টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।
Advertise
আলমগীর শাহরিয়ার | ০২ এপ্রিল, ২০১৮
বাজারে পারটেক্স গ্রুপের হাফ লিটার মাম পানির বোতল ১৫ টাকা। সে হিসাবে দুই লিটার ৬০ টাকা। না, দুই লিটার ৩০ টাকা। আর পাঁচ লিটারের দাম ৭০ টাকা। বিভিন্ন কোম্পানির বাজারজাত করা পানির এই হিসাব নিকাশে শুধু গলদ না রীতিমতো শুভঙ্করের অমিমাংসিত ফাঁকি রয়ে গেছে। পানি প্রাণ ও প্রকৃতির বেঁচে থাকার পূর্বশর্ত। নগর জীবনে আমাদের প্রতিদিন পানি কিনে খেতে হয়। অফিসে জারের পানি, অফিস ট্যুরে বের হলে কেনা পানিই এখন একমাত্র ভরসা। কিন্তু ক্ষেত্রভেদে পানির দামের তারতম্য অস্বাভাবিক ও অমানবিক।
এক লিটার পানি প্রসেস ও প্যাকেটজাত করতে এতো টাকা খরচ হয় না যতোটা ব্যবসায়ীরা নির্ধারণ করেন ও মুনাফা হিসাবে কামিয়ে নিচ্ছেন। জানা যায়, আশির দশকের পর বিশ্বব্যাপী সুপেয় পানি জনপ্রিয় ব্যবসায় পরিণত হয়। পানি আর মানুষের মৌলিক অধিকার হিসেবে গণ্য হয়না। পানি এখন বাজারে পণ্য। তাও যেনতেন পণ্য নয় রীতিমতো ‘ওয়ার ভ্যালু’ আছে এমন পণ্য। মধ্যপ্রাচ্যে তেল নিয়ে যুদ্ধের পর সুপেয় পানি নিয়ে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ দামামাও বাজতে পারে এমনটাই আশঙ্কা প্রকাশ করেন আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিশেষজ্ঞরা। ছোটবেলা অর্থাৎ বছর বিশেক আগেও পানি কিনে খেতে হবে বিষয়টা আমাদের কাছে ছিল অভাবনীয়।
আমাদের কাজিনরা বছরে একবার বিলেত অর্থাৎ ইংল্যান্ড থেকে দেশে ঘুরতে আসত। এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে পথেই তাদের জন্য দোকান থেকে পানির বোতলের বড় বড় কেস মাইক্রোবাসের পেছনে মালামাল রাখার জায়গা বুটে ভরে সঙ্গে করে নিয়ে আসতে হত। ফিরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তারা এসব বোতলজাত পানি পান করত। আমরা তাদের এই আহাম্মকি দেখে কিছুটা অবাক হতাম, আনন্দও পেতাম । মনে আছে, গ্রামে আমাদের পুরান বাড়িতে অনেক পুরনো একটা টিউবওয়েল ছিল। তখন গ্রামে মাত্র ২/৩টা টিউবওয়েল ছিল। আশেপাশের পাঁচ-সাত বাড়ির মানুষজন এসে এই টিউবওয়েলের পানি খাবারের জন্য সংগ্রহ করে নিয়ে যেতেন। রোজার মাসে এই ডিপ টিউবওয়েলের ঠাণ্ডা পানি সারাদিন উপবাসে থাকা রোজাদারদের জন্য অন্যরকম এক তৃপ্তির কারণ হত। এখন যেমন গ্রামদেশে বাড়ি নয় প্রায় ঘরে ঘরে টিউবওয়েল তখন সবার বাড়িতে টিউবওয়েল ছিল না। অনেক মানুষজনই বড় বড় পুকুর ও দীঘি থেকে খাবারের পানি সংগ্রহ করতেন। হাওরে শীত মওসুমে বোরো ধান লাগানোর সময় দেখতাম ঘরের কাজের মানুষেরা অবলীলায় টলটলে স্বচ্ছ বিলের পানি