টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।
Advertise
শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ | ১২ আগস্ট, ২০২৫
"বন্যেরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে" এই প্রবাদটি মূলত বোঝায় যে, প্রত্যেক প্রাণি বা বস্তুকে তার উপযুক্ত পরিবেশে সবচেয়ে ভালো দেখায়। এই প্রবাদটির মাধ্যমে আরও বোঝানো হয় যে, স্থান বা পরিবেশ পরিবর্তন হলে, কোনো বস্তু বা প্রাণি তার স্বাভাবিক সৌন্দর্য বা কার্যকারিতা হারায়। প্রতিটি প্রাণি বা বস্তুর নিজস্ব পরিবেশ রয়েছে, যেখানে সে সবচেয়ে উপযুক্ত এবং সুন্দর থাকে। প্রবাদ বাক্য আর বাস্তবতার মধ্যে বিরাট ব্যবধান। এই ব্যবধানের আলোকে জানা যায়, আমাদের দেশ থেকে ইতোমধ্যে প্রায় অর্ধশতাধিক প্রাণি বিলুপ্ত হয়ে গেছে! ২০২৪ সালের মার্চ মাসে ওয়াইল্ডলাইফ অলিম্পিয়াডের উদ্বোধন উপলক্ষে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে সংবাদ সম্মেলনে তৎকালীন মন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরী বলেছেন, "নানান কারণে আমাদের পরিবেশ আজ সংকটাপন্ন। বুনোহাতির দল থেকে শুরু করে পাখি, এমনকি সাগরের তলদেশের প্রাণি হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে। ১০০ বছরে দেশ থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে ৩১ প্রজাতির বন্যপ্রাণি।"
প্রকৃতি সংরক্ষণবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচারের (আইইউসিএন) এক জরিপের তথ্য অনুযায়ী, আবাসস্থল হারিয়ে ক্রমেই হুমকির মুখে দেশের বন্যপ্রাণি। আবার বন উজাড়ে কমছে খাদ্যের জোগান। এমন নানান সংকটে উভচর, সরীসৃপ, পাখি ও স্তন্যপায়ী মিলে গত ১০০ বছরে দেশ থেকে ৩১ প্রজাতির বন্যপ্রাণি চিরতরে হারিয়ে গেছে। ঝুঁকির কাছাকাছি রয়েছে আরও ৯০ প্রজাতির প্রাণি। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাদ্য ও বাসস্থান সংকট, বন উজাড়, অপরিকল্পিত নগরায়ণসহ নানান কারণে বন্যপ্রাণি বিলুপ্ত হচ্ছে।
আইইউসিএনের ২০০০ সালের গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে বিলুপ্ত বন্যপ্রাণির প্রজাতির সংখ্যা ছিল ১৩। আর ২০১৫ সালের প্রতিবেদনে ৩১ প্রজাতির বন্যপ্রাণি বিলুপ্তর তথ্য দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ এই ১৫ বছরে বাংলাদেশ থেকে আঞ্চলিকভাবে বিলুপ্ত হয়েছে অন্তত ১৬ প্রজাতির প্রাণি।
আইইউসিএনের তালিকা অনুযায়ী দেশে মোট ৫৬৬ প্রজাতির পাখি ছিল একসময়। তবে ১০০ বছরের মধ্যে ১৯ প্রজাতির পাখি চিরতরে হারিয়ে গেছে। এ সময়ে বিলুপ্ত হয়েছে ১১ প্রজাতির স্তন্যপায়ী ও এক প্রজাতির সরীসৃপ। বিলুপ্ত হওয়া স্তন্যপায়ী প্রাণির মধ্যে রয়েছে ডোরাকাটা হায়েনা, ধূসর নেকড়ে, নীলগাই, বান্টিং বা বনগরু, বনমহিষ, সুমাত্রা গণ্ডার, জাভা গণ্ডার, ভারতীয় গণ্ডার, বাদা বা জলার হরিণ, কৃষ্ণষাঁড় ও মন্থর ভালুক। পাখির মধ্যে রয়েছে লালমুখ দাগিডানা, সারস, ধূসর মেটে তিতির, বাদা তিতির, বাদি হাঁস, গোলাপি হাঁস, বড় হাড়গিলা বা মদনটাক, ধলাপেট বগ, সাদাফোঁটা গগন রেড, রাজশকুন, দাগি বুক টিয়াঠুঁটি, লালমাথা টিয়াঠুঁটি, গাছ আঁচড়া ও সবুজ ময়ূর। আর সরীসৃপজাতীয় প্রাণির মধ্যে মিঠাপানির কুমির বাংলাদেশ থেকে হারিয়ে গেছে।
