আজ রবিবার, ০২ অক্টোবর, ২০২২ ইং

Advertise

রেমিট্যান্স নিয়ে আমাদের যে ধারণা ভুল

শামীম আহমেদ  

পৃথিবীর যে ১০টা দেশ সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স গ্রহণ করে তার মধ্যে বাংলাদেশ অষ্টম। ক্রমানুসারে প্রথম ১০ টা দেশ হচ্ছে: ভারত, চীন, মেক্সিকো, ফিলিপিন্স, মিশর, পাকিস্তান, ফ্রান্স, বাংলাদেশ, জার্মানি ও নাইজেরিয়া। কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হচ্ছে ফ্রান্স ও জার্মানির মতো উন্নত ইউরোপিয়ান দেশও রেমিট্যান্স গ্রহীতার কাতারে শীর্ষে অবস্থান করছে। তার মানে শুধু উন্নয়নশীলই নয়, উন্নত দেশও রেমিট্যান্স গ্রহণ করতে পারে।

রেমিট্যান্সের অর্থনৈতিক ও আক্ষরিক অর্থ যাই হোক না কেন, আমরা ইদানিং রেমিট্যান্স বলতে বুঝাই এক দেশের মানুষ যখন অন্য দেশে কাজ করে সেই দেশ থেকে আয় করা উপার্জন আমেরিকান ডলারে নিজের দেশে পরিবারের কাছে পাঠান। এখানে খেয়াল রাখা জরুরি একজন মানুষ যে দেশেই কাজ করুক না কেন নিজেদের দেশের টাকা পাঠানোর সময় বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতার কারণে তাকে মূলত আমেরিকান ডলারে রূপান্তর করেই দেশে পাঠাতে হয়। দেশে পাঠানোর পর সেই টাকা আবার তাদের সরকার রেখে দিয়ে সমমূল্যের নিজস্ব মুদ্রা তার পরিবারকে নির্দেশ অনুসারে দিয়ে দেবে।

আমরা অনেক সময় এমনভাবে আলোচনা করি যে প্রবাসীরা যেন সরকারকে দান-খয়রাত করে। প্রবাসীরাও এমন একটা ভাব করে যে আমার টাকায় দেশ চলছে, আমিই সরকারকে টাকা পাঠাই। আসলে ব্যাপারটা তা নয়। প্রবাসীরা মূলত তার টাকা নিজের পরিবারের কাছেই পাঠান, কিন্তু যেহেতু বিনিময় মুদ্রা হিসেবে আমেরিকান ডলারের একচ্ছত্র আধিপত্য তাই প্রবাসীদের পাঠানো আমেরিকান ডলার রেখে সরকার তাকে বা তার পরিবারকে বাংলাদেশি টাকা দিয়ে রেখে দেয়া আমেরিকান ডলার দিয়ে আবার বহির্বিশ্ব থেকে চাল, ডাল, তেলসহ সকল প্রয়োজনীয় পণ্য কিনে আনেন। সরকার যেই পণ্য কিনে আনেন তাও আবার স্থানীয় মুদ্রায় সাধারণ মানুষই কিনে নেন। আর প্রবাসীরা দেশে রেমিট্যান্স না পাঠিয়ে তাদের পরিবারকে টাকা-পয়সা দেওয়ারও কোন ভিন্ন পন্থা নাই। তাই বিদেশ থেকে প্রচুর টাকা আসলে দেশের জন্য ভাল, কিন্তু তাতে প্রবাসীদের ব্যাপক ভাব দেখানোরও মূলত কিছু নাই। তারা যা করে নিজেদের স্বার্থেই করে, তাও সরকার ও দেশবাসী তাদেরকে ধন্যবাদ জানায়।

