টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।
Advertise
জুয়েল রাজ | ০৭ জুন, ২০১৮
বাংলাদেশে মাদকসেবীর সঠিক পরিমাণ কারো জানা নাই, শুধু মাত্র বিভিন্ন মাদক নিরাময় প্রতিষ্ঠানের হিসাব অনুযায়ী ২০১৭ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে মাদকসেবীর পরিমাণ ছিল ৭০ লাখ থেকে এক কোটি। এবং প্রতিবছর সেখানে নতুন ৫ লাখ আবার কেউ বলছেন ১০ লাখ করে নতুন মাদকসেবী যোগ হচ্ছে। এই মাদকসেবীর আবার অর্ধেকের ও বেশী ইয়াবাতে আসক্ত।
মাদক নিয়ে পৃথিবীতে যত আসামি কারাগারে আছে তার ৩০ ভাগ বাংলাদেশে। বাংলাদেশে প্রতিদিন ৭০ কোটি টাকার মাদক কেনা-বেচা হয়।
দেশে ১৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সী তরুণের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার অর্ধেক। আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক তাঁর এক বক্তব্যে বলেছেন বাংলাদেশে ১১ কোটি মানুষের বয়স নাকি ১৫ থেকে ৩৫ বছরের ভিতর। এই পরিসংখ্যান সরকারী বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা ও সংবাদপত্রের । এবং এই পুরো সংখ্যাটাই কিন্তু মাদকের ঝুঁকির ভিতর বসবাস করছে।
পত্রিকার সংবাদ অনুযায়ী ৩৬০০ মাদক ব্যবসায়ী সারা দেশের মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন। যার তালিকা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রকাশ করেছে। এখন এই ৩৬ হাজার মাদক ব্যবসায়ীকে ক্রসফায়ারে দিয়ে দিলেই কি, বাংলাদেশের মাদক নিয়ন্ত্রণ হয়ে যাবে। নিশ্চয় নয়। এক কোটি মাদকসেবী বিকল্প কোন মাদক ঠিকই খুঁজে নিবে।
কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও পত্রিকার বিভিন্ন সংবাদে ধারণা করা যায়, টেকনাফের সরকার দলীয় এমপি বদি বাংলাদেশে একমাত্র মাদক ব্যবসায়ী। বদিকে ক্রসফায়ারে দিলেই দেশের মাদক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। একরাম হত্যার প্রতিবাদে বদি হত্যায় মানুষকে প্ররোচিত করছেন আরেকটি হত্যাকাণ্ডকে সমর্থন করছেন। কোন মানবিক মানুষ কোন বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে সমর্থন করতে পারে না।
২০০১ সালে বিএনপির সময় থেকেই, র্যাব সৃষ্টি হওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চলে আসছে। আওয়ামী লীগ ও সেই চালু হওয়া ব্যবস্থা চালু রেখেছে। যা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। এবারের চলমান মাদক নির্মূল অভিযানে ইতোমধ্যে বহু ক্রসফায়ারের ঘটনা ঘটেছে। এবং কেউ এর প্রতিবাদ করেনি। সবাই বেশ সাধুবাদ দিয়েছেন। একরাম হত্যা পর্যন্ত কোন প্রতিবাদ আসে নাই। শুধুমাত্র যখন অডিও টেপটি প্রকাশিত হলো ঠিক সেই সময়ই আমাদের আবেগ, বিবেক, ন্যায়বিচারের অনুভূতি জাগ্রত হলো। এবং অবাক করার বিষয় শুরু হলো প্রধানমন্ত্রী কে নিয়ে সমালোচনা। এবং তার অতীতের মানবিক বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে ট্রল করা। অডিও টেপটি আমি শুনেছি। আমি ও রাতে ঘুমোতে পারিনি। আব্বু আব্বু সেই কান্না আমাকে সংক্রমিত করেছে। একরাম দোষী না নির্দোষ সেটা বিচার্য বিষয়। ভুল করে কাউকে হত্যা করার অধিকার রাষ্ট্রের নেই। বিচারক সব সময় নাকি বিচার করেন কোন নিরপরাধ মানুষ যেন সাজা না পায়, সেটা নিশ্চিত করতে অনেক অপরাধী ও অনেক সময় সাজা পায়না।
