, তদন্ত-ফদন্ত নেই পত্রিকাগুলো ধর্ষকদের ছবি ছেপে দিলো? সারাজীবনের ব্যবসা-চাকুরির সম্মান নিমিষে ধ্বংস করে দিলো?

ভাই পো, আপনি ধর্ষকদের যে উস্কানিটা দিলেন তা কি সহ্য করতে পারবেন তো? আপনার বোনকে কিংবা বউকে যখন এই ব্যবসায়ীর উত্থিত সন্তান ধর্ষণ করলে মেনে নিতে পারবেন তো? তখন বলতে পারবেন তো, আপনার বোনের সারাজীবনের গচ্ছিত ইজ্জতের পূজা ব্যবসায়ীর অর্জিত সম্মানতূল্য? তখন বলবেন কি, বোন তুই ওইসব অনুষ্ঠানে গেলে বেশ্যা তো হবিই?

যখন নিজেরটা হারায় না তখন তার মূল্য বুঝতে পারা যায় না। আজ যারা ধর্ষকদের ‘সোনা’ কে মূল্যবান ব্যবসার ‘কর’ মনে করছেন, তারা আসলে নিজেরাই ধর্ষক। এরা হয়তো রাস্তায় মেয়েদের টিজ করে, ফেইসবুকে নোংরা বার্তা দেয়, নতুবা নিয়মিত ধর্ষণের রাস্তা খুঁজে বেড়ায়। সুযোগ পেলেই এরা কোপ দেবে।

আপনার মনে আছে তাহমিদের কথা? ওই যে ছেলেটা অস্ত্র হাতে হলি আর্টিজানের ছাদে জঙ্গিদের সাথে খেজুরে আলাপ করছিল। জঙ্গিদের জবাই করা রক্তেও যার শরীরে ভয়ের কোন ছাপ দেখা যায়নি, তার কি হয়েছে? তার মুক্তির জন্য ফেইসবুক পেইজে লাখের অধিক মানুষ তার মুক্তির জন্য কান্নাকাটি করেছিল, পত্রিকায় ব্যানার টানিয়ে তাকে নির্দোষ প্রমাণের সকল তৈলচিত্র প্রদর্শনী করেছিল, আপনি-আমি বিচারের দাবিতে মুখে ফেনা তুলে দিয়েছিলাম। কিছু করতে পেরেছিলেন কি?

না আপনি ব্যর্থ। আপনার স্ট্যাটাসের অভুক্ত শব্দগুলোও পরিশেষে শব্দহীন প্রমাণ হয়েছিল। রাষ্ট্রের তদন্ত প্রতিবেদনে তিনি ‘মুক্ত’। তিনি সম্মানিত ‘করদাতার’ সন্তান। যার করে এই দেশের চাকা নড়চড় করে। সেই ধর্ষকগোষ্ঠির সন্তানদের কেন আপনি ধর্ষক বলছেন? কেন তাদের ছবি ছাপছেন, ওদের মনে কষ্ট হয় না বুঝি? ওরা তো দশ মাস গর্ভে ছিল, তাদের মাকে কেউ ধর্ষণ করলে এই চোগলখোরদের লাগবে বুঝি?

মূলত সমাজে ‘বিচারহীনতার’ ছুতোতে একের পর এক ধর্ষণ বাড়ছে। সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিতে পুরুষোচিত হওয়ায় নারীদের ভঙুর হিসেবে দেখছে। ওরা ভাবছে, ধর্ষণ কেবল নারীর ইচ্ছের বিরুদ্ধে হয় না। নারীরও ক্রুটি থাকে। বাংলাদেশের প্রচলিত আইনের ধারায় যে পাঁচ কারণে ধর্ষণ অপরাধগণ্য আছে, সেখানে নারীর ইচ্ছের বিরুদ্ধেই নয়, স্বীয় স্ত্রীকেও ধর্ষণ করার মধ্যে গণ্য হবে যদি তার বয়স আইনে কম হয়। নারীকে ধর্ষণ বলতে জোর-জবরদস্তি নয়, নারী যদি এক বিছানায় শোয়ার পরও তার ইচ্ছে না করে সেখানে ধর্ষণগণ্য হয়।

যারা ভাবছে, ধর্ষিত নারী কেন ওই অনুষ্ঠানে গেল, তাদেরকে বলি রাখি, আপনি যখন আপনার স্ত্রী বা বোনকে নিয়ে জনাকীর্ণ অনুষ্ঠানে গেলেন, সেখানেও যে ওই শকুনি চোখ এড়াবে না কিংবা ধর্ষিত হবে না তার কোন নিশ্চয়তা আছে? বাংলাদেশে এমন ঘটনা আগে বুঝি ঘটেনি?

