টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।
Advertise
শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ | ০৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
বাংলাদেশের জাতীয় প্রতীকসমূহ বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাংস্কৃতিক জীবনধারা ও আদর্শের প্রতিনিধিত্ব করে। এই ধারায় বাংলাদেশের জাতীয় পশু রয়েল বেঙ্গল টাইগার। পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সাইবেরীয় বাঘের পর বেঙ্গল টাইগার দ্বিতীয় বৃহত্তম উপপ্রজাতি। বাংলাদেশের ২০১২ খ্রিস্টাব্দের বন্যপ্রাণি সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইনের তফসিল-১ অনুযায়ী এ প্রজাতিটি সংরক্ষিত। কয়েক দশক আগেও বাংলাদেশের প্রায় সব অঞ্চলে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের বিচরণ ছিল। পঞ্চাশের দশকেও বর্তমান মধুপুর এবং ঢাকার গাজীপুর এলাকায় এই বাঘ দেখা যেত। মধুপুরে সর্বশেষ দেখা গেছে ১৯৬২ এবং গাজীপুরে ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে।
বাঘের আটটি উপপ্রজাতির মধ্যে ৫টি এখনো জীবিত। বেঙ্গল টাইগার আছে বাংলাদেশ, ভারত, ভুটান, নেপাল, চীন ও পশ্চিম মিয়ানমারে; আমুর বা সাইবেরীয় বাঘ সাইবেরিয়া, মাঞ্চুরিয়া ও উত্তর চীনে; দক্ষিণ চীনের বাঘ কেবল চীন দেশে; সুমাত্রার বাঘ সুমাত্রায় এবং ইন্দোচীন বাঘ কাম্পুচিয়া, চীন, লাওস, মালয়, পূর্ব-মায়ানমার, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামে। গত পঞ্চাশ বছরে বাঘের যে ৩টি প্রজাতি লোপ পেয়েছে তা হলো জাভার বাঘ, বালির বাঘ ও কাস্পিয়ান বাঘ। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বনে-জঙ্গলে এখন বাঘের সংখ্যা ৩ হাজারেরও কম। বাংলাদেশ ৩৬২, ভুটানে ৬৭ থেকে ৮১, চীনে ১১০ থেকে ১৪০, ভারতে ২৫০ থেকে ৩৭৫, মিয়ানমারে ২৩০ থেকে ৪৬৫, নেপালে ৯৩ থেকে ৯৭, রাশিয়ায় ৩৩০ থেকে ৩৩৭, ভিয়েতনামে ২০০, কাম্পুচিয়ায় ১৫০ থেকে ৩০০, লাওসে ও উত্তর কোরিয়ায় আনুমানিক ১০, থাইল্যান্ডে ২৫০ থেকে ৫০১, মালয়েশিয়ায় ৪৯১ থেকে ৫১০ এবং ইন্দোনেশিয়ায় ৪০০ থেকে ৫০০।
সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ ম্যানগ্রোভ অরণ্যের বেশির ভাগই বাংলাদেশে অবস্থিত। এই ম্যানগ্রোভ অরণ্যে পৃথিবীখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগারদের অবাধ বিচরণভূমি। তাদের এই অবাধ বিচরণে সীমান্তের কোনও বাধা নেই। ফলে এতদিন বাংলাদেশ-ভারত মিলিয়ে গোটা সুন্দরবন এলাকায় মোট কতটি বাঘ আছে, তার প্রকৃত তথ্য পাওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। বাঘ সংরক্ষণে বিশেষ অগ্রাধিকার কর্মসূচি ও আন্তর্জাতিক স্বাক্ষরিত প্রটোকল অনুসারে সুন্দরবনের বাঘ রক্ষার জন্য বন বিভাগ কাজ করে যাচ্ছে। চলমান তথ্য-উপাত্ত ও বাঘ বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনার প্রেক্ষিতে জানা যায়, বাংলাদেশের সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা দ্বিগুণ করার কোনো সুযোগ নেই। তবে আন্তর্জাতিক ঘোষণা অনুসারে সুন্দরবনে বাঘ ও হরিণের সংখ্যা ধারণক্ষমতায় রেখে অবৈধ হরিণ শিকার বন্ধ, আবাসস্থলের উন্নয়ন ও নিয়মিত টহল প্রদান করে বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য যথোপযুক্ত উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
"বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ২০৭৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে বিশ্বখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগার হারিয়ে যেতে পারে সুন্দরবন থেকে" এমন আশঙ্কাজনক তথ্য উঠে এসেছে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিবেদন গুলোতে। অস্ট্রেলিয়া ও বাংলাদেশের বিজ্ঞানীদের যৌথ গবেষণায় বলা হয়েছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও বনের ভূমি নিম্নস্তরে থাকার ফলে বাঘের আবাসস্থল হারিয়ে যাচ্ছে। গবেষণার চিত্র ভয়াবহ- ২০৭০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে বাংলাদেশ অংশে বাঘের জন্য উপযুক্ত আবাস থাকবে না। ২০৫০-৭৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ১১.৩ শতাংশ পর্যন্ত আবাস হারিয়ে যেতে পারে।
২০১৯ খ্রিস্টাব্দে 'সায়েন্স অব দ্য টোটাল এনভায়রনমেন্ট'-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আগামী ৫০ বছরের মধ্যে হারিয়ে যাবে বিশ্ব-ঐতিহ্য সুন্দরবনের বিশ্বখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগার। বনের বাংলাদেশ অংশে বাঘের এই বিলুপ্তি বিশেষভাবে ঘটার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে বলে জানানো হয়েছে এক নতুন গবেষণায়। প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ও অস্ট্রেলিয়ার বিজ্ঞানীদের একটি দল তাদের 'জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং সাগরের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশ অংশে সুন্দরবনের বিপন্ন বাঘ' শীর্ষক গবেষণায় এই তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণায় বলা হয়, ক্রমাগত সাগরের পানি বাড়ার কারণে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে অবস্থিত সুন্দরবনের বাসিন্দা রয়েল বেঙ্গল টাইগারের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ছে।
এই গবেষণাপত্রটির অন্যতম লেখক এবং জেমস কুক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বিল লরেন্স। তিনি লিখেছেন, "বর্তমানে ৪ হাজারের বেশি বাঘ সুন্দরবনে রয়েছে। এক সময় এই সংখ্যাটি আরও বেশি ছিলো। এখন প্রকৃতপক্ষে সংখ্যায় এটি খুবই কম।"
গবেষণাপত্রের মূল লেখক এবং ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ (আইইউবি)-র সহকারী অধ্যাপক ড. শরিফ মুকুল জানান, "বাংলাদেশ এবং ভারত মিলিয়ে সুন্দরবনের ১০ হাজার কিলোমিটারের বেশি এলাকা নিয়ে গঠিত প্যারাবনটি সারাবিশ্বে সুন্দরবন হিসেবে পরিচিত। এটিই পৃথিবীর একক বৃহত্তম প্যারাবন। তবে এখানে বাঘদের টিকে থাকার জন্যে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। আমাদের পর্যালোচনায় দেখা গেছে যে আগামী ৫০ বছরে তথা ২০৭০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আবাসস্থল সুন্দরবন বিলুপ্ত হয়ে যাবে।"
অধ্যাপক বিল লরেন্সের মতে, বন ধ্বংসের পেছনে জলবায়ু পরিবর্তন ছাড়াও আরও কারণ হলো- বনাঞ্চলের পাশে কলকারখানা স্থাপন, নতুন রাস্তা তৈরি এবং নির্বিচার শিকার। তিনি বলেন, "একদিকে, মানুষের আগ্রাসন এবং অন্যদিকে, জলবায়ু পরিবর্তন বাঘের আবাসস্থলকে সঙ্কটাপন্ন করে ফেলেছে।" তবে বন ও বাঘ রক্ষার ক্ষেত্রে এখনো আশা রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে গবেষণাটিতে। অধ্যাপক লরেন্স বলেন, "শিকার বন্ধ করার পাশাপাশি সুন্দরবনকে সংরক্ষণ করলে সেখানকার প্রাণিগুলো পরিবর্তিত পরিবেশের সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে পারবে।"
