টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।
Advertise
শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ | ১৭ জানুয়ারী, ২০২৬
বন্যপ্রাণি সংক্রান্ত খবর প্রায় প্রতিদিন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এসব খবরের অধিকাংশই সুখকর নয়। যেমন, কোথাও হাতি মারা গেছে, কোথাও হরিণের মাংস বিক্রি হতে দেখা গেছে আবার কোথাও বা প্রাণির উপর বর্বরতার ঘটনা ঘটছে। এসব খবর পত্রিকায় প্রকাশ হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যথাযথ দৃষ্টি গোচর হয় না। ফলে, সমস্যা নিরসনের বদলে সমস্যা আরও সংকটাপন্ন হয় এবং এটাই বাস্তবতা। এমন বাস্তবতায় আমরা জেনেছি সুন্দরবনের ভেতরে হরিণ ধরতে চোরা শিকারিদের পাতা ফাঁদে বাঘ আটকে পড়ার খবর। গত তিন জানুয়ারির ঘটনা এটি। পত্রিকান্তরে জানা গেছে, তিন জানুয়ারি (শনিবার) দুপুরের পর বন বিভাগের কাছে খবর আসে, হরিণ শিকারের ফাঁদে একটি বাঘ আটকে আছে। সুন্দরবনের ওই এলাকাটি বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার বৈদ্যমারী ও জয়মনি বাজারের মাঝামাঝি। বন বিভাগের কর্মীরা সেখানে গিয়ে বাঘটি আটকে থাকার বিষয়ে নিশ্চিত হন। বাঘটিকে উদ্ধারের জন্য ঢাকা থেকে ভেটেরিনারি সার্জনসহ বিশেষজ্ঞ দল ও খুলনা থেকে বন্য প্রাণি ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের কর্মকর্তারা আসেন। বন বিভাগের বন্য প্রাণি ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের খুলনা কার্যালয় সংবাদ মাধ্যমকে জানায়, রোববার দুপুর আড়াইটার দিকে বাঘটিকে ট্রাঙ্কুইলাইজার দিয়ে অচেতন করা হয়। উদ্ধারের পর এটিকে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
এই খবরটি একটু মনোযোগ দিয়ে পড়লে বেশ কয়েকটি বিষয়ে সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। যেমন; এক. বন বিভাগ এই খবরটি জেনেছে স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে, অর্থাৎ এসব এলাকায় তাঁদের নিয়মিত টহল নেই। দুই. বাঘটিকে উদ্ধারের জন্য ভেটেরিনারি সার্জনসহ বিশেষজ্ঞ দলকে যেতে হয়েছে ঢাকা থেকে, অর্থাৎ বন বিভাগের খুলনা রেঞ্জ আওতাধীন এলাকায় একজনও ভেটেরিনারি চিকিৎসক নেই। তিন. ঘটনাটি জানা গেছে ০৩ জানুয়ারি, আর বন বিভাগের পক্ষ থেকে সেটি উদ্ধার করা হয়েছে ০৪ জানুয়ারি দুপুরের পর, অর্থাৎ এসব ব্যাপারে তড়িৎ কোনো ব্যবস্থা নেয়ার লোকবল-প্রশিক্ষণ কিংবা প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি কর্তৃপক্ষের কাছে নেই বা থাকে না। চার. বাঘটি ঠিক কতদিন আগে আটকা পড়ে সেটা নির্দিষ্টভাবে জানা যায়নি।
সুন্দরবনে শিকারিচক্র সদা তৎপর। হরিণ শিকারে তাদের তৎপরতা সম্পর্কে কম-বেশি সবাই অবগত থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে শিকারিচক্র ধাপে ধাপে অগ্রসর হয়েছে এবং হচ্ছেন। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে বাঘের চামড়া, হাড়, দাঁতসহ অন্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। সেই কারণে চোরাশিকারিরা দীর্ঘদিন ধরে সুন্দরবনের বাঘ শিকার করছে। বনদস্যুরাও এখন সুন্দরবনের বন্যপ্রাণিও শিকার করছে। চীন ও পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে বাঘের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের চাহিদা থাকায় সুন্দরবন থেকে বাঘের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বন্যপ্রাণি পাচার চোরাচালানকারীদের বেশ লক্ষ্য রয়েছে।
বনবিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০২২ সালের ২৩ মার্চ 'সুন্দরবন বাঘ সংরক্ষণ প্রকল্প' শীর্ষক একটি প্রকল্পের অনুমোদন দেয় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়। যার ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩৫ কোটি ৯৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা। এ প্রকল্পের দুটি অংশ রয়েছে। যার একটি হলো বাঘ জরিপ ও অন্যটি বাঘ সংরক্ষণ। এই প্রকল্পের সফলতা নিয়ে তখনই প্রশ্ন তোলা যায়, যখন সুন্দরবনের ভেতর থেকে বাঘের মরদেহ উদ্ধারের খবর পাওয়া যায়। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময়ে বাগেরহাটে সুন্দরবনের ভেতর থেকে একটি বাঘের মরদেহ উদ্ধার করে বন বিভাগ। সুন্দরবনের–পূর্ব বন বিভাগের শরণখোলা রেঞ্জের কচিখালীর টাইগার পয়েন্ট এলাকার অদূরে বনের ভেতর থেকে বাঘটির মরদেহ উদ্ধার করার খবর পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষণায় জানা গেছে, পৃথিবীতে জুড়ে বাঘের মোট নয়টি উপপ্রজাতি ছিল। গত শতাব্দীতে তিনটি উপপ্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বাকিগুলোর মধ্যে সুন্দরবনের বাঘ স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের। দুই হাজার ৬০০ বছর ধরে এই বাঘ সুন্দরবনসহ বাংলাদেশ ও ভারতের উপকূলীয় এলাকায় টিকে আছে। বাংলাদেশের বাঘ সংরক্ষণে যারা কাজ করছেন তারা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন ও মনুষ্যসৃষ্ট সমস্যার কারণে বাংলাদেশে বাঘের সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক আবাসস্থল সুন্দরবন নিজেই এখন হুমকিতে। অবৈধ শিকারের কারণে বাংলাদেশের বাঘ এখনো বড় ধরনের ঝুঁকিতে। দীর্ঘদিন ধরে চোরাশিকারিরা শিকার করে চামড়া, হাড়সহ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পাচার করে আসছে।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক অলাভজনক সংস্থা 'ট্রাফিক' ২০১৯ সালের শেষার্ধে এক প্রতিবেদনে বলেছে, গত চার বছর ধরে সুন্দরবনে বাংলাদেশ অংশে বাঘ হত্যার এই চিত্র দেখা যাচ্ছে। প্রতিবেদনে তারা উল্লেখ করেছে, বাংলাদেশে খুব অল্প সংখ্যায় বাঘ অবশিষ্ট থাকলেও চামড়া, দাঁত, হাড়, মাথার খুলি ও অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গের জন্য বাঘ হত্যার প্রবণতা বাড়তির দিকে। গত ২০ বছরে বাংলাদেশে ৫১টি বাঘ হত্যা করা হয়েছে। ২০১৫ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যের সময়টাতে প্রতিবছর গড়ে ৩ দশমিক ১টি বাঘ চোরা শিকারিদের হাতে প্রাণ হারিয়েছে। ২০০০ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে বছরে গড়ে ২টি বাঘ শিকারের ঘটনার প্রমাণ পাওয়া গেছে। 'ট্রাফিক' ২০২৫ সালের জুলাই মাসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে বলেছে, পাচারের তীব্র ঝুঁকিতে সুন্দরবনের বাঘ। তাদের জরিপ অনুযায়ী আন্তর্জাতিক পাচারচক্রের কাছে বন্যপ্রাণির অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া বন্যপ্রাণিদের একটি বড় অংশের উৎস সুন্দরবন ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকা। পাচার হওয়া বন্যপ্রাণিদের তালিকায় রয়েছে বাঘ, কুমির, হরিণ, সাপ, তক্ষক, কচ্ছপ ও হাঙ্গর।
বিভিন্ন মাধ্যম থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সুন্দরবনের বাঘ হত্যায় একাধিক সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয়। চোরাশিকারিরা সুন্দরবনে বিভিন্নভাবে বাঘ হত্যা করে। 'গডফাদার বা মহাজন'-এর কাছ থেকে অগ্রিম 'দাদন' নিয়ে ছদ্মবেশে বনে ঢোকে একশ্রেণির শিকারি। কখনও গুলি করে, আবার কখনও ফাঁদে আটকে বাঘ শিকার করে তারা। ছাগল বা হরিণ মেরে সেগুলোর শরীরে বিষ মেখে বাঘের খাবার হিসেবে বনে ফেলে রাখা হয়। বাঘ এসব বিষমাখা মৃতপ্রাণি খেয়ে বিষের প্রতিক্রিয়ায় মারা যায়, আর তা না হলে মুমূর্ষু হয়ে পড়ে। তখন সহজে হত্যা করা হয়। মৃত বাঘের শরীর থেকে চোরা শিকারিরা চামড়া, মাংস, চর্বি, মাথার খুলি, দাঁত, পুরুষাঙ্গ, হাড়সহ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংগ্রহ করে। এরপর আন্তর্জাতিক চোরাকারবারিদের কাছে এসব চড়া দামে বিক্রি করে।
