আজ শুক্রবার, ০৮ মে, ২০২৬

Advertise

নারী-পুরুষ-তৃতীয় লিঙ্গ এবং সমকামিতা

ড. শামীম আহমেদ  

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শপথ নেবার পর পরই ঘোষণা করেছেন তার সরকার শুধুমাত্র দুটো লিঙ্গকে স্বীকার করে—পুরুষ এবং নারী। এশিয়া বা আফ্রিকার মানুষরা হয়ত বিস্মিত হতে পারেন এই ভেবে যে এটা একটা লেখার প্রসঙ্গ হলো? লিঙ্গ তো দুটোই।
আজকে ক্যানাডিয়ান টেলিভিশনের এক সাক্ষাৎকারে ক্যানাডার ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী রক্ষণশীল দলের প্রধান পিয়েরে পোলিয়েভকে সঞ্চালক জিজ্ঞেস করলেন, “ট্রাম্প যে বলেছেন কেবল দুটো লিঙ্গ—নারী ও পুরুষকেই তারা স্বীকৃতি দেন, এই বিষয়ে ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আপনার অবস্থান কী হবে?”

পোলিয়েভ কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে একটু ভ্রু কুঁচকে মুচকি হেসে সঞ্চালককে পাল্টা প্রশ্নের ছলে উত্তর দিয়ে বলেন, “আমি তো জানি দুটো লিঙ্গই আছে পৃথিবীতে, নারী ও পুরুষ। আপনি যদি অন্য কিছু জানেন, আমাকে বলতে পারেন, আমি শুনতে আগ্রহী।”

পোলিয়েভের উত্তরে সঞ্চালক একটু থতমত খেয়ে বলেন যে, তিনি নিজেকে পুরুষ হিসেবেই পরিচয় দেন কিন্তু অনেকে নানা ধরনের লিঙ্গে বিশ্বাস করেন, তাদের ব্যাপারে পোলিয়েভের অবস্থান কী? পোলিয়েভ আবার বলেন আমি দুটো লিঙ্গই জানি—নারী ও পুরুষ; তবে কেউ যদি অন্য কিছু জানে, আমরা সে বিষয়ে কথা বলতে পারি।

তখন সঞ্চালক বলেন, অনেকেই ট্রান্সজেন্ডার, তৃতীয় লিঙ্গ, টু স্পিরিট ইত্যাদি জেন্ডার আইডেন্টিটিতে বিশ্বাস করেন, তাদের ব্যাপারে আপনার মতামত জানতে চাচ্ছিলাম।

উল্লেখ্য পশ্চিমা বিশ্বে নারী-পুরুষের বাইরেও agender, cisgender, genderfluid, genderqueer, intersex, nonbinary, and transgender ইত্যাদি নানা পরিচয়ে মানুষ নিজের পরিচিতি দিতে পারে। প্রায় সকল জায়গায় নারী, পুরুষ কিংবা অন্যান্য হিসেবে নিজের লিঙ্গ নির্ধারণের সুযোগ আছে।

তখন পোলিয়েভ আবারও বলেন, আমি দুটো লিঙ্গ আছে জানি; বাকি যারা অন্যান্য লিঙ্গ আছে মনে করেন, তারা সেসব নিয়ে ভাবতে পারে। আমি মনে করি না সরকারের এই ধরনের অগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ভাববার অবকাশ আছে। এমনকি এই মুহূর্তে অসংখ্য মানুষ পার্কে উদ্বাস্তু হিসেবে আছে, অনেকের ঘরে খাবার নেই, মানুষ বাড়ি ভাড়া দিতে পারছে না, সেখানে লিঙ্গ কয়টি এমন বিষয়ে আলাপ করে আমরা সময় নষ্ট করছি সেটিই আমার কাছে অপ্রয়োজনীয় মনে হচ্ছে।

ট্রাম্প-পোলিয়েভের সাম্প্রতিক অবস্থান শুনতে শুনতে আমার গত ৮ বছরের অভিজ্ঞতার কথা ভাবছিলাম। ক্যানাডায় আসার পর থেকে আমি দেখেছি ট্রুডো সরকারের একটা বড় কাজ ছিল সবার নিজস্ব পরিচয়কে স্বীকৃতি দেয়ার ব্যবস্থা করা। সমকামিতা, তৃতীয় লিঙ্গ ইত্যাদি পরিচয়কে জাস্টিন ট্রুডোর লিবারেল সরকার সবসময় প্রসার করতে সাহায্য করেছে। আমেরিকায় জো বাইডেন এবং কামালা হ্যারিসের ডেমোক্রেট সরকারও তাই করেছে।

আমরা যারা নানা সময়ে শিক্ষকতা করেছি, শিক্ষক সহায়ক হিসেবে কাজ করেছি, তাদের এই বিষয়গুলো জোরদারভাবে প্রসার করতে উৎসাহিত করা হয়েছে। যারা এইসব বিষয়ে গবেষণা করেছে, তাদের গবেষণার ফান্ড পেতে সুবিধা হয়েছে। যারা এইসব বিষয়ে পিএইচডি করেছে, তাদের এপ্লিকেশন অনেকক্ষেত্রে বেশি প্রাধান্য পেয়েছে।