এবার একরামের জায়গায় বদিকে কল্পনা করুন। এবং অডিও টেপটি বদির বউ ছেলেমেয়ের ছিল। সেইক্ষেত্রে আপনার ভূমিকা কি থাকতো। আমি জানি একই আবেগ অনুভূতি কাজ করতো আমাদের। অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে একরামের অডিও রেকর্ড প্রকাশিত না হলে এই হত্যাকাণ্ড হালাল ছিল! অথচ একই মাদকের কারণে ঐশী নামের কিশোরীটি যখন নিজের মা বাবা কে হত্যা করেছিল তখন আমরা ঐশীর ফাঁসী চেয়েছি। খুব কম সংখ্যক মানুষ সেদিন ঐশীর পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। মানবতার কথা বললে, মানবাধিকারের কথা বললে প্রথমেই আপনাকে যে কোন মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হবে। কোন অবস্থায়ই কোন মানুষের মৃত্যুদণ্ড দেয়া যাবে না, এইটাই প্রথম শর্ত। কোন ধরণের কিন্তু কেন দিয়ে কোন হত্যাকাণ্ডকে জাস্টিফাই করার সুযোগ নাই। জঙ্গিবাদ নিয়ন্ত্রণেও কিন্তু এই বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল। সরকার এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সেখানে সফল হয়েছে।
ছোট তিনটা ঘটনা পাঠকের সাথে শেয়ার করতে চাই।
পৃথিবীর কোন দেশেই মাদক পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি, বিশ্বের সেরা দশ মাদক ব্যবহারকারী দেশের মধ্যে ইরানের মতো ধর্মীয় অনুশাসনের দেশ যেমন আছে তেমনি ফ্রান্স আমেরিকার মতো দেশও আছে। বাংলাদেশেও সবাই শুধু মাদক নিয়ে সমস্যার কথা বলছি, বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নিয়ে কথা বলছি। আবার মাদক নির্মূল নিয়েও বলছি।
মাদক সমাজ থেকে নির্মূল করা সম্ভব নয়। পৃথিবীর বহু উন্নত দেশই পারে নাই। তাহলে সমাধানের রাস্তা কি? এই বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীকে ঝুঁকিমুক্ত রাখার দায়িত্ব শুধু পরিবারের নয়। রাষ্ট্রেরও বটে। শুধু ধর্মীয় শিক্ষা আর অনুশাসনের মাধ্যমে মুক্ত আকাশের যুগে, তরুণের এই বিশাল সংখ্যাকে আটকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। প্রয়োজন সময়োপযোগী পদক্ষেপ। তারুণ্যের কৌতূহল আর উন্মাদনাকে অস্বীকার করারও উপায় নাই। বিনোদন, শিল্প, সাহিত্য, খেলাধুলোর পরিবেশ তৈরি করতে হবে। সময়কে মেনে নিতে হবে। যুগোপযোগী আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা বা কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। উন্নয়নশীল দেশ থেকে মধ্যম আয় বা উন্নত দেশের পথে যাত্রায় প্রয়োজন টেকসই উন্নয়ন। এই উন্নয়ন এবং অগ্রযাত্রা শুধু স্যাটেলাইট, ফোর জি নেটওয়ার্ক কিংবা পদ্মাসেতু দিয়ে ধরে রাখা সম্ভব নয়। যদি মানব উন্নয়ন না ঘটে। এক কোটি কর্মক্ষম মাদকাসক্ত এবং ১১ কোটি ঝুঁকিপ্রবণ তরুণ মানবশক্তি নিয়ে সেই টেকসই (Sustainable) উন্নয়ন সম্ভব নয়।
টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে, কর্মক্ষম মানবসম্পদ গঠন করতে হলে মাদকের ভয়াবহতা থেকে যুবসমাজকে রক্ষা করতে হবে। মাদক নির্মূল না হোক নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। যার জন্য অবশ্যই মাদকের উৎসমূল বন্ধ করতে হবে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার উপর অভিযোগ সবচেয়ে বেশি। প্রতিটা এলাকার মানুষ জানে মাদক ব্যবসায়ী কারা। এর জন্য খুব বেশী বড় গোয়েন্দা হতে হয় না। এবং স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনকে হাত করেই এই মাদক বাণিজ্য চলছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সাজার ব্যবস্থা রেখে মাদক নিয়ন্ত্রণে আলাদা আইন ও টাক্সফোর্স গঠন করে ব্যবস্থা নিতে হবে মাদক ব্যবসায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। চলমান নির্মূল অভিযানের মাধ্যমে নির্মূল করা সম্ভব না হলেও একটা সহনীয় মাত্রায় হয়তো মাদককে নিয়ে আসবে।
গত ২৯ মে তারিখে একরাম হত্যার মধ্য দিয়ে বিতর্কের মুখে পড়ে। একরাম টেকনাফ আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত। তিনবারের নির্বাচিত কাউন্সিলর এবং জনপ্রিয় কাউন্সিলর। দীর্ঘদিন যুবলীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন। রাজনৈতিক ভাবে ক্ষতি যা হওয়ার আওয়ামী লীগের হয়েছে। শিয়রে সংক্রান্তির মতো সামনে নির্বাচন। সেই নির্বাচনের প্রাক্কালে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকে কথিত বন্দুকযুদ্ধের নামে হত্যা হওয়ার অভিযোগের বিরুদ্ধে এখনো কোন প্রমাণ দিতে পারে নাই আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
তাই শুধুমাত্র নির্বাচনী জনপ্রিয়তা নয়, শেখ হাসিনার দূরদর্শী চিন্তা ও টেকসই উন্নয়নের জন্যই মাদক নিয়ন্ত্রণ জরুরী। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাংলাদেশে সম্পন্ন হচ্ছে। কিন্তু যখন শুরু হয়, তখন, হবে না হবে না বলে অনেকেই এই উদ্যোগকে ভোটের হাতিয়ার হিসেবে গণ্য করেছিলেন। শেখ হাসিনা সেটা করে দেখিয়েছেন। সামনে নির্বাচন। মাদক নির্মূল অভিযানকে অনেকেই ভোটের সস্তা জনপ্রিয়তা লাভের অংশ হিসাবে বিবেচনা করছেন। কিন্তু শেখ হাসিনা সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন ‘‘আমি যা ধরি ভাল করেই ধরি’’ তাই মাদক নির্মূল বা নিয়ন্ত্রণ অভিযানও ভাল ভাবেই শেষ হবে। যেভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়েছে জঙ্গিবাদ।
একরাম ক্রসফায়ারের অডিও টেপটি রেকর্ড করার ধরণ নিয়ে আমি সন্দিহান। কারণ পেশাগত কারণে আমি অটো রেকর্ডার ব্যবহার করি। তাই এই রেকর্ড সম্পর্কে আমি ভালমতো পরিচিত। যে ভাবে রেকর্ড করা হয়েছে মনে হয়েছে তৃতীয় কেউ রেকর্ডিং এর কাজটি সম্পন্ন করেছে। প্রত্যেক সন্তানের কাছেই বাবা তার নায়ক। কোন বাবাই তার সন্তানের কাছে খারাপ বাবা নয়। সে চোর ডাকাত খুনি যেই হউক না কেন। একরাম ভাল মন্দ কিংবা মাদক ব্যবসায়ী হউক বা না হউক। তার সন্তানদের বাবা। তাদের হিরো তিনি। ভালোবাসা আবেগের জায়গা। একরামের স্ত্রী কন্যার কান্না, সেই গুলির শব্দ, মৃত্যু যন্ত্রণা, কোন স্ত্রী বা সন্তানের পক্ষে মেনে নেয়া সম্ভব নয়।
একরাম যদি নির্দোষ হয় অবশ্যই সে শহীদের মর্যাদা পাবে। একরামের আত্ম বলিদানের মধ্য দিয়েও যদি মাদক নির্মূল সম্ভব হয় তবে সেটাই হবে একরামের বিজয়। রক্ত ছাড়া কোন অর্জনই যেন অর্জিত হয়না । মাদকবিরোধী এই শুদ্ধি অভিযান বাংলাদেশের জন্য অবশ্যম্ভাবী ছিল। এ ছাড়া অন্য কোন বিকল্প কিছু ছিলনা।
মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।
আপনার মন্তব্য