ধর্ষণের কুঁড়িদিন পর ধর্ষণের আলামত সংগ্রহ কিংবা বিচারের তদন্ত চলছে এমন ছুঁতো দিয়ে আজ সাফাত-নাঈম-সাকিফরা ডুগডুগি বাজাতে সাহস পাচ্ছে। ধর্ষকদের বাবারা গলাবাজি করে বলতে পারছে, তার সোনাধন ছেলে আপসে ‘ইয়ে’ করেছে। আর বলবেই না কেন, আপনি যখন এক মাস পর ধর্ষণের আলামত সংগ্রহ করবেন তখন তো কিছু পাবেন না। ৭২ ঘণ্টা পর শুক্র তো আপনাআপনি মারা পড়বে। আর স্যালিভিয়াতে ডিএনএ বাষ্পতুল্য হবে। ধর্ষিত নারীর শরীরেও আঘাত নিচিহ্ন হবে। আর তাতে এরা পার পেয়ে যায়। আদালতে থাকে না প্রমাণ। ধর্ষিত হয় নারী, ধর্ষিত হয় পরিবার, ধর্ষিত হয় কিছু রঙিন স্বপ্ন।

দৃষ্টিভঙ্গি বদলান। নারীকে নারী ভাবতে শুরু করুন। বোন ভাবতে শুরু করুন। মা ভাবতে শুরু করুন। তারপর প্রেমের ঐশ্বরী ভাবুন। ধর্ষণ কোন দলিত ধর্মের কোয়া নয়, এটা কেবল বিকৃত মস্তিষ্কের বিকাশ। পরিবার-সমাজ আর রাষ্ট্রের ফাঁক গলিয়ে জন্ম নেয়া ‘বিষাক্ত’ ছোবল, যা দ্বারা আপনার মেয়ে, বোন কিংবা স্ত্রী আক্রান্ত হতে পারে। আজ ধর্ষকদের জন্য আপনার মায়া লাগছে, তার বাপের সম্মানের জন্য পরাণ পুড়ছেন, যখন আপনার ঘরে একজন ধর্ষিত নারী থাকবে তখন বুঝবেন এই বিষের বিষাক্ততা।

এস এম নাদিম মাহমুদ, গবেষক, ওসাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাপান

মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।

আপনার মন্তব্য

লেখক তালিকা অঞ্জন আচার্য অধ্যাপক ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী ৪৮ অসীম চক্রবর্তী আজম খান ১১ আজমিনা আফরিন তোড়া ১০ আনোয়ারুল হক হেলাল আফসানা বেগম আবদুল গাফফার চৌধুরী আবু এম ইউসুফ আবু সাঈদ আহমেদ আব্দুল করিম কিম ৩২ আব্দুল্লাহ আল নোমান আব্দুল্লাহ হারুন জুয়েল ১০ আমিনা আইরিন আরশাদ খান আরিফ জেবতিক ১৮ আরিফ রহমান ১৬ আরিফুর রহমান আলমগীর নিষাদ আলমগীর শাহরিয়ার ৫৪ আশরাফ মাহমুদ আশিক শাওন ইনাম আহমদ চৌধুরী ইমতিয়াজ মাহমুদ ৭১ ইয়ামেন এম হক এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন একুশ তাপাদার এখলাসুর রহমান ৩৭ এনামুল হক এনাম ৪৪ এমদাদুল হক তুহিন ১৯ এস এম নাদিম মাহমুদ ৩৩ ওমর ফারুক লুক্স কবির য়াহমদ ৬৩ কাজল দাস ১০ কাজী মাহবুব হাসান কেশব কুমার অধিকারী খুরশীদ শাম্মী ১৭ গোঁসাই পাহ্‌লভী ১৪ চিররঞ্জন সরকার ৩৫ জফির সেতু জহিরুল হক বাপি ৪৪ জহিরুল হক মজুমদার জাকিয়া সুলতানা মুক্তা জান্নাতুল মাওয়া জাহিদ নেওয়াজ খান জুনাইদ আহমেদ পলক জুয়েল রাজ ১০৭ ড. এ. কে. আব্দুল মোমেন ১২ ড. কাবেরী গায়েন ২৩ ড. শাখাওয়াৎ নয়ন ড. শামীম আহমেদ ৪১ ডা. আতিকুজ্জামান ফিলিপ ২০ ডা. সাঈদ এনাম ডোরা প্রেন্টিস তপু সৌমেন তসলিমা নাসরিন তানবীরা তালুকদার তোফায়েল আহমেদ ৩১ দিব্যেন্দু দ্বীপ দেব দুলাল গুহ দেব প্রসাদ দেবু দেবজ্যোতি দেবু ২৭ নাজমুল হাসান ২৪ নিখিল নীল পাপলু বাঙ্গালী পুলক ঘটক প্রফেসর ড. মো. আতী উল্লাহ ফকির ইলিয়াস ২৪ ফজলুল বারী ৬২ ফড়িং ক্যামেলিয়া ফরিদ আহমেদ ৪২ ফারজানা কবীর খান স্নিগ্ধা বদরুল আলম বন্যা আহমেদ বিজন সরকার বিপ্লব কর্মকার ব্যারিস্টার জাকির হোসেন ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ ১৮ ভায়লেট হালদার মারজিয়া প্রভা মাসকাওয়াথ আহসান ১৯১ মাসুদ পারভেজ মাহমুদুল হক মুন্সী মিলন ফারাবী মুনীর উদ্দীন শামীম ১০ মুহম্মদ জাফর ইকবাল ১৫৩ মো. মাহমুদুর রহমান মো. সাখাওয়াত হোসেন মোছাদ্দিক উজ্জ্বল মোনাজ হক ১৪ রণেশ মৈত্র ১৮৩ রতন কুমার সমাদ্দার রহিম আব্দুর রহিম ৫৫ রাজু আহমেদ ১৯ রাজেশ পাল ২৮ রুমী আহমেদ রেজা ঘটক ৩৮ লীনা পারভীন শওগাত আলী সাগর শাওন মাহমুদ