বাঘ সংরক্ষণের গুরুত্ব অপরিসীম। বাঘ একটি 'আমব্রেলা স্পেসিজ' যার অর্থ হলো, বাঘকে সংরক্ষণ করলে তার বিস্তীর্ণ আবাসস্থলও সংরক্ষিত হয়, যা পরোক্ষভাবে সেই অঞ্চলের অসংখ্য উদ্ভিদ ও প্রাণি প্রজাতিকে সুরক্ষা দেয়। সুন্দরবনের মতো একটি জটিল ও সংবেদনশীল প্রতিবেশ ব্যবস্থার জন্য বাঘের উপস্থিতি অত্যাবশ্যক। বাঘের অভাবে হরিণ ও শূকরের সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যেতে পারে, যা বনের বৃক্ষলতা ও চারাগাছের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং দীর্ঘমেয়াদে বনের কাঠামো ও উদ্ভিদ বৈচিত্র্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এটি শুধু বনের ওপর নির্ভরশীল প্রাণিদের জীবনকেই নয়, বরং বনের ওপর নির্ভরশীল উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকাকেও হুমকির মুখে ফেলে। তাই বলা হয়, "বাঘ বাঁচলে বন বাঁচে, বন বাঁচলে মানুষ বাঁচে।" এ কারণে বলা যেতে পারে, বাঘ সংরক্ষণ মানে সুন্দরবন সংরক্ষণ, আর সুন্দরবন সংরক্ষণ মানে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলের পরিবেশ, প্রতিবেশ এবং অর্থনীতির স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা।
বাঘ সংরক্ষণে আমরা যতই এগিয়ে যাই না কেন, সামনে রয়েছে অনেক চ্যালেঞ্জ। সুন্দরবনে চোরাশিকার নির্মূল হয়নি। আন্তর্জাতিক বন্যপ্রাণি পাচার চক্র এখনো সক্রিয়। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সুন্দরবনের পরিবেশে বিরূপ প্রভাব পড়ছে। এছাড়া বাঘ ও মানুষের মধ্যে দ্বন্দ্বও একটি বড় সমস্যা, বিশেষ করে যখন বাঘ লোকালয়ে ঢুকে পড়ে বা মানুষ অবৈধভাবে বনে প্রবেশ করে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারের পাশাপাশি সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের সচেতনতা ও অংশগ্রহণ প্রয়োজন। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে বাংলাদেশ টাইগার অ্যাকশন প্ল্যান (২০১৮-২০২৭) প্রণয়ন করেছে, যার আওতায় বাঘ সংরক্ষণ, গবেষণা, নজরদারি এবং বাঘ-মানুষ দ্বন্দ্ব হ্রাসে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
প্রাচীনকাল থেকে হিংস্র বন্যপ্রাণি শিকার করাকে গৌরবের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এ ভয়ংকর ধারণা এবং গৌরবের আশায় শিকারিরা বহু আগে থেকে রয়েল বেঙ্গল শিকারের নেশায় পড়েছে। বাঘের চামড়া, দাঁত, লোম, কঙ্কাল প্রভৃতিকে বহু রোগের মহৌষধ হিসেবে প্রচার করে চড়া দামে কালোবাজারে বিক্রি করা হচ্ছে। এছাড়া বন ধ্বংস করে বসতি স্থাপনের সময় বাঘের আস্তানার দেখা পেলে মানুষ বাঘ হত্যা করছে। গত শতাব্দীতে এভাবেই ভারতীয় উপমহাদেশে প্রায় ৯৭ শতাংশ বাঘ হারিয়ে গেছে। বর্তমানে যে অল্পসংখ্যক বাঘ বেঁচে আছে, তারাও দ্রুত হারে হ্রাস পাচ্ছে। আবার জলবায়ু বদলের কারণে সমুদ্রের পানির উচ্চতা বাড়ছে। ফলে বাঘের আবাসস্থল ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে।
শক্তি, সাহস ও সৌন্দর্যের প্রতীক হচ্ছে 'বাঘ'। জীববৈচিত্র্যে রক্ষায় বাঘের ভূমিকা অপরিসীম। বাঘ বাংলাদেশের জাতীয় পশু হওয়া সত্বেও এটির রক্ষণাবেক্ষণের সুষ্ঠু পদক্ষেপ নেই। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় যে প্রাণিটির অবদান অপরিসীম, সে নিজেই এখন নিরাপত্তাহীনতায়!
মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।
আপনার মন্তব্য