এমন বাস্তবতায় পালিত হয় বিশ্ব হাতি দিবস। ইন্টারন্যাশনাল এলিফ্যান্ট ফাউন্ডেশন (আইইএফ)-এর তথ্য মতে, পৃথিবীতে মাত্র ৪০ হাজার থেকে ৫০ হাজার হাতি অবশিষ্ট আছে। এর মধ্যে মাত্র ১৩টি দেশে এশীয় হাতির সংখ্যা টিকে আছে। ছোট কান, গোলাকার পিঠ এবং শুঁড়ের প্রান্তে একটি "আঙুল" থাকার জন্য পরিচিত, এশীয় হাতি হাজার হাজার বছর ধরে মানুষের সাথে বসবাস করে আসছে।
প্রকৃতপক্ষে বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ এশীয় হাতি কোনও না কোনওভাবে পরিচালিত যত্নে বাস করে, তা সে সংরক্ষিত সংরক্ষণাগারে, জাতীয় উদ্যানে বা মানুষের যত্নে। বাসস্থানের ক্ষতি এবং খণ্ডিতকরণ, সম্পদের জন্য প্রতিযোগিতা এবং ফলস্বরূপ মানুষ-বন্যপ্রাণি সংঘাত তাদের বেঁচে থাকার হুমকির মুখে ফেলছে। কিছু অঞ্চলে ভবিষ্যদ্বাণী করা হচ্ছে যে আগামী ১০ বছরের মধ্যে এশীয় হাতি আঞ্চলিকভাবে বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। যদিও আফ্রিকান ফরেস্ট হাতির প্রকৃত সংখ্যা অজানা। এরা পশ্চিম ও মধ্য আফ্রিকার ঘন বনাঞ্চলে বসবাসকারী হাতির নতুন স্বীকৃত প্রজাতি। এরা তাদের সাভানা ভাইদের চেয়ে খাটো, সোজা দাঁত সহ, কিন্তু এদের কান একই রকম বড় এবং শুঁড়ের শেষ প্রান্তে দুটি আঙুল রয়েছে। রাজনৈতিক নিরাপত্তাহীনতা, আবাসস্থলের ক্ষতি এবং চোরাশিকারের কারণে এদের বেঁচে থাকা হুমকির মুখে, কারণ চোরাশিকারিরা এদের হাতির দাঁতকে মূল্যবান বলে মনে করে।
বিভিন্ন মাধ্যমের তথ্য উপাত্ত পর্যালোচনা করে জানা গেছে, মানুষের হস্তক্ষেপের কারণে চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও ময়মনসিংহ অঞ্চলে দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে বন্য হাতির বিচরণক্ষেত্র। এসব অঞ্চলে কয়েক বছর ধরে হাতি-মানুষের দ্বন্দ্ব চরমে পৌঁছেছে। প্রাণহানি ঘটনাও ঘটেছে। গবেষকরা বলছেন, মানুষের সরাসরি হস্তক্ষেপে কমছে হাতির প্রাকৃতিক আবাস ও খাদ্যব্যবস্থাপনা। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশে বন্য হাতির অস্তিত্ব বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ দলবদ্ধ ও পরিবার নিয়ে চলাফেরা করা হাতির পালের জন্য খাদ্য ও পানির চাহিদা মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তৃণভোজী হাতির খাবারের মধ্যে রয়েছে নতুন ঘাস, গাছের পাতা, কলাগাছ, বাঁশ, গুঁড়ি, ফলমূল, গাছের বাকল ইত্যাদি। একটি হাতি প্রতিদিন ৪৫ কেজি থেকে ১০০ কেজি উদ্ভিদজাত খাবার খায়। প্রতিদিনকার খাদ্যগ্রহণের জন্য দিনে প্রায় ৩০ মাইল পর্যন্ত বন্য পরিবেশে নিজেদের করিডোরে পরিভ্রমণ করে থাকে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হাতির খাদ্য উদ্ভিদ ও গাছপালা যথাসময়ে খাবারের উপযোগী হচ্ছে না; এতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হাতিরা লোকালয়ে আবাদি জমির ফসল খেয়ে যাচ্ছে।
হাতি সংরক্ষণে জনসচেতনতা বাড়াতে ২০১২ সালে কানাডিয়ান চলচ্চিত্র নির্মাতা প্যাট্রিসিয়া সিমস, মাইকেল ক্লার্ক ও থাইল্যান্ডের এলিফ্যান্ট রিইন্ট্রোডাকশন ফাউন্ডেশনের প্রধান শিভাপর্ন দারদারানন্দ বিশ্ব হাতি দিবস পালন শুরু করেন। এরপর থেকে প্রতিবছর ১২ আগস্ট বিশ্ব হাতি দিবস পালিত হয়ে আসছে। বাংলাদেশেও সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে দিবসটি পালিত হয়। চলতি বছরে দিবসটির প্রতিপাদ্য হলো "আন্তরিক: মাতৃপতি এবং স্মৃতি"। এই প্রতিপাদ্যটি হাতিদের আবেগময় জীবনের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি এবং বিশেষ করে মাতৃপতিদের (স্ত্রী হাতির দলনেতা) জ্ঞান, নেতৃত্ব, স্মৃতি ও সুরক্ষার বিষয়টিকে তুলে ধরে।
