আজ বুধবার, ১৮ মে, ২০২২ ইং

Advertise

সুন্দরবন দর্শন: পশ্চিম ঢাংমারী গ্রাম পর্ব

জাকিয়া সুলতানা মুক্তা  

ভ্রমণপিপাসু হিসেবে সুন্দরবন ভ্রমণ এবারই আমার প্রথম নয়। তবে এবার একটু বিশেষ ব্যাপার ছিলো। কারণ এবার সুন্দরবন লাগোয়া একটি নির্মাণাধীন ইকো রিসোর্ট ‘ইরাবতী ইকো রিসোর্ট ও রিসার্চ সেন্টার’-এর অন্যতম উদ্যোক্তা আমার কাছের বন্ধু আব্দুল্লাহ যুবাইর হীরার আহ্বানে সুন্দরবন-ঘেঁষা খুলনা জেলার দাকোপ থানার বানিয়াশান্তা ইউনিয়নের পশ্চিম ঢাংমারী গ্রামে গিয়েছিলাম। তাই এবারের ভ্রমণটা ঠিক আর দশটা ‘ভ্রমণস্থান টুকে টুকে ভ্রমণ’ করার মতন ছিলো না। এটি একেবারেই সুন্দরবনের মাটি, মানুষ, প্রাণ, সংস্কৃতি-ছোঁয়া প্রকৃতিস্পর্শ ভ্রমণ ছিলো। অভিজ্ঞতাটিও তাই অন্যান্যবারের চেয়ে অনেক ভিন্ন ছিলো। উল্লেখ্য, যেখানে গিয়েছিলাম সেটা এখনও যথেষ্ট জনপ্রিয় ভ্রমণ স্থান নয়। খুবই প্রত্যন্ত একটি এলাকা। তবে সাধারণ জনসাধারণের ব্যবহার ভীষণ আন্তরিক ও তারা এক কথায় অমায়িক প্রকৃতির। ভীষণ সংস্কৃতিমনস্ক, বিশেষ করে অবাক হতে হয় তাদের ঘরে ঘরে একেকজনের নাম রাখার প্রবণতার দিকে খেয়াল করলে।  দারুণ দারুণ সব বাংলা শব্দে নিজ নিজ পরিবারের নতুন অতিথিদের নামকরণ করেন তারা। যেমন দীক্ষা, তমালিকা, সুজাতা, তিয়াসা ইত্যাদি।

তবে জীবন এখানে কঠিন। এই অঞ্চলের মানুষের প্রত্যহ জীবন চলে জোয়ার-ভাটার সময় ধরে। গ্রীষ্ম-বর্ষার এই ষড়ঋতুর বাংলাদেশে তাদের জীবনটা একান্তভাবেই প্রকৃতির সাথে জড়াজড়ি করে বইছে। আম-জাম-লিচু-কাঁঠালের সাথে সাথে তাইতো গোলফলও তাদের বাড়ির বাচ্চাদের কাছে প্রিয় ফল। জীবন-সংগ্রামের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি পড়ে, আজকাল এখানকার কৃষকেরা ক্ষেতের পর ক্ষেত বিভিন্ন ফলফলাদি, শস্য ফলাতে বিষাক্ত সার ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে তাদের মাঝে অনুতপ্ত বোধটিও চোখে পড়ার মতন। কিন্তু পুঁজির বাজারে মধ্যসত্ত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যে কৃষকের পুঁজি তো যথাযথভাবে ফলন দেয় না, তারা শস্যের ন্যায্য মূল্য পায় না। এর কারণে বাধ্য হয়ে এ পথে তাদের হাঁটতে হয়। বিষয়টি পরিষ্কার হয় যখন কোনো গৃহস্থ বাড়িতে আসা অতিথিদের তারা নিজেদের ক্ষেতখামার দেখাতে নিয়ে গেলেও, ক্ষেত থেকে কোনো শস্য/ফলফলাদি (যেমন তরমুজ) তুলতে গেলে তারা দেয় না। কারণ ওটাতে বিষাক্ত সার দেওয়া, ওই বিষ তারা অতিথিকে খাওয়াবে না। নিজেদের জন্য তুলে রাখা ফল থেকে আন্তরিকভাবে খেতে দিতে দেখলাম প্রায় বাড়ির মাসী-বৌদিদের। পুরো বিষয়টিতে তাদের আন্তরিকতা ও অসহায়ত্বটি সুস্পষ্ট।

উৎসুক মন এ অঞ্চলের মানুষের শিক্ষা ও সংস্কৃতিচর্চার খোঁজ নিতে গেলে, জানলাম এই এলাকায় প্রতি ঘর সনাতন ধর্মের বাচ্চারাই স্কুলগামী। তবে মুসলিম মেয়েদের পড়াশোনার বেলায় এখানে বেশ রক্ষণশীলতা রয়েছে। এখানে মিশনারি স্কুলও রয়েছে, আবার অপ্রতুল স্কুল-কলেজের পাশাপাশি অনেক মসজিদ-মাদ্রাসাও রয়েছে। সনাতন বিশ্বাসের মধ্যে এলাকার হিন্দু-মুসলিমসহ আপামর জনসাধারণের মাঝে, বিশেষত যারা বনে জীবিকার উদ্দেশ্যে যায় যেমন মৌয়ালদের (মধুশিকারি) কাছে বনবিবি’র বিশ্বাস ও তার পূজা-অর্চনার বিষয়টি ঐতিহ্যবাহী এবং অত্যন্ত জনপ্রিয়। এই বিশ্বাস এমনকি সনাতন বিশ্বাসীদের বাইরেও বেশ জনপ্রিয়। কথিত আছে অসনাতন অনেক ব্যক্তিও লালপেড়ে হলুদ শাড়ির খোলা চুলে বনবিবিকে বনের মাঝ দিয়ে হেঁটে যেতে অনেকবারই দেখেছেন। ফলে উক্ত বনবিবির পূজা এখানকার সাংস্কৃতিক চর্চার একটি অন্যতম বাহন।