এখানে আরেকটা বিষয়ও খেয়াল রাখা দরকার, আমরা দেশের মানুষরা সাধারণত যাদের সোনার টুকরা ছেলে মেয়ে বলে আমেরিকা, ক্যানাডা, ইংল্যান্ড বা অস্ট্রেলিয়া পাঠাই, সেই সোনার টুকরা ছেলেমেয়েরা দেশে টাকা কমই পাঠায়। উপরন্তু তারা দেশে আয় করা টাকাই শুধু নয়, দেশে বাবা-মায়ের সম্পত্তিও বিক্রি করে সেই টাকা বিদেশে নিয়ে যায়। অন্যদিকে যাদের আমরা তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করি সেই অল্পশিক্ষিত অর্ধশিক্ষিত শ্রমিক শ্রেণির মানুষেরা হাড়-ভাঙা পরিশ্রম করে দেশে তাদের অর্জিত আয়ের পুরোটা পাঠিয়ে দেন। এই মুহূর্তে শুধু মধ্যপ্রাচ্যে ৮০ লক্ষ বাংলাদেশি শ্রমিক আছেন যারা বছরের পর বছর পরিবার-পরিজন ছাড়া কাজ করে দেশে টাকা পাঠিয়ে যাচ্ছেন।

রেমিট্যান্স নিয়ে ভ্রান্ত ধারণার কারণে আমরা প্রায়শ এটা নিয়ে প্রয়োজনের চাইতে বেশি মাতামাতি করি। ফ্রান্স বা জার্মানির রেমিট্যান্স আয় বার্ষিক ২০ বিলিয়ন আমেরিকান ডলারের মত হলেও তা তাদের জিডিপির ১ শতাংশেরও কম। অন্যদিকে পাকিস্তান বা ফিলিপিন্সের রেমিট্যান্স আয় বার্ষিক ৩০ বিলিয়ন আমেরিকান ডলারের কাছাকাছি হলেও তা তাদের জিডিপির প্রায় ১০ শতাংশ। বাংলাদেশের রেমিট্যান্স ২০২১ সালে ২২ বিলিয়ন আমেরিকান ডলার ছিল যা আমাদের জিডিপির ৬ শতাংশের মতো। অর্থাৎ এই আয় বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও, এটা ছাড়া যে দেশের একদমই চলবে না, তা নয়। তবে এই আয় বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মূলত আমেরিকান ডলারে পাওয়ার জন্য যা দিয়ে আমাদের অন্যান্য পণ্য আমদানি করতে সুবিধা হয়।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি বলেছেন, আমাদের প্রবাসীদের আয়ের উপর নির্ভরতা কমিয়ে রপ্তানি আয় বাড়াতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর এই কথাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ তিনি যা বলেন তা অত্যন্ত ভেবেচিন্তে এবং ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করেই বলেন। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কারণে সামনের দিনগুলোতে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অদক্ষ শ্রমিকের কাজের সুযোগ কমতে থাকবে। এছাড়াও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কখনওই দেশের উন্নয়নে কোন একটি নির্দিষ্ট খাতকে একচ্ছত্র প্রাধান্য দিতে অনিচ্ছুক।

কেউ যদি নিজেদের অবশ্যম্ভাবী ভাবা শুরু করে, তিনি তার বিকল্প তৈরি করে নেন। দেশের ভবিষ্যৎ সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য তার এই বক্তব্য অনেকটা দিক-নির্দেশনার মতো। আমার বিশ্বাস তিনি যেহেতু এই কথাটি বলেছেন, আগামী ৫-৭ বছরে আমরা আমাদের রপ্তানি খাতে কিছু উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ও পরিবর্ধন দেখতে পারব। আমাদের দেশের ক্রমবর্ধমান ‘স্টার্ট-আপ’ বিজনেসগুলোও একে একটি পজিটিভ ইঙ্গিত ধরে নিয়ে তাদের ছোট ব্যবসাকেও রপ্তানিমুখী করার পরিকল্পনা নিতে পারে এখনই।

শামীম আহমেদ, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও সামাজিক-বিজ্ঞান গবেষক।

মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।

আপনার মন্তব্য

লেখক তালিকা অঞ্জন আচার্য অধ্যাপক ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী ৪৫ অসীম চক্রবর্তী আজম খান ১০ আজমিনা আফরিন তোড়া ১০ আফসানা বেগম আবদুল গাফফার চৌধুরী আবু এম ইউসুফ আবু সাঈদ আহমেদ আব্দুল করিম কিম ৩০ আব্দুল্লাহ আল নোমান আব্দুল্লাহ হারুন জুয়েল ১০ আমিনা আইরিন আরশাদ খান আরিফ জেবতিক ১৭ আরিফ রহমান ১৬ আরিফুর রহমান আলমগীর নিষাদ আলমগীর শাহরিয়ার ৫৩ আশরাফ মাহমুদ আশিক শাওন ইনাম আহমদ চৌধুরী ইমতিয়াজ মাহমুদ ৬৮ ইয়ামেন এম হক একুশ তাপাদার এখলাসুর রহমান ৩০ এনামুল হক এনাম ৩৫ এমদাদুল হক তুহিন ১৯ এস এম নাদিম মাহমুদ ৩৩ ওমর ফারুক লুক্স কবির য়াহমদ ৫৮ কাজল দাস ১০ কাজী মাহবুব হাসান কেশব কুমার অধিকারী খুরশীদ শাম্মী ১৬ গোঁসাই পাহ্‌লভী ১৪ চিররঞ্জন সরকার ৩৫ জফির সেতু জহিরুল হক বাপি ৪৪ জহিরুল হক মজুমদার জাকিয়া সুলতানা মুক্তা জান্নাতুল মাওয়া জাহিদ নেওয়াজ খান জুয়েল রাজ ৮৫ ড. এ. কে. আব্দুল মোমেন ১২ ড. কাবেরী গায়েন ২৩ ড. শাখাওয়াৎ নয়ন ডা. আতিকুজ্জামান ফিলিপ ১৫ ডা. সাঈদ এনাম ডোরা প্রেন্টিস তপু সৌমেন তসলিমা নাসরিন তানবীরা তালুকদার তোফায়েল আহমেদ ২০ দিব্যেন্দু দ্বীপ দেব দুলাল গুহ দেব প্রসাদ দেবু দেবজ্যোতি দেবু ২৭ নিখিল নীল পাপলু বাঙ্গালী পুলক ঘটক প্রফেসর ড. মো. আতী উল্লাহ ফকির ইলিয়াস ২৪ ফজলুল বারী ৬২ ফড়িং ক্যামেলিয়া ফরিদ আহমেদ ৩৯ ফারজানা কবীর খান স্নিগ্ধা বদরুল আলম বন্যা আহমেদ বিজন সরকার বিপ্লব কর্মকার ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ ১৮ ভায়লেট হালদার মারজিয়া প্রভা মাসকাওয়াথ আহসান ১৮৫ মাসুদ পারভেজ মাহমুদুল হক মুন্সী মিলন ফারাবী মুনীর উদ্দীন শামীম ১০ মুহম্মদ জাফর ইকবাল ১৫৩ মো. মাহমুদুর রহমান মো. সাখাওয়াত হোসেন মোছাদ্দিক উজ্জ্বল মোনাজ হক ১৪ রণেশ মৈত্র ১৮৩ রতন কুমার সমাদ্দার রহিম আব্দুর রহিম ৪৭ রাজেশ পাল ২৬ রুমী আহমেদ রেজা ঘটক ৩৮ লীনা পারভীন শওগাত আলী সাগর শাওন মাহমুদ শাখাওয়াত লিটন শামান সাত্ত্বিক শামীম আহমেদ ৩৬ শামীম সাঈদ শারমিন শামস্ ১৪ শাশ্বতী বিপ্লব শিতাংশু গুহ

ফেসবুক পেইজ