আজ রবিবার, ০৭ জুন, ২০২০ ইং

Advertise

পাকিস্তানের যখন সারা; ভারতে তখন হলো শুরু

মাসকাওয়াথ আহসান  

অযোধ্যার বাবরি মসজিদ বনাম রাম মন্দির বিতর্কের অবসান হলো ভারতের সুপ্রিম কোর্টের একটি ঐতিহাসিক রায়ে। এই বিতর্কে রামমন্দিরের পক্ষে রায় দিয়েছে আদালত। আর বাবরি মসজিদ গড়ার জন্য ৫ একর জমি বরাদ্দ করা হয়েছে।

এই রায়ে স্বাভাবিকভাবেই হিন্দুত্ববাদিরা খুশি; ইসলামপন্থীরা অখুশি। ভারতে এখন হিন্দুত্ববাদের রমরমা অবস্থা। ভারত বিভাগের পর ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পাকিস্তানে ইসলামপন্থার উত্থান ঘটে। অসংখ্য নিরীহ হিন্দুকে তাদের মাতৃভূমি থেকে উচ্ছেদ করে; বাড়ি-জমি দখল করার ইসলামপন্থা।

আর ভারত অসাম্প্রদায়িকতার আদর্শ দিয়ে হিন্দুত্ববাদের উত্থান রুখতে চেষ্টা করে। ফলে মুসলমানেরা সেখানে থেকে যেতে পারে।

কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার রক্তে যে হিন্দু-মুসলমান বিভাজনের ক্লেদ; তা জীনগত আচরণের এতো গভীরে বসবাস করে যে সিরিঞ্জ দিয়ে শরীরের সব রক্ত বের করে নিলেও হিন্দু-মুসলমান খোঁচাখুঁচি বন্ধ করা কঠিন।

পাকিস্তান ইসলামপন্থার বিষে ক্রমে বিষাক্ত হয়ে পড়ায়, বাংলাদেশকে এর নিজস্ব স্বাধীনতা খুঁজতে হয়; বাঙালিরা গণহত্যার স্বীকার হয়। পাকিস্তানে হিন্দু উচ্ছেদ শেষে ইসলামি কট্টরপন্থীরা শিয়া ও কাদিয়ানিদের উচ্ছেদ করতে থাকে। একসময় খিলাফতের জিহাদের নেশায় নির্দোষ মানুষ মারতে শুরু করে ইসলামপন্থীরা। ২০১৪ সালে পাকিস্তানের একটি স্কুলে ইসলামি জঙ্গিরা হামলা করে শিশুহত্যা করলে; পাকিস্তানের সমাজ ও জনমানুষ ইসলামপন্থাকে প্রত্যাখ্যান করে। এরপরের জাতীয় নির্বাচন দুটিতে পাকিস্তানের জনগণ জামায়াতে ইসলামি ও জামায়াতে উলেমা ইসলামিকে প্রায় উচ্ছেদ করে ছেড়ে দেয়। সেই বেদনায় পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে মওলানা ফজলুর রহমান ইসলামপন্থার জীবন্মৃত হাতির মতো 'আজাদি মার্চে'র প্রহসন করে প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের পদত্যাগ দাবি করছে। নিজের মাদ্রাসার ফুটসোলজার নিয়ে অন্তর্জলী যাত্রার আয়োজন এই লং মার্চ। পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ কট্টর ইসলামপন্থার দংশনে ছয়টি দশক দংশিত হয়ে আজ পুরোপুরি নেশামুক্ত; এ উপসংহার এখন টানা যায়।