যারা ভিন্ন লিঙ্গ বা সমকামী হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিয়েছেন—তাদের পারমানেন্ট রেসিডেন্সি বা নাগরিকত্ব পেতে অন্যদের চাইতে সময় কম লেগেছে। নেটফ্লিক্সের যে কোন সিরিজ দেখলে আপনি দেখবেন সেখানে ৩টা কাপল থাকলেও তার মধ্যে অন্তত একটা সমকামী কাপল আছে, যদিও সেটা বাস্তবিক চিত্রকে প্রতিফলিত করে না। এটি হচ্ছে উন্নত বিশ্বে সমকামিতাকে প্রতিষ্ঠিত করার প্রাতিষ্ঠানিক চেষ্টা যা গত এক দশক ধরে হয়েছে। আমেরিকা, ক্যানাডা এবং ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশ এ ব্যাপারে সক্রিয় হয়েছে গত কয়েক যুগ ধরে। প্রশ্ন হচ্ছে, আমি কি লেখার মাধ্যমে এইসব উদ্যোগের বিরোধিতা করছি? উত্তর হচ্ছে—না। পরবর্তী প্রশ্ন হচ্ছে, আমি তাহলে এইসব উদ্যোগ প্রসারে সহযোগিতা করেছি, এর উত্তরও হচ্ছে—না। তাহলে প্রশ্ন হতে পারে আমার অবস্থান কী? এ বিষয়ে পরে আসছি।

বিশ্বব্যাপী সাম্প্রতিক সময়ে রক্ষণশীলরা আবার ক্ষমতায় ফিরে আসতে শুরু করেছে। আমেরিকায় রিপাবলিকান দলের প্রধান ট্রাম্পের ক্ষমতা গ্রহণ এবং প্রথম দিনের নানা সিদ্ধান্ত কট্টর রক্ষণশীলতার আবির্ভাবের নির্দেশনা দিচ্ছে। ক্যানাডায় পিয়েরে পোলিয়েভের প্রধানমন্ত্রী হওয়া নিশ্চিত। তিনি কত ব্যবধানে প্রধানমন্ত্রী হবেন সেটিই কেবল আলোচনার বিষয়। পোলিয়েভও রক্ষণশীল এবং ট্রাম্পের মতোই অভিবাসীদের ব্যাপারে তার কঠোর অবস্থানের সাথে সাথে তৃতীয় লিঙ্গ, সমকামিতার পক্ষে তিনি নন—এই অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। দুজনেই ক্লাইমেট চেঞ্জ বিষয়েও একদমই অনাগ্রহী।

সার্বিকভাবে আমেরিকা ও ক্যানাডার জনগণ এই দুই প্রেসিডেন্ট ও সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রীর তৃতীয় লিঙ্গ ও সমকামিতা বিরোধিতায় উৎফুল্ল। এটিতে অবাক হবার কিছু নেই। সারা বিশ্বের মানুষই এইসব ব্যাপারে রক্ষণশীল এবং বেশিরভাগ আদি ধর্ম এগুলো সমর্থন করে না বিধায় বেশিরভাগ মানুষও তা সমর্থন করে না। এখন আমার অবস্থান কী এই প্রশ্ন উঠতে পারে। প্রথমত আমি এতই অগুরুত্বপূর্ণ একজন মানুষ যে আমার অবস্থান আসলে অপ্রাসঙ্গিক। তবুও কারও কারও কৌতূহল নিবারণের জন্য বলি, আমি ধর্ম, বর্ণ, জাতি, লিঙ্গ, যৌন-সম্পর্ক ইত্যাদি মানুষের ব্যক্তিগত বিষয় বলে মনে করি যতক্ষণ পর্যন্ত না সেটি অন্যকে আহত করে বা অন্যের বিশ্বাসকে প্ররোচনা ছাড়াই আক্রমণ করে। কে কী পালন করবে বা বিশ্বাস করবে তাতে আমার কোন সমর্থন বা বৈরিতা নেই। একজন ক্যানাডিয়ান বাংলাদেশী হিসেবে আমি মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করি।

