টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।
Advertise
এনামুল হক এনাম | ১৪ জুন, ২০২৪
মানুষের মনোবিজ্ঞানের মধ্যে এক গভীর এবং জটিল প্রক্রিয়া রয়েছে যা মানুষের মস্তিষ্কের বিবর্তন ধারায় বিকশিত হয়েছে। মানুষের মস্তিষ্ক একটি জটিল এবং বিশৃঙ্খল তথ্যকে সুশৃঙ্খল করার মাধ্যমে শরীরবৃত্তীয় কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে। যখন মস্তিষ্ক কোনো ঘটনা বা শব্দের ব্যাখ্যা করতে ব্যর্থ হয়, তখন শরীরে ভয়ের উদ্রেক ঘটে। এটি একটি প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা প্রক্রিয়া যা শরীরকে সম্ভাব্য বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য প্রস্তুত করে।
তবে, সমাজে প্রচলিত কুসংস্কারগুলোর ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, অনেকেই বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার পরিবর্তে অতিলৌকিক ব্যাখ্যা গ্রহণ করে। এই প্রবণতার পিছনে মনস্তাত্ত্বিক এবং সামাজিক কিছু কারণ রয়েছে।
প্রথমত, মানুষের মস্তিষ্ক প্রাথমিকভাবে কগনিটিভ বায়াস এবং হিউরিস্টিক্সের মাধ্যমে কাজ করে। কনফার্মেশন বায়াস হলো একটি সাধারণ প্রবণতা যেখানে মানুষ এমন তথ্য এবং বিশ্বাস খোঁজে যা তাদের পূর্বধারণা এবং বিশ্বাসকে সমর্থন করে। অতিলৌকিক ব্যাখ্যা অনেক সময় এমন কিছু বিশ্বাসকে সমর্থন করে যা আগে থেকেই মানুষের মনে রোপিত থাকে। অন্যদিকে, অ্যাভেইলেবিলিটি হিউরিস্টিক হলো সেই প্রবণতা যেখানে মানুষ সহজলভ্য বা সম্প্রতি ঘটেছে এমন তথ্য বা ঘটনা বেশি মনে রাখে। অতিলৌকিক ঘটনাগুলো সাধারণত বেশি স্মরণীয় এবং সহজলভ্য হওয়ায় মানুষ এগুলোর প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয়।
দ্বিতীয়ত, মস্তিষ্কের এভোল্যুশনারি প্রোগ্রামিংও এর একটি বড় কারণ। মানুষের মস্তিষ্কের একটি প্রাকৃতিক প্রবণতা হলো অ্যাজেন্সি ডিটেকশন, যা একটি সুরক্ষা প্রক্রিয়া হিসাবে কাজ করে। মস্তিষ্ক সম্ভাব্য বিপদ থেকে বাঁচার জন্য পরিস্থিতির পেছনে কোনো কার্যকরী শক্তি খোঁজে। অতিলৌকিক ব্যাখ্যাগুলো এই প্রবণতাকে প্রভাবিত করে, যেখানে মানুষ প্রাকৃতিক ঘটনাগুলোর পেছনে অতিলৌকিক কারণ খোঁজে। হাইপার-অ্যাজেন্সি ডিটেকশন ডিভাইস (HADD) তত্ত্ব অনুযায়ী, মানুষের মস্তিষ্ক অতিরিক্তভাবে উদ্দেশ্য বা এজেন্সি শনাক্ত করার চেষ্টা করে, যা কুসংস্কারের প্রতি প্রবণতাকে বাড়িয়ে তোলে।
তৃতীয়ত, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক প্রভাবও এর একটি বড় কারণ। সমাজে প্রচলিত প্রথাগত এবং সংস্কৃতিগত বিশ্বাস মেনে চলার জন্য মানুষের ওপর সামাজিক চাপ থাকে। কুসংস্কার এবং অতিলৌকিক বিশ্বাসগুলো সমাজে প্রভাবশালী হওয়ায় মানুষ সহজেই এগুলোর প্রতি আকৃষ্ট হয়। সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার হিসেবেও কুসংস্কার এবং অতিলৌকিক বিশ্বাস প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে প্রবাহিত হয়ে আসে। এই বিশ্বাসগুলো সংস্কৃতিগতভাবে প্রতিষ্ঠিত এবং মান্য করা হয়।
সর্বশেষে বলি, অতিলৌকিক ব্যাখ্যা মানুষের মনস্তাত্ত্বিক আরাম দেয়। জটিল এবং অপ্রকাশিত ঘটনাগুলোর সহজ ব্যাখ্যা হিসেবে অতিলৌকিক ব্যাখ্যা মানুষকে মানসিক আরাম দেয় এবং তাদের মধ্যে একটি মিথ্যা নিরাপত্তার অনুভূতি তৈরি করে। এতে তাদের মনস্তাত্ত্বিক চাপ কমাতে সাহায্য করে।
রেফারেন্স:
1. Tversky, A., & Kahneman, D. (1974). Judgment under Uncertainty: Heuristics and Biases. Science.
2. Nickerson, R. S. (1998). Confirmation Bias: A Ubiquitous Phenomenon in Many Guises. Review of General Psychology.
3. Barrett, J. L. (2000). Exploring the Natural Foundations of Religion. Trends in Cognitive Sciences.
4. Atran, S. (2002). In Gods We Trust: The Evolutionary Landscape of Religion. Oxford University Press.
5. Berger, P. L., & Luckmann, T. (1966). The Social Construction of Reality: A Treatise in the Sociology of Knowledge. Penguin Books.
6. Hofstede, G. (1980). Culture's Consequences: International Differences in Work-Related Values. Sage Publications.
মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।
আপনার মন্তব্য