হাতিদের হুমকির মুখোমুখি হওয়ার প্রধান কারণ হচ্ছে হাতির দাঁতের ব্যবসা। বলা হয়ে থাকে হাতির দাঁতের দাম সোনার চেয়েও দামি। এমন অনেকেই আছেন যারা হাতির দাঁতের তৈরি পণ্য ব্যবহার করতে পছন্দ করেন। হাতির দাঁত কে বলা হয় 'আইভরি'। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে হাতে তৈরি এসব শোপিস সংগ্রহ করেন। হাতি দাঁত থেকে সূক্ষ্ম শিল্প সামগ্রী তৈরি করা হয়। এক সময় হাতির দাঁতের জিনিস ঘরে থাকা সমৃদ্ধির অন্যতম লক্ষণ ছিল। বিশ্বজুড়েই সমৃদ্ধির অন্যতম নিদর্শন ছিল আইভরি বা হাতির দাঁত। ইংল্যান্ডের রাজপরিবারে একটা আস্ত ঘোড়ায় টানা গাড়ি রয়েছে, যেটি হাতির দাঁত দিয়ে তৈরি। এছাড়া চীনে হাতির দাঁতে তৈরি জিনিস ঘরে রাখাকে শুভ বলে মনে করা হয়।
এছাড়াও হাতির মাংস প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই জনপ্রিয়। ঐতিহাসিকভাবে কিছু আধুনিক আফ্রিকান শিকারি-সংগ্রাহক গোষ্ঠী ঐতিহ্যবাহী হাতি শিকারের অনুশীলন করে আসছে। আফ্রিকার কিছু অংশে হাতির মাংস ব্যাপকভাবে অবৈধভাবে বুশমিট হিসেবে বিক্রি করা হয়। হাতির মাংসের বৈশিষ্ট্য হলো এতে উচ্চ পরিমাণে চর্বি থাকে। যার মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য চর্বিযুক্ত অংশ হল পায়ের পাতার প্যাড। হাতির লম্বা হাড়গুলিতে উল্লেখযোগ্য মজ্জা গহ্বর থাকে না। হাতির মাংসের কাবাব আফ্রিকানদের খুব পছন্দের। তাদের বর্ণনায় হাতির মাংস আগুনে রান্না করলে শক্ত হয়ে যায়, তাই আগুনে পুড়িয়ে এটি খেতে সুস্বাদু এবং স্বাস্থ্যকর।
২০১৯ সালের অগাস্টে 'চামড়ার জন্যে এশিয়ান হাতি নিধন বাড়ছে' শিরোনামে বিবিসি বাংলায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, হাতির চামড়ার মূল্য প্রতি নিয়ত বাড়ছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, চীনে হাতির চামড়া দিয়ে এক ধরনের গুড়া তৈরি করা হয়। সেখানে অনেকেই মনে করেন হাতির চামড়ার ঔষধি গুণাবলী রয়েছে, যা দিয়ে আলসার, পাকস্থলীর প্রদাহ এমনকি ক্যান্সারও নিরাময় করা যায় বলে বিশ্বাস করেন চীনের অনেকে। হাতির চামড়ার নিচে যে চর্বি রয়েছে তা দিয়ে তৈরি হয় এক ধরনের ক্রিম যা ত্বকের প্রদাহ নিরাময়ে ঔষধ হিসেবে বিক্রি হয়। হাতির দাঁত ও চামড়া দিয়ে গহনাও প্রস্তুত হচ্ছে। কিছু দেশে এসব পণ্যের চাহিদা অনেক বেড়ে গেছে।
হাতি নিধনের বহু কারণ রয়েছে। পত্র-পত্রিকায় এসব বিষয়ে খবর প্রকাশিত হয়। বাংলাদেশে প্রাকৃতিক পরিবেশে যে প্রজাতির হাতি দেখা যায় তা হলো এশিয়ান এলিফ্যান্ট, বা এশীয় হাতি। এই প্রজাতি বর্তমানে বিপন্ন হওয়ায় এটি এ দেশের বন্যপ্রাণি সংরক্ষণের জন্য একটি গুরুতর উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তরাঞ্চলের এলাকায়। প্রাণিবিদদের মতে, পৃথিবীর সর্ববৃহৎ স্থলচর স্তন্যপায়ী প্রাণি হাতি। এদের কিস্টোন স্পিসিস বা আমব্রেলা স্পিসিসও বলা হয়। অর্থাৎ একটি হাতি বনে ছাতার মতো কাজ করে। হাতি টিকে থাকলে বনও টিকে থাকবে। বন টিকে থাকার অর্থই হলো হাজারো জীববৈচিত্র্যের জীবন বেঁচে যাওয়া। হাতির অস্তিত্ব সন্দেহাতীতভাবে হুমকির সম্মুখীন। এই সংকট একদিনে সৃষ্টি হয়নি। প্রাথমিকভাবে এই সংকট সমাধান করা হয়নি বা যায়নি। হাতি সুরক্ষায় সংশ্লিষ্টদের হস্তক্ষেপ জরুরি।
মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।
আপনার মন্তব্য