তবে পৃথিবীর অন্যতম প্রভাবশালী দুটি খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী দেশ হলেও আমেরিকা ও ক্যানাডার সাম্প্রতিক তৃতীয় লিঙ্গ ও সমকামিতা বিষয়ক সম্ভাব্য সরকারি অবস্থানে সারা বিশ্বের অন্যান্য ধর্মের উগ্রপন্থীরা উল্লসিত হয়ে নানা অজুহাতে ভিন্ন চিন্তার মানুষদের হত্যা, খুনে উৎসাহিত হয়ে উঠতে পারে যেটি বিপজ্জনক। বিবেচ্য বিষয় এই যে আমেরিকা বা ক্যানাডা রাষ্ট্রীয়ভাবে নারী-পুরুষের বাইরে কোন লিঙ্গকে যদি আর স্বীকৃতি না দেয়, বা সমকামিতাকে উৎসাহিত না-ও করে, তবুও এই দুই দেশে ভিন্নমত পোষণ কিংবা নিজেদের সমকামী অথবা তৃতীয় লিঙ্গের ঘোষণার জন্য কাউকে খুন-গুম-হত্যা বা ঘরবাড়ি ছাড়ার মতো পরিস্থিতির শিকার হতে হবে না।

কিন্তু আমেরিকা বা ক্যানাডার এই অবস্থানকে কেন্দ্র করে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের উগ্রপন্থীরা একে অপরকে আঘাত করার একটা নতুন অজুহাত হিসেবে একে বিবেচনা করতে পারে বলে আশংকা করি।

ড. শামীম আহমেদ, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও সামাজিক-বিজ্ঞান গবেষক।

মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।

আপনার মন্তব্য

লেখক তালিকা অঞ্জন আচার্য অধ্যাপক ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী ৪৮ অধ্যাপক ডা. শেখ মো. নাজমুল হাসান ২৮ অসীম চক্রবর্তী আজম খান ১১ আজমিনা আফরিন তোড়া ১০ আনোয়ারুল হক হেলাল আফসানা বেগম আবদুল গাফফার চৌধুরী আবু এম ইউসুফ আবু সাঈদ আহমেদ আব্দুল করিম কিম ৩২ আব্দুল্লাহ আল নোমান আব্দুল্লাহ হারুন জুয়েল ১০ আমিনা আইরিন আরশাদ খান আরিফ জেবতিক ১৮ আরিফ রহমান ১৬ আরিফুর রহমান আলমগীর নিষাদ আলমগীর শাহরিয়ার ৫৪ আশরাফ মাহমুদ আশিক শাওন ইনাম আহমদ চৌধুরী ইমতিয়াজ মাহমুদ ৭২ ইয়ামেন এম হক এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন একুশ তাপাদার এখলাসুর রহমান ৩৭ এনামুল হক এনাম ৫৪ এমদাদুল হক তুহিন ১৯ ওমর ফারুক লুক্স কবির য়াহমদ ৬৪ কাজল দাস ১০ কাজী মাহবুব হাসান কেশব কুমার অধিকারী খুরশীদ শাম্মী ১৮ গোঁসাই পাহ্‌লভী ১৪ চিররঞ্জন সরকার ৩৫ জফির সেতু জহিরুল হক বাপি ৪৪ জহিরুল হক মজুমদার জাকিয়া সুলতানা মুক্তা জান্নাতুল মাওয়া জাহিদ নেওয়াজ খান জুনাইদ আহমেদ পলক জুয়েল রাজ ১১৫ ড. এ. কে. আব্দুল মোমেন ১২ ড. কাবেরী গায়েন ২৩ ড. নাদিম মাহমুদ ৩৭ ড. মাহরুফ চৌধুরী ১২ ড. শাখাওয়াৎ নয়ন ড. শামীম আহমেদ ৪৫ ডা. আতিকুজ্জামান ফিলিপ ২০ ডা. সাঈদ এনাম ডোরা প্রেন্টিস তপু সৌমেন তসলিমা নাসরিন তানবীরা তালুকদার তোফায়েল আহমেদ ৩২ দিব্যেন্দু দ্বীপ দেব দুলাল গুহ দেব প্রসাদ দেবু দেবজ্যোতি দেবু ২৭ নিখিল নীল পাপলু বাঙ্গালী পুলক ঘটক প্রফেসর ড. মো. আতী উল্লাহ ফকির ইলিয়াস ২৪ ফজলুল বারী ৬২ ফড়িং ক্যামেলিয়া ফরিদ আহমেদ ৪৪ ফারজানা কবীর খান স্নিগ্ধা বদরুল আলম বন্যা আহমেদ বিজন সরকার বিপ্লব কর্মকার ব্যারিস্টার জাকির হোসেন ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ ১৮ ভায়লেট হালদার মারজিয়া প্রভা মাসকাওয়াথ আহসান ১৯৪ মাসুদ পারভেজ মাহমুদুল হক মুন্সী মিলন ফারাবী মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম মুনীর উদ্দীন শামীম ১০ মুহম্মদ জাফর ইকবাল ১৫৩ মো. মাহমুদুর রহমান মো. সাখাওয়াত হোসেন মোছাদ্দিক উজ্জ্বল মোনাজ হক ১৪ রণেশ মৈত্র ১৮৩ রতন কুমার সমাদ্দার রহিম আব্দুর রহিম ৫৫ রাজু আহমেদ ৪১ রুমী আহমেদ রেজা ঘটক ৩৮ লীনা পারভীন শওগাত আলী সাগর