অন্যদিকে ভারত গান্ধীজী আর নেহেরুর আন্তরিক প্রচেষ্টায় অসাম্প্রদায়িকতার শিক্ষায় দীপিত হয়। এরফলে একটি আলোকিত অসাম্প্রদায়িক গড়ে ওঠে; যারা গোটাবিশ্বে অসাম্প্রদায়িক ভারতের পতাকা ওড়ান। কিন্তু রক্তের মাঝের হিন্দুত্ববাদ পরিশোধনের কাজটা আর করা হয়নি। সমাজের উপরিকাঠামোর উদারপন্থীদের অসাম্প্রদায়িক প্রচেষ্টার আড়ালে বেড়ে উঠতে থাকে কট্টর হিন্দুত্ববাদ। যেহেতু এই হিন্দুত্ববাদ মাথাচাড়া দিতে পারেনি; তারা সংগঠিত হয়ে একসময় ভোটের রাজনীতিতে এগিয়ে যায়। সবশেষে হিন্দুত্ববাদি মোদিকে ক্ষমতায় নিয়ে আসে। ইসলামপন্থী মওলানা ফজলুর রহমান পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হলে ব্যাপারটা ঠিক যেরকম হতো। ভারতের অসাম্প্রদায়িক মানুষ এখন বিপদগ্রস্ত; জীবন সায়াহ্নে এসে বলিউডের মুসলমান শিল্পীদের মনে হচ্ছে, মাতৃভূমিতে পরবাসী তারা; এই প্রথম মুসলমানেরা চাকরিক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানির নাৎসিদের চোখে ইহুদিরা যেমন শত্রু ছিলো; আজকের ভারতে হিন্দুত্ববাদিদের চোখে মুসলমানেরা ঠিক তাই।

মানে পাকিস্তানে কট্টরপন্থা ইসলামের যে ভোগান্তি জনমানুষকে ৬০ বছর পোহাতে হয়েছে; ভারতে ৬০ বছরের অসাম্প্রদায়িক বাতাবরণ ফুঁড়ে কট্টর হিন্দুত্ববাদের ভোগান্তি জনমানুষের জীবন নেমে এলো। পাকিস্তানের যখন সারা; ভারতে তখন হলো শুরু।

এইকারণে পচা-গলা-নষ্ট কট্টরপন্থার কষ্টের অভিজ্ঞতা জরুরি। কৃত্রিমভাবে জীনগত নোংরামিগুলোকে চাপা দিতে নেই। এই কট্টরপন্থী বাঁদরগুলোকে মাথায় চড়ে নাচতে দিতে হয়; গণভোগান্তির স্বরূপ সবার সামনে স্পষ্ট হতে দিতে হয়।

আজ পাকিস্তানে কট্টর মোল্লারা গলার তেজ কমিয়ে বেশ সাইজ হয়ে চলে; হিজাবিনীরা সৌদি গর্বের দাওয়াত দিতে ভয় পায়; এখন পাকিস্তানের তরুণ প্রজন্ম অসাম্প্রদায়িকতার অনুসন্ধান করে।

ভারত বৃহৎ গণতন্ত্রের দেশ; সেখানকার অসাম্প্রদায়িক মানুষেরা সংঘবদ্ধ হচ্ছে। হিন্দুত্ববাদি মোদি হাতির তাণ্ডবটিকে সংঘটিত হতে দিতে হচ্ছে। কারণ যতদিন পর্যন্ত ভারতের সব মানুষ বুঝতে না পারছে; এই হিন্দুত্ববাদীরা দেশের ও মানুষের সর্বনাশ করে ছাড়ছে; ততদিন এই তাণ্ডব চলবে।

এরপর ভারতে অসাম্প্রদায়িকতার বিরাট সূর্য উঠবে; সে আলোর জন্য প্রস্তুত হচ্ছে পাকিস্তান। ২০২৫ সালের পর ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের মত সভ্য সীমান্ত হয়ে উঠবে। ভূমি বাস্তবতায় সেটা বিলম্বিত হলেও আন্তর্জালের মানচিত্রে অখণ্ড দক্ষিণ এশিয়ার ধারণা পরিস্ফুট হবে। ইতিহাসের হিন্দু বয়ান বনাম মুসলমান বয়ানের অচল পাণ্ডুলিপি ছুঁড়ে ফেলে; ইতিহাস বিকৃতির নোংরা সময়টিকে অতিক্রম; আবারো সভ্যতার পাদপীঠে পৌঁছানোর আন্তরিক চেষ্টা করবে। কাজেই আজ যা গভীর সংকট আগামীকাল তা কৌতুকের মতো শোনাবে। ফ্রান্স ও জার্মানির অতীতের সংকটের গল্পগুলোগুলো আজকের বাস্তবতায় কৌতুক হিসেবেই পরিবেশিত হয়।