দিয়ে খাবার সেরে ফেলতেন। বিলের চারপাশ ঘিরে ঘন বেতের জঙ্গল ছিল, অনেক উঁচু উঁচু গাছ। গাছে পাখির অভয়াশ্রম ছিল। সেসব কিছুই আর আগের মত নেই। পরিবেশের সেই শান্ত স্নিগ্ধ সুন্দর রূপ লোভী মানুষের থাবায় দিনদিন বিপন্ন, বিপর্যস্ত। অথচ আশেপাশের সব ক্ষেতে পানি সরবরাহের পাশাপাশি পরিবেশের স্বাভাবিক ভারসাম্য রক্ষায় এই বিলের বিরাট ভূমিকা ছিল। জগতের কিছুই চিরদিন সমান থাকে না। সব বদলায়। বদলে যাওয়া বুর্জোয়া পুঁজির পৃথিবীতে মানুষের মানবিক, নান্দনিক সব কিছুও হারিয়ে যাচ্ছে। মানুষ দিন দিন চরম স্বার্থপর হয়ে উঠছে।
এক সময় প্রজাহিতৈষী জমিদাররা এদেশে অজস্র দীঘি খনন করেছেন শুধু প্রজাসাধারণের সুপেয় পানির প্রয়োজন মেটাতে। যেমন বরিশালের দুর্গাসাগর দিঘীর কথা বলা যায়। ১৭৮০ সালে চন্দ্রদ্বীপের পঞ্চদশ রাজা শিব নারায়ন এই বিশাল জলাধারটি খনন করেন। তাঁর স্ত্রী দুর্গামতির নামানুসারে এর নামকরণ করা হয় দুর্গাসাগর। উত্তরবঙ্গের জেলা নীলফামারীর নীলসাগর দিঘী। প্রাচীন ভারতের রাজা বিরাটের আমলে যেটা খনন করা হয় বলে জানা যায়। রয়েছে কুমিল্লার ধর্মসাগর দীঘি। ওই এলাকার মানুষের জল কষ্ট নিবারণের জন্য পাল বংশের রাজা ধর্মপাল সতেরশ শতকে এটি খনন করেন। হবিগঞ্জ জেলায় অবস্থিত এশিয়ার বৃহত্তম গ্রামখ্যাত বানিয়াচংয়ের কমলারাণীর সাগরদিঘী। দীঘিটি আয়তনের দিক থেকে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম জলাধার হিসাবে স্বীকৃত।এই দীঘিটি খনন করান স্থানীয় সামন্ত রাজা পদ্মনাভ। দেশ-বিদেশে এটি কমলারাণীর দীঘি নামেও বহুল পরিচিত। জানা যায়, কবি জসীম উদদীন বানিয়াচংয়ে পরিদর্শনে কালে নয়নাভিরাম এ দীঘির প্রাকৃতিক পরিবেশ ও সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে ‘রানী কমলাবতীর দীঘি’ নামে একটি কবিতা লিখেছিলেন। যা তার সূচয়ণী কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত। এরকম বাংলার পথে প্রান্তরে অজস্র দীঘি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। যা আজো শাসককুলের মানবিক দিককে প্রতিভাত করে।
ভারতবর্ষে মুসলিম শাসনের সময় অসংখ্য মুসাফিরখানা গড়ে উঠেছিল যেখানে দিনের পর দিন দূর ভ্রমণের উদ্দেশ্যে বের হওয়া মুসাফিররা আশ্রয় নিতেন। সেখানে অতি যতনে ও সম্মানের সহিত বিনামূল্যে তাদের থাকা খাওয়ার বন্দোবস্ত করা হত। প্রাচীন সেসব মুসাফিরখানার ধ্বংসাবশেষ এখনও অনেক জায়গায় কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হয়ত প্রাচীন ভগ্নস্তূপের ইট অদূরেই নতুন গজিয়ে উঠা আলো ঝলমলে আবাসিক হোটেলের রমরমা নয়া নর্তকীখানার বাণিজ্য দেখে আর হাসে। পথের ধারে