যুক্তরাজ্যের কেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়, ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন, নটিংহাম টেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচজন গবেষক সুন্দরবনের বেঙ্গল টাইগারের জিনগত বৈশিষ্ট্য নিয়ে একটি গবেষণা করেন। গবেষণায় বলা হয়, সুন্দরবনের বাঘের বিশেষত্ব হলো এদের ম্যানগ্রোভ পরিবেশে টিকে থাকার অসাধারণ অভিযোজন, যেমন দক্ষ সাঁতারের ক্ষমতা, লবণাক্ত জল সহ্য করার ক্ষমতা এবং কাদামাটি ও ঘন জঙ্গল ভেদ করে চলাচলের পদ্ধতি। এছাড়া এরা পরিবেশের সঙ্গে মিশে থাকার জন্য পারদর্শী। পৃথিবীর অন্যান্য বাঘের চেয়ে সুন্দরবনের বাঘ আকারে কিছুটা ছোট হয়ে এই প্রতিকূল পরিবেশে নিজেদের মানিয়ে নিয়েছে, যা তাদের বিশ্বের অন্যান্য বাঘের তুলনায় রয়েল বেঙ্গল টাইগারকে স্বতন্ত্র করে তোলে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, জিনগত বৈশিষ্ট্য পর্যালোচনা করে প্রমাণ পাওয়া গেছে, এ ধরনের বাঘ বিশ্বের আর কোথাও নেই।
সুন্দরবন বিশ্বের বৃহত্তম শ্বাসমূলীয় বন। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলসহ বিশ্বের অনেক দেশের সমুদ্র উপকূলে এমন অনেক শ্বাসমূলীয় বা ম্যানগ্রোভ বন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকলেও সুন্দরবন তাদের বৃহত্তম। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো, এই বন জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশের অন্যতম প্রাকৃতিক ঢাল। বিশেষজ্ঞদের মতে, গত ৩০ বছরে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বঙ্গোপসাগর উপকূলে যতবার আঘাত হেনেছে, তাতে সুন্দরবন যদি ঢাল হয়ে না দাঁড়াত তাহলে গোটা বাংলাদেশই অস্তিত্ব সংকটে পড়ত। শুধু প্রাকৃতিক সম্পদেরই নয়, বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতিও এই দেশকে সামাল দিতে হতো। দুঃখজনক হলেও বাস্তবতা হচ্ছে, গত ২৫ বছরে সুন্দরবনের আয়তন কমেছে ১০ হাজার ৯৮০ হেক্টর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভাঙনের কারণে প্রতি বছর ৬ কিলোমিটার বনের আয়তন কমছে। গত ৩৭ বছরে ১৪৪ কিলোমিটার আয়তন কমেছে। ২০০৭ সালের সিডরে সুন্দরবনের প্রায় ৪০ শতাংশ ক্ষতি হয়। ১৯৫৯ সালে সুন্দরবনে প্রতি হেক্টরে সুন্দরী গাছের সংখ্যা ছিল ২১১টি। ২০২০ সালে এই সংখ্যা এসে দাঁড়ায় ৮০টিতে। এছাড়া বনের বিভিন্ন প্রাণিও অস্তিত্ব সংকটে রয়েছে। অস্তিত্ব সংকটে রয়েছে বাংলাদেশের জাতীয় পশুটিও।
সুন্দরবন এবং সুন্দরবনের বাঘ—দুটোই আমাদের জন্য একাধারে গর্বের স্মারক এবং ধারক। প্রকৃতি সংরক্ষণ বিষয়ক সংস্থাগুলোর আন্তর্জাতিক জোট 'আইইউসিএন'-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মানবসৃষ্ট কারণ, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও চরম আবহাওয়া পরিস্থিতির কারণে পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি ম্যানগ্রোভ বন ধ্বংস হওয়ার ঝুঁকিতে। আমরা প্রায় প্রতিদিন পত্রিকার পাতায় সুন্দরবন সংশ্লিষ্ট খবর দেখি। আমরা দেখছি, সুন্দরবনে ক্রমাগত বাঘ নিধন হচ্ছে। সব ঘটনা যে পত্রিকার প্রকাশ হয় বা সাধারণ মানুষের নজরে আসে তা নয়। গ্লোবাল টাইগার ফোরাম (জিটিএফ)-এর সর্বশেষ তথ্যমতে, বাংলাদেশে বর্তমানে বাঘের সংখ্যা মাত্র ১৪৬টি। বাঘের চামড়া ও বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পাচার রোধে 'বাংলাদেশ টাইগার অ্যাকশন প্ল্যান' নামে সরকারের এক বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে। আমরা আশা করবো বিষয়গুলোর প্রতি সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিরা প্রয়োজনীয় পন্থা অবলম্বন করবেন। দেশের সম্পদ রক্ষা করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। আমরা কোনোভাবেই বাঘবন্দি হট্টগোল পুনরাবৃত্তি চাই না।
মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।
আপনার মন্তব্য