মাসকাওয়াথ আহসান, সাংবাদিক, সাংবাদিকতা শিক্ষক

মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।

আপনার মন্তব্য

লেখক তালিকা অঞ্জন আচার্য অধ্যাপক ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী অসীম চক্রবর্তী আজম খান ১০ আজমিনা আফরিন তোড়া ১০ আফসানা বেগম আবু এম ইউসুফ আবু সাঈদ আহমেদ আব্দুল করিম কিম ২৮ আব্দুল্লাহ আল নোমান আব্দুল্লাহ হারুন জুয়েল আমিনা আইরিন আরশাদ খান আরিফ জেবতিক ১৫ আরিফ রহমান ১৬ আরিফুর রহমান আলমগীর নিষাদ আলমগীর শাহরিয়ার ৪৭ আশরাফ মাহমুদ আশিক শাওন ইনাম আহমদ চৌধুরী ইমতিয়াজ মাহমুদ ৬০ ইয়ামেন এম হক এখলাসুর রহমান ২৩ এনামুল হক এনাম ২৯ এমদাদুল হক তুহিন ১৯ এস এম নাদিম মাহমুদ ২৭ ওমর ফারুক লুক্স কবির য়াহমদ ৩৫ কাজল দাস ১০ কাজী মাহবুব হাসান খুরশীদ শাম্মী ১৪ গোঁসাই পাহ্‌লভী ১৪ চিররঞ্জন সরকার ৩৫ জফির সেতু জহিরুল হক বাপি ২৮ জহিরুল হক মজুমদার জাকিয়া সুলতানা মুক্তা জান্নাতুল মাওয়া জাহিদ নেওয়াজ খান জুয়েল রাজ ৭৭ ড. এ. কে. আব্দুল মোমেন ১২ ড. কাবেরী গায়েন ২২ ড. শাখাওয়াৎ নয়ন ডা. সাঈদ এনাম ডোরা প্রেন্টিস তপু সৌমেন তসলিমা নাসরিন তানবীরা তালুকদার দিব্যেন্দু দ্বীপ দেব দুলাল গুহ দেব প্রসাদ দেবু দেবজ্যোতি দেবু ২৭ নিখিল নীল পাপলু বাঙ্গালী পুলক ঘটক ফকির ইলিয়াস ২৪ ফজলুল বারী ৬২ ফড়িং ক্যামেলিয়া ফরিদ আহমেদ ৩৪ ফারজানা কবীর খান স্নিগ্ধা বদরুল আলম বন্যা আহমেদ বিজন সরকার বিপ্লব কর্মকার ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ ১৮ ভায়লেট হালদার মারজিয়া প্রভা মাসকাওয়াথ আহসান ১৪০ মাসুদ পারভেজ মাহমুদুল হক মুন্সী মিলন ফারাবী মুনীর উদ্দীন শামীম ১০ মুহম্মদ জাফর ইকবাল ১৩২ মো. মাহমুদুর রহমান মো. সাখাওয়াত হোসেন মোছাদ্দিক উজ্জ্বল মোনাজ হক ১৩ রণেশ মৈত্র ১৬৭ রতন কুমার সমাদ্দার রহিম আব্দুর রহিম ২৯ রাজেশ পাল ২৪ রুমী আহমেদ রেজা ঘটক ৩৪ লীনা পারভীন শওগাত আলী সাগর শাখাওয়াত লিটন শামান সাত্ত্বিক শামীম আহমেদ শামীম সাঈদ শারমিন শামস্ ১৪ শাশ্বতী বিপ্লব শিতাংশু গুহ শিবলী নোমান শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ ২৪ শেখ মো. নাজমুল হাসান ২১ শেখ হাসিনা শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী সঙ্গীতা ইমাম সঙ্গীতা ইয়াসমিন ১৬

ফেসবুক পেইজ