ক্লান্ত পথিকের জন্য পানি পানের ব্যবস্থাও ছিল এক সময়। কিন্তু এখন নেই। সবকিছু পণ্যায়নের যুগে পানি এখন পুঁজি লগ্নির উর্বর ক্ষেত্র। পশ্চিমা বাণিজ্যলক্ষ্মীর অনুকরণে বোতলজাত পানি পান এখন জনপ্রিয় ও নিরাপদ স্লোগানে রোজ দূরদর্শনের বিজ্ঞাপনে মুখর। কিন্তু বোতলজাত ও জারের পানি আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য অনেক সময় মারাত্মক হুমকির কারণ। সম্প্রতি কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের এক গবেষণায় ঢাকা নগরীর ৯৭ ভাগ জারের পানিতে মানুষ ও প্রাণীর মলের জীবাণু ‘কলিফর্ম’ পাওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। বিএসটিআই অনুমোদন ছাড়া অনেকই নগরীতে পানির জারের ব্যবসা করছেন। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সাপ্লাই দিচ্ছেন। দেখভাল ও কর্তৃপক্ষের তদারকির অভাবে এই পানি পান আমাদের স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়িয়েই চলছে।
র্যা পিড প্লাস্টিকাইজেশন অব সিভিলাইজেশনের ফলে ক্যান্সার রোগ এখন আগেরকার দিনের অনেক মহামারির চেয়ে কোন অংশে কম নয়। তবু আমরা প্রতি দিনকার জীবনযাপনে প্লাস্টিকের কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ করেই চলেছি। খোদ সরকারি উদ্যোগে পাট দিবসের প্রচারণায়ও প্লাস্টিকের বহুল ব্যবহার হতে দেখি। চা, কফির মত গরম পানীয় প্লাস্টিকে পরিবেশন করা হয়। যে প্লাস্টিকের উপাদান কিছু মাত্রায় হলেও গরম পানির সঙ্গে দ্রবীভূত হয়ে আমাদের শরীরে প্রবেশ করে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে । কিন্তু নাগরিক বিড়ম্বনা ও স্বাস্থ্য ঝুঁকির এসব দিক কে দেখছে!
ঢাকা শহুরে ভদ্দরলোকেরা দেশের উত্তর জনপদের মানুষদের সরলতাকে কটাক্ষ করে ‘মফিজ’ বলে ডাকেন। সেই সহজ সরল জীবনে বিশ্বাসী উত্তরবঙ্গের মানুষের শহর রংপুরে গিয়েছিলাম কিছুদিন আগে। দেখলাম এখনও খাবারের দোকান ও রেস্টুরেন্টগুলোতে খাবারের সঙ্গে গ্লাসভরতি বিশুদ্ধ পানি বিনামূল্যে পরিবেশন করা হয়। সারাদেশে যেখানে চায়ের দোকান ও রেস্টুরেন্টগুলোতে পানির জন্য এখন ভোক্তাকে মূল্য পরিশোধ করতে হয়। যতই স্বল্প পরিসরে হোক, সামান্য হোক-একটা বিভাগীয় শহরে বিনামূল্যে পানির এমন যোগান মানুষের মানবিক আচরণের প্রতীক। একই সঙ্গে পানি যে মানুষের মৌলিক অধিকার তার স্বীকৃতি। বিশ্বায়নের নতুন পৃথিবী সবকিছু বাণিজ্য, পণ্য আর মুনাফার ক্যালকুলেটরে আমাদের হিসাব করতে শেখায়। সেই স্বার্থান্বেষী পৃথিবীতে সহজ সরল চোখে জীবনকে দেখা মফিজেরাই দিনশেষে মানবিক।
মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।
আপনার মন্তব্য